“আমিও তোমায় দেখলাম—” অমল বলল, “তখন ঝিমুনি মতন এসেছিল, হঠাৎ দেখলাম তুমি…” বলতে-বলতে সে থেমে গেল।
ভ্রমর যেন বিশ্বাস করতে পারল না। “সত্যি!”
“সত্যি বলছি।”
“আমায় দেখলে?”
মাথা নাড়ল অমল। হাতের বাইবেল বইটা বিছানায় রাখল। বড় ভারী। ডিকশনারির মতন মোটা।
“স্বপ্ন?” ভ্রমর শুধলো।
“স্বপ্ন-টপ্নই হবে।”
“কি দেখলে?”
কি দেখেছিল অমল, ঠিক তা বলতে চাইছিল না। লুকোবার ইচ্ছে হওয়ায় সে অন্য কিছু বলতে গেল, কিন্তু গুছিয়ে নিতে পারল না। না পেরে বলল, “আমি তোমার বাইবেলটা পড়ছিলাম বলে ওই রকম দেখলাম।”
“কি দেখলে বলো? খালি…” ভ্রমর বায়না করার মতন ছেলেমানুষি সুর করল।
অমল মুশকিলে পড়ল। কথাটা তার বলতে ইচ্ছে করছে না। ভ্রমর শুনলে কষ্ট পাবে। অমল লুক-সমাচারের গল্পটা ভাবছিল বলে স্বপ্ন দেখেছে, ভ্রমর যেন কোথায় গেছে, তার সামনে মস্ত এক সাধুপুরুষ দাঁড়িয়ে, তাঁর পিঠের চারপাশে আলো, ভ্রমর হাত জোড় করে বসে আছে। কারা যেন বলছিল, ইনি যীশু, ইনি মানুষের রোগ তাপ নিবারণ করেন। ভ্রমরের খোঁড়া পা সারিয়ে দেবেন।
অমল ইতস্তত করে বলল, “আমি দেখলাম তুমি যীশুর কাছে গেছ।”
ভ্রমর কেমন হতবাক্ ও অভিভূত হল। অমলের চোখে চোখ রেখে অপলকে তাকিয়ে থাকল। মনে হল, সে যেন নিশ্বাস নিতে ভুলে গেছে।
অমলের তখনও ভয় করছিল, সে ভাবছিল এর পরও যদি ভ্রমর জিজ্ঞেস করে, আমি তাঁর কাছে গিয়ে কি করছিলাম, তখন অমল কি বলবে! অমল মনে- মনে ঠিক করল, সে আর-কিছু জানাবে না, বলবে—ওই ত, আমি আর-কিছু দেখিনি।
কিছুক্ষণ নীরবে বসে থাকার পর ভ্রমর দীর্ঘ করে শ্বাস ফেলল। তার মুখ সামান্য সময়ের জন্যে খুব উদাস এবং অন্যমনস্ক ছিল। অমলকে সে দেখছিল না, ঘরের দেওয়ালে ছায়ার দিকে তাকিয়ে সে যেন অন্য কোনো জগতের কিছু দেখছিল, তারপর তার আবিষ্ট ভাব কেটে গেলে ভ্রমর নিশ্বাস ফেলল, অমলকে আবার দেখল চেয়ে চেয়ে।
ভ্রমর কি বলে বসবে ভেবে না পেয়ে অমল বুদ্ধিমানের মতন অন্য কথা পাড়ল। “তোমার ওই বাইবেল আমি কিছু বুঝতে পারি না। কি কটমটে বাংলা।”
“আমার কাছে আর-একটা বই আছে, স্টোরিস ফ্রম বাইবেল—!”
“গল্প?”
“বাইবেলের গল্প।”
“এ-সব গল্পই, না সত্যি সত্যি?”
“সত্যি।”
“যীশু কুষ্ঠ রোগীদের সারাতে পারতেন?” অমল সন্দেহ প্রকাশ করল।
“তিনি সব পারতেন।” ভ্রমর শাত গলায় বলল; তার কোথাও কোনো সন্দেহ নেই।
“কী জানি! আমার এ-সব বিশ্বাস হয় না।” অমল বলল, বলে একটু থেমে আবার বলল, “আমাদের ঠাকুর-দেবতারাও সবকিছু করতে পারতেন। তুমি সাবিত্রী- সত্যবানের গল্প জান?”
