“তোমাদের বিহার বাঙলা দেশ থেকে ক মাইল? গাড়িতে চেপে একবেলায় যাওয়া-আসা যায়। আমরা পড়ে আছি সাত আটশো মাইল দূরে।” বলে আনন্দমোহন একটু সময় চুপ করে মনে মনে কি ভাবলেন, তারপর হেসে ফেলে বললেন, “আজ কতকাল যে পোস্ত খাই নি তা যদি জানতে।”
হিমানী মুখ তুলে স্বামীকে দেখলেন একবার, কিছু বললেন না।
অমল হেসে ফেলল। তার বাবাও ঠিক এই রকম। খেতে বসে এক-একদিন হঠাৎ পোস্তর কথা মনে হলে মাকে বলেন, কই গো, একটু পোস্ত-টোস্ত করলে না। তুমিও ত বাঁকড়োর মেয়ে, পোস্ত খেতে ভুলে যাচ্ছ নাকি!
“বাবাও বলেন।” অমল বলল হাসির গলায়, “মাকে বলেন।”
ভ্রমর সিগারেটের টিন নিয়ে ফিরল। আনন্দমোহন হাত বাড়িয়ে টিনটা নিলেন। “বলবে বই কি! মোহিতদা আর আমি যখন কলেজে পড়তাম, কৃশ্চান কলেজে, তখন একবার ঠিক করেছিলাম বড় হয়ে জয়েন্টলি একটা রিসার্চ পেপার করব, পোস্তর নিউট্রিশান সম্পর্কে…” বলতে বলতে আনন্দমোহন হোহো করে হেসে উঠলেন। অমলও হাসল। হিমানী মুখ তুললেন। কৃষ্ণাও তাকিয়ে থাকল। ভ্রমর ততক্ষণে একপাশে বসেছে।
তোমার মা—মানে রমাদিকে আমরা মেজদি বলতাম ঠাট্টা করে। জ্ঞান-উকিলের মেয়ে, জ্ঞান দিয়ে কথা বলত; বলত, বেশী পোস্ত খেলে কুষ্ঠ হয়। মাথায় কেউ ঢুকিয়ে দিয়েছিল কথাটা।” বলতে-বলতে সহসা তিনি থেমে গেলেন। এবং পরে চকিতে একবার ভ্রমরের দিকে তাকিয়ে নীরব হয়ে থাকলেন।
আনন্দমোহন কলেজে কেমিস্ট্রি পড়নি। সিনিআর প্রফেসার। অমল বাবার কথা এ-সময় না ভেবে পারল না। বাবা বি. এস-সি. পড়তে পড়তে রেলের মেকানি- ক্যাল ট্রেনিংয়ে ঢুকে পড়েছিলেন। জামালপুরে ছিলেন। অমলও বি. এস-সি-তে অ্যাডমিশান নিয়েছিল, কলেজে ঢুকতে না ঢুকতে অসুখ করল—টাইফয়েড, টানা দেড় মাস বিছানায়, তারপর শরীর কিছুটা সেরে উঠতে-উঠতে পুজো কাটল, বাবা ততদিনে অন্য ব্যবস্থা করে ফেলেছেন, মেকানিক্যাল অ্যাপ্রেনটিশসিপ অমল পাবে এই রকম একটা কথা পেয়ে যাওয়ায় আর কলেজে পাঠালেন না অমলকে। বরং অসুখের পর শরীর স্বাস্থ্য ভাল করতে, বাইরে থেকে কিছুদিন বেড়িয়ে আসতে এখানে পাঠিয়ে দিলেন।
সিগারেট ধরিয়ে নিয়েছেন আনন্দমোহন। এক মুখ ধোঁয়া নিয়ে আস্তে আস্তে ঢোঁক গিলছিলেন। ঘরের আলো ধবধবে নয়; এ-বাড়িতে ইলেকট্রিক নেই। বড় মতন একটা জাপানী বাতি জ্বলছিল, কাচের প্লেটের ওপর রাখা পেতলের পালিস করা টেবল-ল্যাম্প, বড় ফুলদানির মতন দেখতে অনেকটা, কাচের সরু চিমনি গলা তুলে আছে, গায়ে গোল ধবধবে সাদা ডোম। মোলায়েম আলোয় ঘর অর্ধেকটা আলো- কিত, বাকিটুকু ছায়া-ছায়া, ধূসর। আনন্দমোহনের ছায়া হিমানীর কাছাকাছি গিয়ে আকারহীন হয়ে পড়ে আছে। হিমানীর ছায়া অন্ধকারে মিশেছে। ভ্রমর ও কৃষ্ণার পায়ের তলায় অমলের মাথার ছায়াটুকু দেখা যাচ্ছিল।
