অমল বই মুড়ে কোলের ওপর রেখে হাই তুলল। আড়মোড়া ভেঙে সামনে তাকিয়ে থাকল। দুপুরটা একেবারে লালচে-হলুদ গাঁদাফলের মতন রঙ ধরে আছে, ঝিমঝিম করছে, ঠিক মনে হচ্ছে নিরিবিলিতে আকাশের কোলে গা গড়িয়ে নিচ্ছে। এখন সব চুপচাপ, সব শান্ত। বাগানে সবুজ ঘাসে কখনও দু-একটা ফড়িং, দু- চারটে চড়ুই নাচানাচি করছে। কোথাও বুঝি এ-বাড়ির কাক ও-বাড়ির কাকের সঙ্গে গল্প করছিল, তাদের কা-কা ডাক থেকে অমলের সেই রকম মনে হল। ভ্রমরের বেড়ালটাও ফুলবাগানের কাছে খানিক ঘোরাঘুরি করে বারান্দায় গিয়ে গা- গুটিয়ে ঘুমোত শুরু করেছে।
আকাশের দিকে তাকাল অমল। অনেক যেন উঁচুতে উঠে গেছে আকাশ, খুব গভীর দেখাচ্ছে; রোদের তলা দিয়ে অনেক গভীরে যেন আকাশ দেখছে। বিন্দু-বিন্দু, কালো ফোঁটা হয়ে চিল উড়ছে ওখানে। সাদা মতন একটুকরো মেঘ একপাশে দ্বীপের মতন পড়ে আছে, সেখানে চিল নেই, আকাশের নীল নেই।
আবার হাই উঠল অমলের। দুপুর ফুরিয়ে আসার বেলায় এ-রকম হয়, ঘুম পায়। চোখ জড়িয়ে আসছিল। চোখ বুজে অমল শুয়ে থাকল। শীতের বাতাস সহসা গা শিউরে দিল। বুকের ওপর দু-হাত জড়িয়ে, কোলে বাইবেল রেখে অমল শুয়ে থাকল। তার বোজা চোখের পাতার তার মধ্যে হঠাৎ ঝাপসা করে কেমন একটু স্বপ্ন মতন এল। এবং সেই স্বপ্ন ভেঙে যেতেই অমল চোখ মেলে দেখল, ভ্রমর তাকে ডাকছে : “এই—!”
ভ্রমরদের ঘরের জানলা দিয়ে হাতছানি দিয়ে সে ডাকছিল। কলাগাছের ঝোপ, অমল যেখানে বসে আছে, ভ্রমরদের ঘরের মুখোমুখি। অমল উঠল না। মুখ ফিরিয়ে নিল। ভ্রমরের ওপর অমল একটু রেগেছে। দুপুর বেলায় একা- একা বসে থাকলেও আলস্য এসে ঘুম পায় বলে অমল আজ বলেছিল, ‘তুমিও বাইরে রোদে গিয়ে বসবে চলো, গল্প করব।’ ভ্রমর মাথা নেড়েছিল, না, সে যাবে না। তার কাজ আছে।
ভ্রমর আবার ডাকল।
অমল মুখ ফেরাত না, কিন্তু সে গাঁদা-ঝোপের দিক থেকে মস্ত এক প্রজাপতিকে ঘাসের ওপর দিয়ে উড়ে-উড়ে আসতে দেখল। ঘন বেগুনী রঙের প্রজাপতিটা পায়ের কাছে এলে অমল তার ডানায় গোল-গোল দুটি চক্র দেখল, লালচে চক্র; প্রজাপতিটা ঘাসের ডগায়-ডগায় উড়ে ভ্রমরের জানলার দিকে এগিয়ে যাচিছল। অমল প্রজাপতি দেখার জন্যে মুখ ফেরাল, তারপর চোখে- চোখে সেই প্রজাপতিকে ধরে রাখতে গিয়ে একসময় আর প্রজাপতি দেখতে পেল না। দেখল, জানলায় ভ্রমর দাঁড়িয়ে আছে। হাত নেড়ে আর ডাকছে না ভ্রমর।
সামান্য বসে থেকে এবারে অমল উঠল। বই হাতে করে ভ্রমরের জানলার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। “কি?”
ভ্রমর বুঝি খুব মনোযোগ দিয়ে অমলের মুখ দেখল। “ঘুমিয়ে পড়ে- ছিলে?”
“না। ঝিমনি এসেছিল।”
“কতক্ষণ ডাকছি—”
“কেন?”
