ওঁর বয়স এখন পঞ্চাশ। চেহারায় আরও একটু বেশী মনে হয়। ছিপছিপে গড়ন, রঙ ময়লা। মাথার চুল কোঁকড়ানো, বেশীর ভাগই সাদা। মুখে লম্বা ধরনের, গালের হাড় চোখে পড়ে। নাকের ডগা একটু বেশী রকম মোটা ও ফোলা, ঠোঁট পুরু। চোখে ক্যারেট গোল্ডের চশমা। আনন্দমোহনকে সাদাসিধে সরল নির্বিরোধ শান্ত প্রকৃতির মানুষ বলেই মনে হয়।
“আমি জঙ্গল-চাঁদমারি দেখেছি।” অমল বলল।
“দেখেছ!…কেমন লাগল? ভাল নয়!…আমার, বুঝলে অমল, ওই জায়গাটা বেশ মনের মতন। কোয়্যাট, পিসফুল…। ওই জল-চাঁদমারি নিয়ে একটা গল্প আছে এখানে।”
জল-চাঁদমারির গল্প অমল ভ্রমরের কাছে শুনেছে। গল্পটার কথায় সে ভ্রমরের দিকে তাকাল। ভ্রমর এখনও একইভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সে কেন বসছে না অমল বুঝতে পারল না। ওর অস্বস্তি হচ্ছিল। জ্বর থেকে উঠে ভ্রমর খুব দুর্বল হয়ে পড়েছে। তিন-চারদিন কেটে গেল এখনও শরীরে জুত পাচ্ছে না। এক রাত্রির অসুখ তার অনেকখানি শক্তি শুষে নিয়েছে। ভ্রমরের শরীরের জন্যেই আজ অমল কাছাকাছি বেড়াচ্ছিল, দূরে কোথাও যায় নি। কৃষ্ণা তাই বিরক্ত হয়ে তাদের সঙ্গে না বেড়িয়ে লীলাদের বড়ি চলে গিয়েছিল। অমল অস্বস্তি বোধ করে ভ্রমরকে বার কয়েক দেখল এখন। ভ্রমরের বসা উচিত, এ-ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে ওর পায়ে কষ্ট হয়; ওর বিশ্রাম নেওয়া দরকার।
“চাঁদমারি হয় ডাঙায়—” আনন্দমোহন বললেন, “এখানে জল-চাঁদমারি কেন! গল্পটা যা বানিয়েছে এরা—”
“ভ্রমর আমায় বলেছে।” অমল বলল, “শীতকালে ওই ঝিলে অনেক পাখি আসত নানা দেশ থেকে, চাঁদনিরাতে নৌকো চড়ে রাজবাড়ির লোক আর সাহেব- মেমরা পাখি মেরে হাতের টিপ ঝালাত। একবার—”
একবার কি ঘটেছিল আনন্দমোহন অমলকে আর বলতে দিলেন না, নিজেই বললেন। শোনা গল্প অমল আরও একবার শুনল। শীতকালে রাজারাজড়াদের নেমন্তন্ন পেয়ে শিকারে আসত সাহেব-সুবোরা। বনজঙ্গলে শিকার চলত বাঘ ভাল্লুকের, আর ওই ঝিলে ছোট ছোট বোট ভাসিয়ে ওরা জ্যোৎস্না রাত্রে ফুর্তি করত, হাতের টিপ দেখাত, অকারণ আনন্দ পেতে ঘুমন্ত পাখিদের ওপর বন্দুকের ছররা গুলি চালাত। একবার বিশাল একঝাঁক অদ্ভূত পাখি, হিংস্র বন্য ভয়ঙ্কর বিহঙ্গরা তার শোধ নিল। পাঁচ-সাতশো পাখি জ্যোৎস্নাকিরণ আচ্ছন্ন করে এক শিকারী সাহেবের সারা গা কামড়ে-কামড়ে রক্তাক্ত করে মেরে ফেলল, মেমসাহেবের একটি চোখ ঠূকরে অন্ধ করে দিল। তারপর থেকেই ওই ঝিলে পাখি শিকার বন্ধ।
