এইসব ভাবতে ভাবতে আবুল হাশেম রান্নাঘরের দরজায় এসে দাঁড়ায়। খিদে পেয়েছে। বেশ রাতও হয়েছে। এখন ঘুমুতে হবে। ভীষণ ঘুম পাচ্ছে। ও দেখতে পায় রাহামের রান্না শেষ। ও গামলায় ভাত বাড়ছে, বাটি ভর্তি মাছের তরকারি, চমৎকার খুশবু ছুটেছে। পেটের ভেতর নাড়ি পাক দিয়ে ওঠে। সেই কোন দুপুরে খেয়েছে, তারপর আর কিছু খাওয়া হয়নি। আগুনের আঁচে রাহালুমের চেহারা লালচে হয়ে উঠেছে, শ্যামলা গালে হাসিতে টোল পড়ে। ওর চোখের কোণে দুটো জল। ও কি কাঁদছে নাকি ঘাম? আবুল হাশেম গলা খাকারি দেয়। রাহানুম ওর দিকে তাকায় না। মুখ না তুলেই বলে, বাবো আমনহে হাতনায় বয়েন। মুই ভাত আনি। সুখদীপ? ও সুখদীপ?
রাহানুম গলা উঁচিয়ে ডাকলে আবুল হাশেম বাধা দেয়, থাক অরে ডাইকো না। মুই দেহি।
আবুল হাশেম দু’পা এগুতেই দেখতে পায় জবেদ আলী ওকে চ্যাংদোলা করে দোলাতে দোলাতে নিয়ে আসে। যেন ওকে বধ্যভূমিতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, যেটুকু জীবনশক্তি আছে সেটুকুও নিঃশেষ করা হবে। ও আর কোনোদিন ওদের পথের বাধা হয়ে থাকবে না। সুখদীপ হাত-পা ছুঁড়ছে, প্রাণপণে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছে। ও ওর সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিপক্ষের সঙ্গে লড়ছে। কিন্তু জবেদ আলীর সঙ্গে ও পারবে কেন?
ওই অবস্থায় আবুল হাশেম ওকে জাপটে ধরে কোলে নেবার চেষ্টা করে। বলে, থাম, দাদা ভাই, থাম। দেহি কার গায়ে বল বেশি। আয়, মোর ধারে আয়।
সুখদীপ আবুল হাশেমের হাত কামড়ে দেয়। তখন জবেদ আলী ওকে ধপ করে নিচে নামিয়ে দেয়। আবুল হাশেম উহ্ শব্দ করে কামড়ের জায়গায় থুতু লাগায়। দাতের দাগ বসে গেছে। জ্বালা করছে, তবে রক্ত বের হয়নি। আবুল হাশেমের মৃদু কাতরানিতে সুখদীপ ঘাড় বাঁকা করে ওর দিকে তাকিয়ে থাকে। জবেদ আলী গজগজিয়ে বলে, ছ্যামড়া মানুষ না, শয়তানের ছাও। আস্ত ইবলিশ।
ততক্ষণে রাহানুম ওদের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। ও হাঁটু গেড়ে বসে সুখদীপকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে। বলে, আও বাজান, ভাত খাও। তোমার ভাত খাওয়া অইলে এউক্কা গল্প কমু।
গল্প? থুঃ।
সুখদীপ রাহামের মুখের ওপর থুতু ছিটায়। সে থুতু ছিটিয়ে ছড়িয়ে যায় চারদিকে। থুতু গিয়ে লাগে জবেদ আলীর মুখে এবং আবুল হাশেমের মুখেও।
ওরা কেউ থুতু মোছর জন্য নিজেদের হাত ওঠাতে পারে না, যেন এক শীতল স্পর্শ কামড়ে ধরে আছে ওদের চামড়া–ঘষলেই যা মুছে। যাবে না। ওই থুতু ওদের শরীরে এক স্থায়ী দাগ।
০৩. আন্ধারমানিক নদীর কিনারে
