কাচপোকা উড়ে এসে আবুল হাশেমের ঘাড়ে বসে। ঘাড়ে কাচপোকা নিয়ে ও দেখতে থাকে যে কেমন করে নতুন ঘর ওঠে–তারপরও ওর চোখের সামনে থেকে ছবি মুছে যায় না, দেখতেই থাকে ঘর ওঠার পরের দৃশ্যগুলো–ঘরের পাশে কতগুলো কলাগাছ লাগানো হয়, রসুই ঘরের পাশে চেঁকি বসে, সেই ঘরে প্রবেশ করে একজোড়া দম্পতি, হাঁড়িকুড়ি কেনা হয়, চুলো বসে, আগুন জ্বলে, ভাত খাওয়া হয়, দিন ফুরোয়, রাত নামে, ভাত খেয়ে ঘুমুতে যায় দম্পতি, আবার ভোর হয়। মাঠে যায় একজন–মাটি চষে, ধান বোনে। ঘরে থাকে একজন–ধান ভানে, আঙিনা নিকোয়। ঝকঝকে তকতকে ঘরদোর। বাতাসে লুঙ্গি শুকায়, শাড়ির আঁচল ওড়ে। কবুতর ঘর বাঁধে, শালিক উড়ে বেড়ায়–পেঁচা ডাকে রাতের বেলা। ফকফকে জ্যোৎস্নায় ধুয়ে যায় গাছ, ঘর, মানুষ, মানুষ, মানুষ। আবার ভোর হয়। কাকা-ডাকা ভোর।
এইসব ভাবনার মাঝে জবেদ আলীর বাপ ওর কাছে এসে দাঁড়ালে কাচপোকা উড়ে যায়। লোকটির মুখে পাতলা দাড়ি। গায়ে তালিমারা পাঞ্জাবি, ও ভূমিহীন কৃষক, কাঁধে গামছা রাখে এবং ঘন ঘন কপালের ঘাম মোছে। খুব নিচুস্বরে বিনীত ভঙ্গিতে বলে, মহাজন বিয়ার সময় পোলাডারে কিছু দিবেন না?
যৌতুক?
হা-হা করে হেসে ওঠে আবুল হাশেম।
না, না যৌতুক না। মোর কি যৌতুক চাওয়ার সাহস অয়? না চাওয়া উচিত? আমনহের যা মনে লয়? বাপেতো মাইয়ারে আশীর্বাদ করে।
মাইয়া?
আবুল হাশেম হা-হা করে হেসে ওঠে। জবেদ আলীর বাপের মুখ কালো হয়ে যায়, খানিকটা অপমানিতও বোধ করে। তবু মরিয়া হয়ে বলে, মাইয়া না তো কী? বাপতো ডাকছে।
বাপ ডাকলেই মাইয়া অয়?
না, অয় না। আমনেহতো বাপ ডাকতে মানাও করেন নাই। মাইয়াডা বাপ ডাকছিল–
থাক, বেশি কথা কওন ভালো না।
আবুল হাশেম জবেদ আলীর বাপকে ধমক দেয়। তারপর ওর চোখের ওপর চোখ রেখে রূঢ় কণ্ঠে বলে, চর জাগছে, অহন মোর মেলা খরচ। মুই কিছু করবার পারুম না। পোলারে বিয়া করাইলে করাইবা, না। করাইলে নাই। ভাইবা দেহে, যা ইচ্ছা।
জবেদ আলীর বাপ একদম চুপসে যায়। ভেতরে ভেতরে ক্রোধ হলেও সেটা সে প্রকাশ করতে পারে না। প্রকাশ করার সাহস না করাই উচিত বলে মনে করে। ভেতরে ভেতরে ফুসতে থাকে। নিজেকে দমিয়ে রাখার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে, কিন্তু পারে না। কাচপোকাটা আবার কাছাকাছি উড়ে এলে ও হাত বাড়িয়ে খপ করে ধরে ফেলে। তারপর পায়ের নিচে পিষে মারে।
আবুল হাশেম তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে ঠাণ্ডা গলায় বলে, কামডা ঠিক করলা না।
মহাজন নতুন চর যদি আমনহের অয়, তাইলে পোকাড়া মোর। মোগ বিত্ত নাই, কিন্তু বনজঙ্গল-পোকামাকড় তো আছে। মুই যদি পোকাডারে পিষাই মারতে চাই, তাহলে হেইডা মুই মারি। আপনে না। কইবেন ক্যা?
