গান শেষ হল। উপাসনা শেষ করার মতই হিমানীর মৃদু গলায় ‘আমেন’ বললেন। ক্রশ আঁকলেন বুকে।
অনিন্দমোহন আবার ঢিলে-ঢালা হয়ে বসলেন। বললেন, “আর একটা গান গা— পুরনো সেই গানটা গা, অনেকদিন শুনি নি। এসো হৃদয় আবরি তোমা রাখি হে।”
কৃষ্ণা এবার উঠল। হিমানী জানলার খড়খড়ি শার্সি বন্ধ করে দিতে বললেন। বারান্দার দিকের সব ক’টি জানলার খড়খড়ি টেনে দিয়ে কৃষ্ণা বাইরের দরজাটাও বন্ধ করল, করে চলে গেল।
ভ্রমর অর্গানের রিডে আঙুল দিল আবার। গান শেষ হয়ে যাওয়ার পর সে নীরবে বসে ছিল। নিশ্বাস নিচ্ছিল। আজকাল একটু গান গাইতে সে কেমন হাঁপিয়ে যায়। ঘরের আলো তার মুখে আলোছায়া মাখিয়ে রেখেছে।
সুরটা মনে করে নিতে একটু সময় নিল ভ্রমর, তারপর গানটা মাঝখান থেকে ধরল। এ-গানের সুর বাঁধা ঘাটে থাকল না, কখনও উঁচু পরদায় উঠছিল, কখনও খাদে নামছিল। ঘরের নিবিড় আবহাওয়ায় গানটি দেখতে-দেখতে কেমন আচ্ছন্ন অবস্থা করে আনল। ভ্রমরের গলার মধ্যে খুব মিহি করে যেন এক ধরনের কী পরদা লাগানো আছে, ঝিঁঝির শব্দের মতন কাঁপে, স্বরনালীর সঙ্গে জড়িয়ে জড়িয়ে থাকে। অমল কান করে শুনল ভ্রমর চড়ায় গলা তুলতে কষ্ট পাচ্ছে। তবু সবটুকু আবেগ দিয়ে ভ্রমর গাইছিল: “আঁখি-পাশে এসো নয়ন ভরিয়া তোমা দেখি হে, এসো আবরি সকল অঙ্গ জীবন সনে রাখি হে।”
অমল মুগ্ধ হয়ে গান শুনছিল, শুনতে-শুনতে সে ভ্রমরের কষ্টটুকুও অনুভব করছিল। ভ্রমরের বুকে কষ্ট হচ্ছে, তার মুখ কেমন শুকনো হয়ে এসেছে—অমল এইসব ভাবছিল।
গান শেষ হল। হিমানী উঠলেন। উলের গোল, কাঁটা হাতে নিয়ে বললেন, “তোমার গলা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। যত্ন না নিলে কিছু থাকে না।”
ভ্রমর মুখ নীচু করল। যেন সে জানে, তার গলা খারাপ হয়ে গেছে। অক্ষমতার দুঃখটকু তার মুখে ও আচরণে প্রকাশ পেল।
“মন না দিলে কিছু হয় না। তোমার আজকাল কোনোদিকে মন নেই।” হিমানী বললেন, মুখের কোথাও বিরক্ত বা অসন্তোষ ফুটল না, শুধু গলার স্বর তাঁর অপছন্দ প্রকাশ করল।
হিমানী চলে গেলেন। অমল হিমানীমাসির ওপর ক্ষুদ্ধ হল। ভ্রমর কিছু খারাপ গায় নি। তাদের বাড়িতে রীতিমত গানবাজনার চর্চা হয়। বাবা মা দুজনেই গানের ভক্ত, দিদিরা ছেলেবেলা থেকে মাস্টার রেখে গান শিখেছে, বউদি রাঁচির মেয়ে—বাঙলা গান খুব ভাল গায়। অমল গান বোঝে, সুরও বোঝে। গানটা টপ্পার ঢঙে, ভ্রমর বেসুরো কিছু গায় নি। তবে তার শরীর দুর্বল থাকলে সে কি করে গলা তুলবে, মানুষের গলা ত আর গ্রামোফোনের রেকর্ড নয়, দম দিলেই বাজবে!
