আনন্দমোহন আর কোনো কথা বলছেন না, তিনি অন্যমনস্ক, সিগারেট ধরিয়ে ইঁলাস্ট্রেটেড উইকলি আবার টেনে নিয়েছেন দেখে অমল এবার উঠল। ভ্রমরকে আজ কথাটা সে বলবে। অমল একটু গর্ব অনুভব করল, জেন সে একটা ব্যবস্থা করতে পেরেছে।
অমল উঠে চলে যাচ্ছিল, আনন্দমোহন মৃদু, গলায় বললেন, “বেশ ঠাণ্ডা পড়ে গেছে, ভ্রমরকে বলো সাবধানে থাকতে। ও কি-একটা টনিক খেত, সেটা খেয়ে যেতে বল।”
পোশাক পালটে অমল ট্রাউজারটা গুছিয়ে রাখছিল। রাখার সময় একা ঘরে গুনগুন করে গান গাইছিল। বাইরে খুব ঠাণ্ডা পড়ায় জানলাগুলো ভেজিয়ে দিয়েছে। ভ্রমর এসেছে অমল প্রথমে বুঝতে পারে নি। মুখ ফেরাবার পর ভ্রমরকে দেখতে পেল।
এ-সময় এক কাপ গরম দুধ বা কোকো খেতে হয়, হিমানীমাসির সংসারে নিত্যকর্মগুলি ঘড়ির কাঁটায় কাঁটায় চলে। ভ্রমর কোকো নিয়ে এসেছিল।
অমল গুনগুন করে যা গাইছিল তার সঙ্গে ভ্রমরের গাওয়া শেষ গানটির সুরের মিল ছিল, কথার নয়। গান থামিয়ে ভ্রমরকে দেখে অমল উজ্জ্বল মুখ করে হাসল। বলল, “কি, এই রকম সুর না?”
ভ্রমর বেশ অবাক হয়েছিল। অমলকে সে গুনগুন করে কখনো-সখনো সুর আওড়াতে শুনেছে, কিন্তু গান গাইতে শোনে নি। আজ অমল সত্যি সত্যিই গান গাইছিল। এবং ভ্রমরের মনে হল, অমল গান গাইতে জানে।
“তুমি যদি গানটা লিখে দাও আমি সবটা গেয়ে দিতে পারি।” অমল হেসে বলল, বলে এগিয়ে এসে ভ্রমরের হাত থেকে কোকোর কাপ নিল। “তোমার মতন অত ভাল করে গাইতে পারব না। তবে স্যার, চালিয়ে দেব ঠিক—” অমল উৎফুল্ল স্বরে হাসল। স্যার কথাটা বলে ফেলে সে যেন আরও মজা পেল।
অমলকে চোখে চোখে দেখল ভ্রমর। চোখ নামাল। বলল, “আমি কত গাইতে পারি!”
“পার না!” অমল চোখের পাতা বড় করে ঠাট্টা করল। বলল, “যা পার তাই বা কজন পারে!” বলে অমল কোকোর কাপে চুমুক দিল।
ভ্রমর দাঁড়িয়ে ছিল। তার পরনে কমলা রঙের মিলের শাড়ি, গায়ে পুরোহাতা বুক-খোলা মেয়েদের সোয়েটার, গলার কাছে পুরু করে আঁচলটা জড়ানো। ভ্রমর বাড়িতে যে-চটি পরে তার বাঁ-পায়ের গোড়ালিও তার বাইরে বেরোবার জুতোর মতনই উঁচু, সব সময়ই তাকে চটি পায়ে দিয়ে থাকতে হয়, নয়ত কষ্ট পায় চলাফেরায়।
বসার ঘরে হিমানীমাসি ভ্রমরের গান শুনে যে-কথা বলেছিলেন তাতে তার মন খারাপ হবার কথা। অমল বুঝতে পারল, ভ্রমরের মনে কথাটা এখনও লেগে আছে, সে ভুলে যেতে পারে নি।
“তোমার গলা সত্যিই খুব ভাল, ভ্রমর। আমি বলছি।” অমল গলায় যথেষ্ট জোর দিয়ে বলল, তার কথার মূল্য অন্যে স্বীকার করবে কি করবে-না গ্রাহ্য করল না। “আমি বেট্ ফেলতে পারি।”
ভ্রমর অন্য কথা ভাবছিল। তখন তার গান ভাল না লাগায় মা অসন্তুষ্ট হয়েছিল। মা চলে যাবার পর অমল বাবার কাছে অমন করে তার ভাল-লাগার কথাটা কেন বলল! বলা উচিত হয় নি। যদি মা শুনতে পেত! যদি বাবা মাকে বলে মা বেশ রাগ করবে। ভ্রমর বলল, “তখন বাবার কাছে তুমি ও-রকম করলে কেন?”
