এ-ঘরে আলোটা এমন জায়গায় আছে, এবং তার আলো এত অনুজ্জ্বল যে ভ্রমর সামান্য আড়াল করলে তার মুখ আলো পায় না। ভ্রমর অমলের চোখ থেকে মুখ সরিয়ে নিল। কিছু বলল না।
অমল ক্ষুব্ধ হল, তার দুঃখ হল। ভ্রমর অযথা রাগ করছে। অসুখ হলে বলব না, জ্বর হলে থার্মোমিটার দিয়ে জ্বর দেখব না, শরীর দুর্বল হবে, রাস্তায় মাথা ঘুরবে, কথা বলতে হাঁপিয়ে পড়ব—তবু কাউকে কিছু বলব না—ভ্রমরের এই স্বভাব অমলের ভাল লাগে না। অমল বলল, “ভ্রমর, তোমার যদি সবসময় অসুখ হয় তুমি বাঁচবে কি করে!”
বাঁচব কি করে! মা’র কথা ভ্রমরের মনে পড়ল। হিমানী-মা’র মুখেই ভ্রমর শুনেছে, তার মা’র নাকি সবসময় অসুখ লেগে থাকত। আজকাল অসুখের কথা বললে হিমানী-মা রাগ করে কখনও-কখনও বলে ফেলে, ‘তুমি কি তোমার মা’র ধাত পাচ্ছ!’ এ-সব কথা ভ্রমরের ভাল লাগে না।
অমল অসহিষ্ণু হয়ে ডাকল, “ভ্রমর—”
ভ্রমর এবার মুখ ফেরাল। চাপা গলায় ধীরে-ধীরে বলল, “বাবাকে আর কি বলেছ?”
“বললাম যে: অসুখের কথা বলেছি। বলেছি তোমার জ্বর হয়, তুমি খুব দুর্বল হয়ে পড়েছ, তুমি…”।
“বাবা কি বললেন?”
“বললেন, ঠাণ্ডা পড়ে গেছে, তুমি যেন সাবধানে থাক, কি একটা ওষুধ আছে তোমার সেটা খেতে বললেন।” অমল থামল। সামান্য থেমে বলল, “মেসোমশাই তোমায় ডাক্তার দেখাতে বাইরে নিয়ে যাচ্ছেন শীঘ্রি…।”
ভ্রমর নিশ্বাস ফেলল। অমল যেন কানে শুনতে পেল শব্দটা। তার ভাল লাগল না। দুঃখ পাবার মতন করে অমল বলল, “ভ্রমর, আমি…আমি একটা কথা জানি।”
জলের মতন ভিজে-ভিজে দুটি কালো চোখ তুলে ভ্রমর অমলের দিকে তাকাল।
অমল ঘাড় নীচু করল। বলল “তোমার নিজের মা নেই!…আমি তোমার মা’র নামও জানি।”
ভ্রমর নিঃসাড় নিস্পন্দ হয়ে বসে থাকল। নিজের মা’র নামটি ভ্রমর এখন মনে করতে পারছিল। সুখতারা। তার মা’র নাম ছিল সুখতারা। দেবকীসিস্টার তাকে মা’র ছবি দেখাত, সিস্টারের কাছে মা’র ছবি ছিল। কোনো ছবিতেই মা’র হাসি- খুশী মুখ দেখে নি ভ্রমর।
৪
বাগানে কলাগাছের ঝোপের তলায় ছায়ায় অমল দুপুরে কাটাচ্ছিল। ক্যাম্বিসের একটা চেয়ার এনে পেতেছে বাগানে; খানিক রোদ, খানিকটা ছায়ায় গা ডুবিয়ে বসে আছে। ঘরে এ-সময়টা ভাল লাগে না, জানলা থেকে রোদ সরে যায়, ছায়া ভরে থাকে, স্যাঁতস্যাঁত করে দেওয়ালগুলো। দেখতে-দেখতে মাত্র ক’দিনের মধ্যেই কি- রকম শীত পড়ে গেল। পুরোপুরি শীতকাল হয়ে গেল এখানে। ঘরে থাকলে এই দুপুরে ঘুমোতে হবে; লেপ গায়ে টেনে একবার শুয়ে পড়লে ঘুম ভাঙবে অবেলায়। দুদিন এই রকম হয়েছে অমলের, বিকেল পড়ে গেছে যখন, তখন ঘুম ভেঙেছে। তাতে সারা শরীরে আলস্য ও জড়তা ভরে ছিল, রাত্রে ঘুম আসছিল না। একলা একটা ঘরে শুয়ে রাত্রে ঘুম না এলে কত রকম কথা ভাবতে হয়, শেষে ভয়-ভয় করে, নতুন জায়গা বলেই হয়ত নানা রকম শব্দ শুনতে পায়, কখনও গাছের পাতায় শব্দ হচ্ছে, কখনও কোনো পাখি কেঁদে উঠল, কখনও মনে হল ভ্রমর বুঝি বাথরুমে যেতে গিয়ে পা বেধে পড়ে গেল। বাড়ির কথাও ভীষণ মনে পড়ে, মনে হয় মা বুঝি তাকে দেখছে, দিদি ঠাট্টা করে বলছে—‘কি রে, কেমন বেড়িয়ে বেড়াচ্ছিস, যা না দূরে বেড়াতে, মজা বোঝ।’ দাদা বউদিও তাকে বাড়িতে দেখতে না পেয়ে খুঁতখুঁত করছে।
দুপুরের ঘুমে কোন সুখ নেই দেখে এবং অমলের অভ্যাস নয় বলে সে আর ঘরে থাকছে না। স্যাঁতসেঁতে ঠাণ্ডা থেকে বাইরে এসে রোদ-ছায়ার মধ্যে বসে দুপর কাটাচ্ছে কাল থেকে। বেশ লাগে। আকাশে অফুরন্ত রোদ, নীল হয়ে আছে আকাশটা, সূর্য কোথায় টলে গেছে, আলোর খর ভাব মরে গেছে, কী মিষ্টি গরম থেকে গেছে রোদটা। এ-সময় মাথাটুকু বাঁচিয়ে, রোদে গা রেখে শুয়ে থাকতে খুব আরাম। আলস্য যেন সর্বাঙ্গ মজিয়ে রাখে, তন্দ্রা আসে, দু-চোখের পাতা জুড়ে আসে, কিন্তু অকাতর ঘুম আসে না।
অমল আজ চেয়ারে শুয়ে-শুয়ে তার মনোমতন দুপুরটুকু কাটাচ্ছিল। মাথার ওপর কলাগাছের পাতা মস্ত ছায়ার মতন বিছানো; গায়ে পায়ে রোদ ছড়িয়ে আছে, তাত লাগলে সে সামান্য সরে বসছে। ভ্রমরদের বাড়িটার মাথায় টালির ছাউনি, দুপুরের রোদ সেখানে মেটে-মেটে পোড়া রঙ ধরিয়েছে; প্রায়-নিস্তত্ব এই বাগানে মাঝে মাঝে পাখি ডাকছে, অমলের সামনে কখনও ফরফর করে উড়ে এসে মাঠে বসছে। লীলাদের সেই ধবধবে সাদা পায়রা জোড়ার একটা সামান্য আগে এখানে এসেছিল, এখন আর তাকে দেখা যাচ্ছে না।
হাতের বইটা মুড়ে ফেলল অমল। বাংলা বাইবেল। ভ্রমরের কাছ থেকে পড়তে নিয়েছিল। খানিকটা পড়েছে। ভাল করে কিছুই মাথায় ঢুকছিল না। গল্প-গল্প যেটুকু, সেটুকু বুঝতে পারলেও এমন বেয়াড়া করে বাংলা লেখা যে, অমল অর্ধেক কথার মানেই ধরতে পারছিল না। মধুপুরার স্কুলে একবার দুই পাদ্রী বুড়ো এসেছিল। তারা ক্লাস নাইন-টেনের ছেলেদের কাউকে মথির সুসমাচার, কাউকে লুক-লিখিত সুসমাচার দিয়েছিল। ছোট-ছোট কাগজও দিয়েছিল হাতে গুঁজে। অমল পেয়েছিল লুক। অমল লুক-এর সুসমাচার খানিক-খানিক পড়েছিল। এখনও তার সেই গল্পটা মনে আছে, এক নগরে এসে যীশু একজন কুষ্ঠ-রোগী ও একজন পক্ষাঘাত-রোগীকে সারিয়ে দিয়েছিলেন। স্কুলে হেডমাস্টার- মশাই একদিন ইংরেজীর ক্লাসে ইংরেজী বাইবেল থেকে আবার ঠিক ওই গল্পটাই পড়ে শুনিয়েছিলেন। একটা কথা ছিল তার মধ্যে; “অ্যারাইজ, অ্যান্ড টেক আপ দাই কাউচ অ্যাণ্ড গো আনটু দাই হাউস।” কথাটা তার মনে আছে, কেননা, হেড- মাস্টারমশাইয়ের ক্লাস শেষ হয়ে যাবার পর তারা কয়েকজন কৌতূহলবশে ও খেলা- চ্ছলে কথাটা সেদিন বার বার বলেছিল নিজেদের মধ্যে।