“আমার খুব ভাল লেগেছে।” অমল আনন্দমোহনের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ বলল। যেন হিমানীর কথার প্রতিবাদ করে সে মেসোমশাইকেই কথাটা শোনাল।
আনন্দমোহন অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলেন। অমলের কথা কানে যায় নি। শূন্য চোখে তাকিয়ে থাকলেন।
“ভ্রমরের গলা খুব মিষ্টি।” অমল আবার বলল।
অস্ফুট শব্দ করলেন আনন্দমোহন। আস্তে করে মাথা নাড়লেন। কথাটা যেন তিনি জানেন। ভ্রমরের দিকে তাকালেন, মনে হল কোনো কিছু বলবেন, বলার জন্যে অপেক্ষাও করলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছু বললেন না।
ভ্রমর উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। অমলের কথায় সে রাগ করেছে কি করে নি বোঝা গেল না; চেয়ার সরিয়ে নীচু মুখে সে আস্তে-আস্তে ঘর ছেড়ে চলে গেল।
ঘর এখন ফাঁকা লাগছিল। নীরবে দুজনে বসে। অমল শীত ভাবটা অনুভব করল। বাইরে বেশ ঠাণ্ডা পড়ে গেছে। গরম কোটের পকেটে হাত ঢুকিয়ে অমল কিছু বলব-বলব মুখ করে বসে থাকল।
“মেসোমশাই—” অমল এক সময় বলল।
আনন্দমোহন মুখ ফিরিয়ে তাকালেন। অমলকে দেখছিলেন। মোহিতদার কথা তাঁর মনে পড়ছিল। অমলের মুখ তার বাবার মতন। একেবারে সেই রকম ছিমছাম মুখ বড় কপাল, জোড়া ঘন ভুরু চোখের কোণের দিকে পাতা দুটি জোড়া। মোহিতদার টিকোলো নাক ছিল, অমলের নাক অতটা টিকোলো না। থুতনিও ওর বাবার মতন, ছোট অথচ শক্ত। গায়ের রঙ আধ-ফরসা। মেজদির মতন ফরসা হয় নি। মেজদি এবং ভ্রমরের মা দুজনেই ফরসা ছিল। দূর সম্পর্কের বোন হলেও খুব বন্ধু ছিল। মেজদির ছেলেটি বেশ। সমস্ত মুখে ছেলেমানুষি মাখানো। নরম শান্ত স্বভাব।
“মেসোমশাই, ভ্রমরের কোন অসুখ করেছে।” অমল বলল খুব আচমকা; এমন কি সে যেন নিজেও ভাল করে জানতে পারল না কি বলেছে।
“অসুখ!” আনন্দমোহন অসতর্কভাবে বললেন, নিম্নস্বরে। তাঁর দৃষ্টি খানিকটা অপরিচ্ছন্ন।
“ও খুব উইক। একটুতেই হাঁফিয়ে পড়ে।” অমল যেন অত্যন্ত দায়িত্ববান হয়ে পড়ল হঠাৎ। ভ্রমরের অভিভাবকের মতন বলতে লাগল, “প্রায়ই জ্বর হয়। মাথা ঘোরে।”
“হ্যাঁ—” আনন্দমোহন মাথা নাড়লেন সামান্য, “খানিকটা অ্যানিমিক হয়ে পড়েছে। কি জানি, এ-রকম ভাল জায়গায় থাকে, তবু শরীর ভেঙে যাচ্ছে কেন! একজন ভাল ডাক্তার দিয়ে দেখাতে হবে।”
“জব্বলপর…”
“জব্বলপুর নাগপুরে যেখানে হোক নিয়ে যাব ওকে।…দেখি, এবার ক্রীশমাসের ছুটিতে…”
কথাটা আনন্দমোহন শেষ করলেন না আর।
অমল হিসেব করল। মাস দেড়েক প্রায়। ততদিনে অমলেরও যাবার সময় হয়ে যাবে। এ-সময় ভ্রমর যদি বাইরে যায় এ-বাড়ি অমলের ভাল লাগবে না। এক্সমাসের পর অমলও ফিরবে, তখন যদি ভ্রমররা যায়, জব্বলপুর হলে সবচেয়ে ভাল, তাহলে অমলও সঙ্গে যেতে পারবে। মন্টুমামার বাড়িতে সবাই মিলে উঠবে।