“ও-রকম—? কি রকম?”
“গান ভাল লেগেছে বলে চেঁচিয়ে উঠলে।”
‘বা রে…!” অমল ঘাড় দুলিয়ে বলল, “ভাল লাগলে বলব না!”
ভ্রমর আস্তে মাথা নাড়ল। “না। মা শুনলে খুব রাগ করত।”
“অমল কি একটা বলতে যাচ্ছিল, হঠাৎ খেয়াল হল ভ্রমর দাঁড়িয়ে আছে, বসছে না। “তুমি বসো, আমি বলছি একটা কথা।”
ভ্রমর দাঁড়িয়ে থাকল। সে এখন বসে-বসে গল্প করতে পারবে না।
“বসো না। বলছি বসতে—। তুমি বড় জেদী মেয়ে, ভ্রমর। তখন বসার ঘরে সকলে বসল তুমি দাঁড়িয়ে থাকলে!” অমল অসহিষ্ণু হয়ে বলল।
বাবা-মা সামনে থাকলে ভ্রমর কোনোদিন বসতে পারে না। তার কেমন একটা অস্বস্তি হয়। মনে হয়, একসঙ্গে বসলে যেন সে বাবা-মা’র সঙ্গে এক হয়ে গেল। “আমার ভাল লাগে না।” ভ্রমর বলল মৃদু গলায়।
অমল অনেকটা কোকো একচুমুকে খেয়ে নিল। বলল, “তুমি বসো, তোমায় একটা নতুন খবর দেব।” খবরটা দেবার জন্যে অমল ব্যস্ত হয়ে উঠেছিল অনেকক্ষণ থেকেই।
ভ্রমর এগিয়ে গিয়ে বিছানার ধার ঘেঁষে বসল। অমল তাকে কি বলবে বুঝতে পারল না।
“মেসোমশাইকে আজ বললাম—” অমল ক্যাম্বিসের হেলানো চেয়ারটা টেনে নিয়ে বসতে-বসতে বলল।
ভ্রমর অবাক চোখ করে তাকাল। বাবাকে কি বলেছে অমল? কি বলতে পারে? অমল বড় ছটফটে, ভেবেচিন্তে কোনো কথা বলতে পারে না। ভ্রমর মনে- মনে উদ্বেগ বোধ করল।
“মেলোমশাইকে আজ আমি তোমার অসুখের কথা বললাম।” অমল বেশ বিজ্ঞজনোচিত গলা করে বলল।
ভ্রমর সচকিত হল, সে ভীষণ অবাক হয়ে গেছে, অমলের কথা যেন ঠিক বুঝতে পারছে না। ডাগর দুটি চোখ তুলে অপলকে ভ্রমর তাকিয়ে থাকল।
“মেসোমশাই বললেন, এবার এক্সমাসের ছুটিতে তোমায় ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যাবেন। জব্বলপুর কিংবা নাগপুর।” বলতে-বলতে অমল থেমে গেল। ভ্রমরের মুখ দেখে তার গলার স্বর আর ফুটল না।
স্তব্ধ অসাড় হয়ে বসে আছে ভ্রমর। তার চোখের পাতা পড়ছে না। মুখ থমথম করছে। ভ্রমরের এই স্তব্ধতা অমলকে যেন আড়ষ্ট করে তুলল। তার সমস্ত সাহস এখন কেমন ফুরিয়ে এল, সামান্য ভয় পেল অমল। ভ্রমর কি রাগ করল? রাগের কি আছে অমল ভেবে পেল না।
“আমি ত মেসোমশাইকে বলেছি—” অমল এমনভাবে বলল যেন সে বোঝাতে চাইল, সে কোনও দোষ করে নি, অন্যায় করে নি, ভ্রমর কেন রাগ করবে! “তুমি মাসিমাকে বলতে বারণ করেছিলে, আমি বলি নি।”