আন্ধারমানিক নদীর কিনারে চোখ বুজে দাঁড়িয়ে থাকে আবুল হাশেম। নতুন চরের গন্ধ ওর ফুসফুস বেয়ে নিচের দিকে নামতে থাকে। চর জেগেছে মাত্র–এই নিয়ে বিভিন্ন শরিকের মধ্যে বিরোধ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে–প্রভাবশালীরা অন্যায়ভাবে দখল করতে চাচ্ছে। কিন্তু আবুল হাশেম জানে শেষ পর্যন্ত কেউই টিকতে পারবে না, কারণ ওর কাগজপত্রে কোনো ফাঁক নেই। কিন্তু ভয় একটাই, চর দখলের সময় কেউ কাগজপত্রের ধার ধারে না। জোর যার মুল্লুক তার, এমন একটা ভাব নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে ক্ষমতাশীলরা। ওর খানিকটা মন খারাপও হয়ে যায়। কারণ ও জানে শক্তির জয় সর্বত্র–অন্যায়কারীরা অর্থের জোরে বিভিন্নভাবে প্রতিষ্ঠা পায়। আবুল হাশেমের তো এখন অর্থ নেই, লোকবলও নেই। কেমন করে ও শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে? ভয়ে বুকের ভেতর কুঁকড়ে যায়। ভয় পেলে, মন কুঁকড়ে থাকলে ওর করোটিতে সোনালি মাছ ডানা মেলে না। আর সোনালি মাছ ডানা না মেললে ও স্বপ্ন দেখতে পারে না।
আবুল হাশেম দ্রুত নিজের ভেতর থেকে ভয় তাড়িয়ে দিতে চায়। যৌবন ফিরে পাবার আকাঙ্ক্ষায় ও শক্তি সঞ্চয় করে মনে মনে। উড়িয়ে দেয় অমূলক আশঙ্কা। ধরে নেয় ও একাই এই একচ্ছত্র সাম্রাজ্যের মালিক। যে জমি একদিন ওর ছিল, যা একদিন নদীগর্ভে চলে গিয়েছিল, তা এখন আবার ওর মণিমালা হয়ে ফিরে এসেছে। ওর ভয় কী? ভয় কেন থাকবে? বিয়ের পরে ওদের যখন নতুন জীবন তখন মণিমালা ওকে ভালোবাসার কথা বলত। আর যে গভীর ভালোবাসা পায় সে তো সাহসী পুরুষ।
মণিমালা বলত, মোর জমি আমনহের জমি। আমনহেই বেবাক জমির মালিক। মোরে দু’গা ভাত দিবেন ক্যাবল।
আহ, কি প্রবল ভালোবাসা ছিল মণিমালার কণ্ঠে, দৃষ্টিতে, আচরণে। মণিমালা গভীর মমতায় ঘিরে রেখেছিল ওকে। ওর কোনো অভাববোধ ছিল না। মণিমালার মতো স্ত্রী থাকলে কোনো পুরুষ মানুষের ভয় থাকে না। ওর কোনো ভয় ছিল না। এখন তো মণিমালা ওর পাশে নেই–শুধু স্মৃতি। স্মৃতিটুকু আঁকড়ে ধরে ও নদীর কিনারে দাঁড়িয়ে পা দাবায়। থেমে যায় বুকের ভেতরের কাঁপুনি করোটিতে ভেসে আসে সোনালি মাছ। ও মণিমালার উদ্দেশে বঙ্গে, তুমি মোর বেবাক কিছু–মোর টাহার পাহাড়, মানুষের গায়ের বল। মণিমালার স্মরণে দীর্ঘকাল পর আবুল হাশেমের চোখে দুফোঁটা জল গড়ায়। এখন গভীর করে ওকে আর। তেমন মনে পড়ে না। এই মুহূর্তে শক্তি সঞ্চয়ের জন্য মণিমালাকে প্রয়োজন–কারণ মণিমালার স্মৃতি ছাড়া ওর পাশে আর কেউ নেই।
ও হাতের তালুতে চোখের জল মুছে ফেলে। জানে, ওর ভয় কেটে গেলে বর্তমানের জাগতিক নানা কিছু ওকে গ্রাস করবে, তখন তলিয়ে যাবে মণিমালা। বড়ো হয়ে উঠবে বেঁচে থাকা, পারিপার্শ্বিক এবং নিত্যদিনের ঘরগেরস্তির খুঁটিনাটি। তাই ও ভালোভাবে বেঁচে থাকার তাগিদে অল্পক্ষণের মধ্যে নিজের ভেতর শক্তি সঞ্চয় করে।