ঘরটা খুব চুপচাপ হয়ে গিয়েছিল। আনন্দমোহন হয়ত তাঁর যৌবনের স্মৃতি দেখছিলেন, অথবা অন্য কোনো কথা ভাবছিলেন।
হিমানী বোনার কাঁটা কোলে রেখে বললেন, “ভ্রমর, তুমি ক’দিন কোনো উপাসনা গাও নি।”
ভ্রমর মা’র দিকে তাকাল। কৃষ্ণা অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে থাকায় চঞ্চল অস্থির হয়ে উঠেছিল। সে হয়ত পড়ার নাম করে উঠে যেত, উপাসনার কথায় উঠতে পারল।
নীরবে ভ্রমর উঠল। শান্তভাবে গিয়ে অর্গানের কাছে বসল। হিমানী কোলের ওপর থেকে উলের গোলা ও কাঁটা সরিয়ে পাশে রাখলেন। গায়ের চাদর গুছিয়ে সোজা শক্ত ভঙ্গিতে বসলেন এবার। কৃষ্ণাও স্থির হয়ে বসল।
অর্গানের শব্দ উঠল খাদে। রিডের ওপর দু-হাতের আঙুল ফেলে ভ্রমর কোনো গানের সুর তোলার আগে অন্যমনস্কভাবে একটু, অর্গান বাজাল। অমল মুখ ঘুরিয়ে বসল অর্গানের দিকে। আনন্দমোহন হাতের সিগারেট নিবিয়ে ছাইদানে ফেলে দিলেন। সোজা হয় বসলেন।
সুর তুলে ভ্রমর গান শুরু করল; তিনি মহিমাতে সজ্জিত…সদা প্রভু সজ্জিত…।”
অমল এ-বাড়িতে এসে এই রকম গান প্রথম শুনছে। ভ্রমর তাকে বলেছে এ-সব গান তাদের প্রার্থনা সঙ্গীত। অন্য রকম উপাসনা সঙ্গীতও আছে—সেগুলো একেবারে বাঙলা—সবাই শুনেছে। তবে এই গানটা অন্যরকম, অদ্ভুত লাগে শুনতে। এ-গানের সুর অন্য গানের মতন নয়। মনে হয় যেন একটি স্থায়ী সুরে রয়েছে, বাঁধা সুর, শুধু, শব্দগুলি বদলে যাচ্ছে। অতি উচ্চে স্বর উঠছে না। প্রার্থনার মতনই আগাগোড়া গানটি গাওয়া হয়ে চলেছে। গানের পদগুলিও কেমন অদ্ভুত। ভ্রমর গাইছিল; “তোমার সিংহাসন অটল…হে সদাপ্রভু…চিরদিনের জন্য পবিত্রতা তোমার গৃহের শোভা।”
অর্গানের ঘন গভীর শব্দের সঙ্গে ভ্রমরের মিষ্টি চিকন গলার সুর মধুর হয়ে মিশে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, ভ্রমর তার সর্বান্তঃকরণ দিয়ে এই উপাসনাটুকু গাইছে, তার সমস্ত হৃদয় সদাপ্রভুর মহিমার কাছে নিবেদিত।
হিমানী শান্ত নিশ্চল হয়ে বসে, আনন্দমোহন শূন্যের দিকে তাকিয়ে আছেন। কৃষ্ণা অভ্যস্ত ভঙ্গিতে বসে, তার চোখ চঞ্চল। এই ঘরের আবহাওয়া আস্তে আস্তে কেমন পালটে গেল। এখন আর অন্য কিছু মনে পড়ছে না, ভ্রমরের মুখ আরও যেন করুণ, সুন্দর হয়ে উঠছে। অমলের ইচ্ছে হল ভ্রমরের সঙ্গে গলা মিলিয়ে ওই গান একটু গায়, ‘মহিমায় সজ্জিত’ শব্দটা তার বড় ভাল লাগছিল। দরজার মাথায় মেহগনি কাঠের যীশুমূর্তির দিকে তাকিয়ে অমল সেখানে ঘরের ছায়া দেখল।