আবুল হাশেম হাঁ করে লোকটির মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। প্রচণ্ডভাবে বিস্মিত হয়। লোকটি বলে কী? বর্গাচাষীর দাপট তো কম নয়? ও কি ছেলের বিয়ের কথা পাকাপাকির পর নিজেকে আবুল হাশেমের সমকক্ষ ভাবছে? ছেলের ব্যর্থ হিসেবে নিজেকে আবুল হাশেমের ওপরে স্থান দিচ্ছে। সেজন্যই কি’রাহানুমকে ওর মেয়ে বানানোর জন্য এত চাপাচাপি? হ্যাঁ এই হবে। আবুল হাশেম সিদ্ধান্তে এসে যায়।
জবেদ আলীর বাপ পোকা মেরে নদীর দিকে খানিকটা নেমে গেছে। ও এখন হাঁটু পানিতে দাঁড়িয়ে। লুঙ্গি হাঁটু পর্যন্ত ওঠানো। ওর সরু পা পানিতে ড়ুবে আছে। ও আঁজলা ভরে পানি তুলে মুখে ছিটায়। ও কি প্রমাণ করছে যে নদীতে ওর প্রবল অধিকার? মানুষের সঙ্গে না পেরে ও প্রকৃতিকে নিজের দখলে রাখতে চাইছে। জবেদ আলীর বাপ এভাবে আবুল হাশেমকে উপেক্ষা করছে। আবুল হাশেম বুড়ো আঙুল উঁচিয়ে বলে, কচু। জবেদ আলীর বাপ তো দেখতে পায় না। ওর পিঠ আবুল হাশেমের দিকে ফেরানো।
আবুল হাশেম নদীর পাড়ে দাঁড়িয়েই থাকে, নদীতে নামে না। ওর। জলের স্পর্শের প্রয়োজন নেই। কারণ ওর শরীরে রাগ নেই। ওর শরীর। রাগে টলছে না। হাঁটু পানিতে দাঁড়িয়েই জবেদ আলীর বাপ গামছা দিয়ে। ঘাড় গলা মুছে নেয়। তারপর উঠে আসে নদী থেকে। আবুল হাশেমের দিকে তাকায় না। আবুল হাশেম এতক্ষণে মজা পেতে শুরু করেছে। লোকটি ছেলের বাপ–ওর আচরণে তা বুঝিয়ে দিচ্ছে এবং হনহনিয়ে হেঁটে পুবদিকে খানিকদুর চলে যায়। আবুল হাশেম ধরে নেয় বেশিক্ষণ লোকটি এই রাগ ধরে রাখতে পারবে না, একটু পরই শান্ত হয়ে যাবে। শান্ত ওকে হতেই হবে। কারণ আবুল হাশেম জমির মালিক। লোকটির এখানে কোনো কাজ নেই, ও দেখতে এসেছে কেবল এবং একই সঙ্গে আবুল হাশেমের কাছ থেকে কিছু আদায় করার ধান্দাও।
আবুল হাশেম লোকটির দিকে তাকিয়ে থাকে। ওর হেঁটে যাওয়া দেখে, ঘন ঘন গামছা নাড়তে দেখে। লোকটি ছিপছিপে লম্বা, দূর থেকে ওকে আরো চিকন দেখায়, খুব ছোট একগোছা পাটকাঠির মতো। ও আবুল হাশেমকে মহাজন বলল কেন? আবুল হাশেম কি মহাজন? না, ঠিক তা নয়।
নদীর ভাঙনে তলিয়ে যাওয়ার আগে ওর কিছু জমি ছিল। তারপরতো সেগুলো নদী গ্রাস করল। এখন ওর তেমন কিছু নেই। শুধু ভিটে এবং সামান্য কিছু ধানি জমি। এতে ঠিকমতো হয় না বলে মৌসুমের বাইরের সময়টায় আবুল হাশেম মাছ ধরতে সাগরে যায়। ও নিজে জেলে, ওর ওপর একজন মহাজন আছে। আসলে জবেদ আলীর বাপ ওকে খুশি করার জন্য মহাজন বলেছে। মহাজনই যদি মানবে তবে এমন কঠিন করে কথা বলত না আবুল হাশেম দীর্ঘশ্বাস ফেলে। মানুষ নিজের ইচ্ছার পূরণ দেখতে না পেলে রুষ্ট হয়, ক্ষিপ্ত হয়, তারপর দূরে দাঁড়িয়ে নিজের চিন্তাগুলো সংহত করার চেষ্টা করে।
