নদীর পানিতে তোলপাড়। ছোট ছোট ঢেউ ভাঙে আর গড়ে–গড়ে আর ভাঙে–যে ভাঙায় তৈরি হয় আবুল হাশেমের নিজের নকশা। পানির নিচে গুচ্ছ গুচছ ঘাস–ডানে বামে সামনে পেছনে ঘাসের বিস্তার। যে জায়গাতে পা রাখে না কেন সেটাই ওর জন্য স্বস্তি। দূরের প্রান্তর জুড়ে সবুজ দিগন্তের কাছাকাছি রেখাটি সবুজ এবং আবুল হাশেমের হৃদয় এখন সবুজ–যদি কেউ বলে ওটা ফসিল হয়েছে তাহলে ও মানবে না। মণিমালার স্মৃতিই ওর সব বলে মন মানতে চায় না। সে গণ্ডি পেরিয়ে ও যেতে চায় অন্য কোথাও, আরো দূরে। বাহাত্তর বছর বয়স হলেই হৃদয়ের রঙ পাল্টায় না, সেটা কাশফুল হয়ে যায় না। ওর শরীরের লোমগুলো ধানের কচি চারার মতো সবুজ হয়েছে–এখানে অন্য কোনো রঙ মানায় না। এই রঙ নিয়ে ও অনায়াসে একজন বিধবা নারীর কাছে যেতে পারে–তার গর্ভে উৎপাদন করতে পারে সন্তান।
জবেদ আলী বলেছে এই চরে ও ঘর ওঠাবে–নতুন বাঁশ, বাঁশের বেড়া, হোগলার ছাউনি দিয়ে ঘর। প্রথম বসতি হবে ওর। নতুন মাটিতে এক নতুন জীবনের শুরু। যার নাম সংসার। বলেছে, রাহানুমকে নিয়ে সংসার পাতবে ও। এই জমি ও চাষ করবে। লাঙল আসবে, হালের বলদ আসবে, বীজ আসবে। নতুন জমি বিক্ষত হবে লাঙলের ফলায়–বিক্ষত হবে রাহানুম, ওর জমিতেও চাষ হবে, বীজ বোনা হবে। সোনালি ফসলে ভরবে জমিন, ভরবে জীবন। দুয়ে মিলে গড়ে উঠবে সংসার। ওহ সংসার! আবুল হাশেম উত্তর দিকে মুখ করে দাঁড়ালে বাতাসে ওর চুল ওড়ে, ভুরু কাঁপে। বুকটা আইচাই করে। সংসার? মণিমালার সঙ্গে ওর একটা সংসার ছিল। সে স্মৃতি ঝাপসা হয়ে এসেছে, যদিও প্রয়োজনে সেই স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরে নিজেকে ক্ষয়ে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে চায়। কিন্তু সে অনুভূতি তাৎক্ষণিক, সাময়িক। এখন ও নূরবানুকে নিয়ে সংসার করার কথা ভাবছে। নতুন জমির মালিক হলে সংসার ছাড়া সে কর্তৃত্ব জমে না। জমি ওকে স্বপ্ন দেখাচ্ছে। কারণ রাত্রিবেলা ঘর থেকে বেরোলেই ওর সামনে থাকে ফকফকে জ্যোৎস্না। ও অমাবস্যা। ভালোবাসে না। ও একজন মানুষ। ওর কান্না পায়, সুখ হয়। মরণের সুখ, একাকিত্বের সুখ। কী যেন একটা ওকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। কী? জলোচ্ছ্বাসের গভীর কালো রাত? কুয়োকাটার পূর্ণিমা? গভীর সমুদ্র? সেই অদ্ভুত সুন্দর রঙিন মাছটা? তখন ওর মনে হয় ওই মাছটাই ওর সব। ওটাকে জুড়েই ওর আকাক্ষা এবং মন কেমন করা।