“ঘরে এসো, বলছি।”
অমল ভ্রমরকে লক্ষ করে দেখল। ভ্রমরের চোখের পাতা ফোলা, গালে বালিশের ঝালরের দাগ পড়েছে। ঘুমোচ্ছিল ভ্রমর। যেন হাসি-হাসি ভাব লুকিয়ে সে তাকিয়ে আছে। অমল কলাঝোপের দিকে ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল। “চেয়ার পড়ে আছে।”
“আমি তুলিয়ে দেব। আয়াকে বলবো…।”
ভাবল অমল। তার রাগ পড়ে গিয়েছিল। অভিমান করতেও সাহস হল না। ভ্রমরই হয়ত এবার রাগ করে বসবে। বলল, “আসছি।” বলে অমল কলা- ঝোপের দিকেই এগিয়ে গেল।
বারান্দায় চেয়ার তুলে রেখে অমল ঘরে এল। আসার সময় বসার ঘরে এবং খাবার ঘরের মধ্য দিয়ে এল। হিমানীমাসির ঘরের দরজা ভেজানো। ঘুমোচ্ছন। মেসোমশাই কলেজে, কৃষ্ণা স্কুলে; এ-সময় প্রত্যেকটি ঘর নিঃশব্দ, গোটা বাড়ি নির্জন, নিঝুম হয়ে থাকে।
ভ্রমরের ঘরে এসে অমল দেখল, বিছানার ওপর ভ্রমর বসে আছে। মাথার দিকে বইপত্র ফাউন্টেনপেন ছড়ানো। ভ্রমর ঘরে বসে-বসে পড়াশোনা করে। সে গত বছর পরীক্ষা দিয়ে হাইস্কুল পরীক্ষা পাশ করেছে। ইন্টারমিডিয়েটের বইপত্র নিয়ে বাড়িতে বসে পড়ে। এখানকার কলেজে যায় না। তার ভাল লাগে না। কৃষ্ণাদের স্কুলের সঙ্গেই মেয়েদের কলেজ, ইন্টারমিডিয়েট ক্লাস পর্যন্ত পড়ানো হয়। অল্প কিছু মেয়ে। কিন্তু কলেজ অনেকটা দূর, হেঁটে বা সাইকেল চড়ে যাওয়া তার পক্ষে অসম্ভব, টাঙা করে প্রত্যহ দু-বেলা আসা- যাওয়ারও অসুবিধে। তা ছাড়া, এই পড়াশোনা যখন শখের, তখন অকারণে কলেজ ছোটা কেন!
ঘরে ঢুকে অমল প্রথমে ভেবেছিল, ভ্রমর হয়ত তাকে একটা বিদঘুটে কোনো পড়ার কথা জিজ্ঞেস করবে। সেদিন যেমন জিজ্ঞেস করেছিল, ইনকিউ- বেশান পিরিআড কাকে বলে?…অমল জীবনে কখনও ও-রকম শব্দ শোনে নি। অবাক হয়ে বোবার মতন দাঁড়িয়ে থাকল। হোমসাইন্স একটা বাজে সাবজেক্ট। যা-তা একেবারে। শেষে বই দেখে তবে অমলকে বুঝতে হল। শরীরের মধ্যে রোগ এসে ঢোকার পর সম্পূর্ণভাবে রোগ-লক্ষণ ফুটে ওঠা পর্যন্ত যে সময়, তাকে বলে ইনকিউবেশন পিরিআড।
আজ ভ্রমর সে-সব কিছু জিজ্ঞেস করল না। দু-চারটে টুকরো কথার পর বলল, “আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ দেখলাম, তুমি চলে যাচ্ছ এখান থেকে, সুটকেস-টুটকেস নিয়ে। ঘুম ভেঙে গেল…” বলতে বলতে ভ্রমর হাসল। পাতলা দুটি ঠোঁট এবং গাল হাসির জলে ভিজে উঠল যেন, চোখ দুটি খুব মধুর দেখাল। “উঠে গিয়ে তাই দেখলাম।…” ভ্রমর এবার দুষ্টুমি করে তাকাল। তার দৃষ্টি যেন বলতে চাইল, দেখলাম সত্যিই তুমি চলে যাচ্ছ কি না!
অমল অবাক হয়ে ভাবল, একটু আগে সে-ও তন্দ্রার মধ্যে ভ্রমরকে দেখেছে। দুজনে একই স্বপ্ন দেখে নাকি?