“জানি। আমি রামায়ণ মহাভারত পড়েছি। মা’র কাছে গল্পও শুনতাম ছেলেবেলায়। কত শুনেছি, ভুলে গেছি।”
অমল এক ধরনের লজ্জা অনুভব করল। তাড়াতাড়ি বলল, “যেশাস-এর গল্পও আমরা স্কুল থেকে শুনেছি। আমার খুব ভাল লাগে।”
“আমি তোমায় একদিন সবটা বলব।”
“বলো। কিন্তু…” অমল যা ভাবছিল, তা গুছিয়ে বলতে পারছিল না বলে কেমন বিব্রত হচিছল। শেষে বলল, “আগেকার দিনের লোকেরা নানারকম গল্প তৈরী করত। তারা জানত না বলে ভাবত, পৃথিবী বাসুকীর ফণার ওপর বসানো আছে। তারা বলত, ভগবান জল করলেন, স্থল করলেন, আকাশ করলেন…। আজকাল লোকে এ-সব বিশ্বাস করবে না। তুমি যদি বলো, আকাশের ওপর ভগবানরা থাকে, আমি বিশ্বাস করব না। গ্যালিলিও, তুমি গ্যালিলিওর কথা শুনেছ…?”
ভ্রমর মাথা নাড়ল, শুনেছে।
অমল বলল, “তবে! দূরবীনে আকাশ আকাশ।…তুমি কোনটা সত্যি কোনটা মিথ্যে দেখে নেবে ত!”
ভ্রমর আহত হল না, রাগ করল না। বলল, “ভগবানকে পরীক্ষা করতে নেই যীশু বারণ করেছেন।…আর ভগবান আমাদের কাছেই আছেন। ভালবাসা, সেবা, দুঃখীর ওপর মমতা…; না থাক, তুমি কেমন মুখ করছ, আমি বলব না।”
অমল বাস্তবিকই কিছু করে নি, কিন্তু ভ্রমর কেমন লজ্জা পেল যেন, কিংবা বাধা পেল কোথাও; চুপ করে গেল। চোখ নীচু করে থাকল কয়েক দণ্ড, তারপর মুখ তুলে কৃষ্ণার বিছানার দিকে তাকাল। নরম গলায় বলল, “যীশু নিজের জন্যে কিছু চান নি, সকলকে তিনি ভালবেসেছিলেন। তবু কত কষ্ট দিয়ে মানুষ তাঁকে মেরেছিল।…আমরা বড় নিষ্ঠুর। ভালবাসা জানি না।” বলতে-বলতে ভ্রমর এত তন্ময় হয়েছিল যে, সে তার ধরে-যাওয়া গলার স্বরও পরিষ্কার করল না।
অমল কথা বলল না। ভ্রমর যখন ভগবানের কথা বলে তখন তাকে অন্যরকম মনে হয়, পবিত্র, সরল এবং বিশ্বাসী। অমল ঠিক বুঝতে পারে না, কিন্তু ভ্রমরকে এ-সময় যেন অনেক বড় বলে মনে হয়, যেন অনেক বেশী জানে ভ্রমর। নিজেকে বরং অমলের ছোট লাগে, তার তর্ক বা ঝগড়া করতে আর ইচ্ছে করে না। এখন অমলের মনে হল, ভ্রমর ঠিকই বলেছে, সমস্ত মানুষ যদি ভাল হত, আমরা সকলে সকলকে যদি ভালবাসতাম, তবে সবাই সুখী হত। ভ্রমরকে কেন হিমানী- মাসি ভালবাসে না, কেন কৃষ্ণা তার দিদিকে খুব ভালবাসে না? এ- বাড়ির সকলে যদি ভ্রমরকে ভালবাসত, তবে ভ্রমর দুঃখী হত না, তার অসুখ থাকত না। ভালবাসা পেলে অসুখ থাকে না—এই আশ্চর্য কথাটা অমলের মাথায় আসার পর সে নিজেই কেমন অবাক ও অন্যমনস্ক হয়ে থাকল।
ভ্রমর অন্য কথা পাড়ল। বলল, “তোমার কোটের বোতাম সেলাই করে দিয়েছি।”
অমল মুখ ফেরাল। ভ্রমরকে দেখল। জানলা দিয়ে পালানো দুপুরটা চোখে পড়ল। আলো আরো নিস্তেজ হয়ে গেছে; ঘরে বসে রোদ দেখা যাচ্ছিল না। বাইরে বাতাস বইতে শুরু করেছে দমকা, সরসর শব্দ হচ্ছিল। পড়ন্ত দুপুরে মনটা কেমন ফাঁকা-ফাঁকা লাগে আজকাল।