দেখতে দেখতে সাত দিন পেরিয়ে গেল এখানে। জবেদ আলীর সঙ্গে রাহামের বিয়ের কথা পাকাপাকি হয়েছে। রাহানুমের মতামত নেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। আবুল হাশেম জানে রাহানুম বিয়ের জন্য মুখিয়ে আছে। জবেদ আলীর বাপ আপত্তি করেনি। তার বলার কিছু নেই। আবুল হাশেম জানে ওর নিজের মেয়ে হলে এই বিয়ে হতো না। মালিকের মেয়ের সঙ্গে বর্গাদারের ছেলের বিয়ে হয় না। হতে পারে না। মেয়ে যদি বর্গাদারের ছেলের প্রেমে পড়ে ঘর ছেড়ে পালিয়ে যেত তাহলেও ও মেয়েকে ধরে এনে দু’টুকরো করে কেটে নদীতে ভাসিয়ে দিত। এখন ও রাহানুমকে বিদায় করতে চাইছে। ওর জীবনে রাহালুমের প্রয়োজন ফুরিয়েছে। তাই ও অনায়াসে জবেদ আলীর বাপকে বলে দিতে পেরেছে যে রাহানুম ওর কোনো সম্পত্তি পাবে না। এসব নিয়ে বাপ-ছেলেতে যেন কোনো চিন্তাভাবনা না করে।
শুনে জবেদ আলী মুচকি হেসেছে। তারস্বরে বলেছে, মোর সম্পত্তি লাগবে না। মুই সম্পত্তি দি হরমু কী? আর নিচুস্বরে বলেছে, মুই। রাহানুমের ছাড়া বাঁচুম না।
শুনে আবুল হাশেম মনে মনে হেসেছে। যৌবনে ও মণিমালাকে বলেছিল, তোমারে ছাড়া মুই বাঁচুম না।
এখন ওর কাছে মণিমালার স্মৃতি ঝাপসা।
শৈশবের সুখদীপকে কোলে নিয়ে দোলাতে দোলাতে রাহানুম বলত, বাবো এই পোলাডারে ছাড়া মুই বাচুম না।
সুখদীপ ছিল রাহামের সুখের প্রদীপ। এখন? সব কেমন উল্টে গেল। তাহলে তিনজনের এই একত্রে বসবাস কি মিথ্যে? এখন তো ওরা একে অপরকে ছাড়া বাঁচতে চাইছে। এই বাঁচাকে সত্য করে তুলতে চাইছে। তাহলে এই এত বছরের দিনগুলোর কী হবে? নদীর মতো বয়ে যাওয়া দিন।
নদীর ধারে দাঁড়িয়ে শূন্য চরের ওপর দিয়ে তাকালে দূরের গাছপালা দেখা যায়–মাঠের পরে মাঠ, ছোট ছোট বাড়ি। আবুল হাশেম একটুক্ষণ পায়চারি করে। চমৎকার একটি কাচপোক ওর মাথার চারপাশে ঘঘারে। তারপর উড়ে গিয়ে নলখাগড়ার মাথার ওপর গিয়ে বসে–আবার উড়ে আসে। পোকাটি এক ধরনের শব্দ করে, সেই শব্দ অনুসরণ করে আবুল হাশেম নিজের দিকে তাকায়, দেখতে পায় এই নতুন চরের পলিমাটিতে ও ছাড়া আর কেউ নেই। এই নদী, কাচপোকা এবং ওর মধ্যে সখ্য স্থাপিত হয়েছে। এই তিনজনকে নিয়ে সংসার নয়। এই তিনজন একে অপরের পরিপূরক। পরস্পরের নির্ভরতা মাত্র, যেমন নির্ভরতা ছিল ওদের তিনজনের সংসারে। সেই সংসারে এখন ভাঙন, প্রবল ভাঙন, কারণ সেখানে নতুনের প্রবেশ ঘটেছে। তাই তছনছ হয়ে গেছে আশা, ভেসে যাচ্ছে সব, সব। কে ঠেকাবে? কেউ তো নেই। কেউ না।
একটু পর পর নৌকা বোঝাই বাঁশ, গোলপাতা ইত্যাদি নিয়ে জবেদ আলী এবং ওর বাপ আসে। ওরা আজ ঘর তুলবে। প্রথমেই দখল দেবে, তারপর অন্যদের সঙ্গে মারামারি-লাঠালাঠি ইত্যাদি। রক্ত ঝরবে এবং মৃত্যু ঘটবে, অবধারিত সত্য। এ অভিজ্ঞতা আবুল হাশেমের জীবনের।
কারণ ও জীবনের এইসব ঘটনার বাইরে নয়। বাইরে থাকতেও চায় না।
জবেদ আলীদের সঙ্গে আরো দুজন কামলা এসেছে। ওরা ঝটপট বঁশ পোঁতার কাজে লেগে গেছে। কোনোরকমে বাঁশ পুঁতে চারদিকে বেড়া দিয়ে ওপরে পাতার ছাউনি দিয়ে দিলেই হয়ে যায়। এটা দখলের প্রথম শর্ত।