আনন্দমোহন গল্প শেষ করলেন যখন, তখন অমল জল-চাঁদমারির এখনকার অবস্থাটা মনে-মনে দেখছিল। ঝিলটা সত্যিই মস্ত বড়, ডাঙায় অজস্র গাছপালা, কোথাও কোথাও বেতঝোপ, জলে সবুজ ভেলভেটের মতন পুরু, শ্যাওলা, তিরতিরে পাতা, জলজ উদ্ভিদ, আর রাশি রাশি পদ্ম শালুক। গাছে-গাছে পাখি ডাকছে। শান্ত নিস্তব্ধ নির্জন হয়ে থাকে জায়গাটা।
“আমি সেদিন গিয়েছিলাম। এবারে এখনও পাখি আসে নি।” অমল বলল।
“শীত পড়ে গেছে, এইবার আসবে—” আনন্দমোহন বললেন, “তবে শুনেছি আগের মতন ভ্যারাইটি আর আসে না।” চলে-যাওয়া পাখিগুলোর জন্যে যেন সামান্য বেদনা অনুভব করলেন উনি, সামান্য থেমে কি ভাবতে-ভাবতে বললেন, “আমরা ছেলেবেলায় দেখেছি, আমাদের বাঁকুড়ার দিকে ধানকাটা হয়ে যাবার পর শীতে এক- এক সিজন-এ বহু পাখি এসে যেত, মাঠে বসত, গাছপালায় থাকত, তারপর আবার উড়ে যেত দু-চার দিন পরেই। ওরা কোথায় যেত কে জানে, যাবার পথে আমাদের গ্রামট্রামের দিকে রেস্ট নিতে থামত বোধ হয়—” আনন্দমোহন হাসার মতন মুখ করলেন সামান্য।
ভ্রমর তখনও দাঁড়িয়ে আছে। অমল অধৈর্য হয়ে উঠছিল। হিমানী একপাশে বসে উল বুনে যাচ্ছেন, কৃষ্ণা বসে বসে কোলের ওপর ইলাস্ট্রেটেড উইকলি টেনে নিয় ছবি দেখছে।
“বুঝলে, অমল—” আনন্দমোহন দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে হঠাৎ বললেন, তাঁর গলার স্বর গাঢ় ও বিষণ্ণ শোনাচিছল, “এ-সব জায়গার ভাল সবই, ক্লাইমেট ভাল, কাজকর্ম করে সুখ আছে, কলেজে অল্প ছেলে, ওবিডিয়েন্ট…তবু আর ভাল লাগে না। বাঁকড়ের কথা বললাম না, সঙ্গে সঙ্গে মনটা কেমন হয়ে গেল, আমাদের সেই নিজের দেশ-বাড়ির কথা মনে পড়ছে।…এবার রিটায়ার করে চলে যাব। আর ক’টা বছর!”
“ভ্রমর, তুমি বসো।” অমল আচমকা বলল, অধৈর্য হয়ে। এমন চোখ করে তাকাল যেন সে অত্যন্ত বিরক্ত ও অস্থির হয়ে উঠেছে।
ভ্রমর পলকের জন্যে চোখে চোখ রেখে অমলকে দেখল। এগিয়ে এসে কোথাও বসল না।
“কি রে, তুই দাঁড়িয়ে আছিস কেন—?” আনন্দমোহন ঘাড় পাশ করে ভ্রমরকে দেখলেন একবার, “বোস, বোস কোথাও।…আচ্ছা শোন, আমার ঘর থেকে সিগারেটের টিনটা নিয়ে আয়—”
ভ্রমর সিগারেট আনতে চলে গেল। যাবার সময় একবার অমলের দিকে তাকিয়ে- ছিল, যেন চোখে-চোখে বলে গেল, আ, ছটফট করো না, চুপ করে বসে থাক।
আনন্দমোহন আরও একটু অলসভাবে বসলেন, মাথার ওপর হাত তুলে আলস্য ভাঙলেন। বললেন, “মোহিতদাকে কতবার লিখেছি এই বেলা আমার জন্যে বাঁকড়ো টাউনের কাছেপিঠে একটু জমিজায়গা দেখে রাখতে—তা তোমার বাবা গা করে না। তার ধারণা আমি সারাটা জীবন বাইরে বাইরেই কাটাব।…বাঙালীর ছেলে কোন দুঃখে বিদেশে পড়ে থাকে, বাড়ি ফিরতে তার কত সাধ তা তোমার বাবা যদি বুঝত…!”
“আমরাও ত বিহারে থাকি।” অমল হাসিমুখ করে বলল।
