রাহনুমের কড়াই থেকে ছ্যাঁকছ্যাঁক শব্দ আসছে না। ও কড়াইটা চুলো থেকে নামিয়ে রেখে উদগ্রীব হয়ে রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। জবেদ আলী এগিয়ে এসে বলে, ছেমড়ারে হাছা কতাটা কয়েন। চাচা।
আবুল হাশেম তবু নিশ্ৰুপ। ওর করোটিতে রঙিন মাছ ভেসে এসেছে। বুঝে যায় কেন জবেদ আলীর এই তড়িঘড়ি ভঙ্গি–কেন ও সুখদীপকে রাহানুষের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চায়! কী ওর আকাঙ্ক্ষা। আজ সকালে ও এসেছে, এর মধ্যে এমন বিচিত্র তোলপাড় এই সংসারে? জবেদ আলী যখন ঘটনাটা ঘটিয়েই ফেলেছে তাহলে তো আবুল হাশেমের জন্য এটা একটা সুযোগ! ও অনুপ্রাণিত হয়ে ওঠে। নিজেকে বলে, এখনই সময়, এখনই। তিনজন মানুষ যে এক নয় ওটা তো সবাইকেই বুঝতে হবে। ওদের দায়িত্ব যে আবুল হাশেমের নয় সেটাও জানতে হবে। এই জানা যতই নির্মম হোক অতে ওর কি এসে যায়? কে সুখদীপ? কে রাহানুম? পথ চলতে কোনো একদিন দেখা হলেই কি আপন হবে? আবুল হাশেমের সামনে নিজের অতীত প্রবল হয়ে ওঠে। সে অতীতকে আঁকড়ে ধরে ওসামনে তাকাতে চায়–সে অতীতের আদলে ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে চায়। কারণ ওর জমি জেগে উঠেছে–নতুন জমি। এখনই তো সময় এই কয়টা বছর মুছে ফেলার।
সুখদীপ ওর সামনে বসে আছে। উবু হয়ে বসে ছিল, এখন হাঁটু মুড়েছে। একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে ওর মুখের দিকে। ওর দৃষ্টি বিস্ফারিত, ফুলে উঠছে নাক–ওর জীবনে এখন এক রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষা। আবুল হাশেমের একটি কথার ওপর নির্ভর করছে ওর জীবনে অনেক কিছু। ওই মুখে আজ জ্যোৎস্না নয়, মেঘের মাখামাখি। ওই মেঘ গাঢ় হবে, অন্ধকার ঘনীভূত হবে–প্রবল বর্ষণে ধুয়ে যাবে প্রান্তর।
আবুল হাশেম খুব আস্তে করে কথাটা বললেও কথাটায় ষাঁড়ের গর্জন ধ্বনিত হয়। সে গর্জনে ছিটকে পড়ে যায় সুখদীপ। ওর দুকান ভরে বাজতে থাকে, হ দাদা, বেবাকটাই হাছা কতা।
তীব্র কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠে চিৎকার করে কাঁদে সুখদীপ। তারপর দৌড়ে পুকুরঘাটে চলে যায়। জবেদ আলী পিছু পিছু যায়। গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকে। সুখদীপ ঘাটলায় বসে দুহাতে মুখ ঢেকে কাঁদে। ওই শব্দে জবেদ আলীর কখনো মুহূর্তের জন্য খারাপ লাগে, সঙ্গে সঙ্গে ও তা ঝেড়ে ফেলে দেয়। ও সহানুভূতি জানাবার জন্য দাঁড়িয়ে নেই। লক্ষ্য রাখতে এসেছে যে ছেলেটি যেন কোনো অঘটন না ঘটায়। কিন্তু ও বসে আছে–ও হয়তো মৃত্যুর কথা ভাবছে না। এই বয়সে মৃত্যুর কথা ভাবা যায় না। তবে ওর ভেতর প্রতিশোধের আগুন জ্বলছে। ও জবেদ আলীকে খুন করতে চায়। আজ রাতে একটুও না ঘুমিয়ে, ভীষণ নিঃশব্দে, দা নিয়ে এসে ও কি জবেদ আলীকে কুচিকুচি করবে? হয়তো করত যদি ও একটি পুরুষ হতো। কিন্তু ও শিশু। গায়ের জোরে কোনোকিছু করা ওর পক্ষে সম্ভব নয়। এসব ভাবতে ভাবতে জবেদ আলী কূর আনন্দে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে শিশুর কান্না শোনে–যে শিশুর কিছুক্ষণ আগেও ঘর ছিল, মা ছিল, দাদা ছিল, এখন ও এতিম। মুহূর্তের মধ্যে ওর সামনে সবকিছু নেই হয়ে গেছে। পৃথিবীতে ওর কেউ নেই। এই নিঃসঙ্গতা জাগতিক এবং মানসিক। সুখদীপ এখন কোথায় যাবে?
কোথায় যাবে তাতে জবেদ আলীর কী এসে যায়? ও নিজেকে শক্ত করে ফেলে। সুখদীপের কান্না এখন আর ওকে স্পর্শ করে না। ও গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে বিড়ি ধরায়। বিড়ির আগুন জোনাকির মতো জ্বলে। জোরসে টান দিলে আলো যেমন উজ্জ্বল হয়ে ওঠে তেমন চকচক করে জবেদ আলীর চোখ–ও মনে মনে,আঁক কষে, নষ্ট আঁক–কেমন করে জব্দ করবে একটি শিশুকে অর নকশা সে আঁকে। ঠিক করে সুখদীপের কান্না থিতিয়ে এলে জবেদ আলী প্রথমে ওর হাত ধরে মুচড়ে দেবে তারপর বশে এলে হ্যাঁচকা টানে ধাক্কা মেরে হিড়হিড় করে টেনে বারান্দায় নিয়ে ফেলবে। দরকার হলে বেশ কয়েক ঘা লাগিয়ে দেবে। ওকে মারলে কেউ কিছু বলবে না। ও বুঝে যায় যে আবুল হাশেম এবং রাহানুম কেউই শিশুটির পক্ষে নয়। ওরা নিজ নিজ খেলার কোর্টে দাঁড়িয়ে গেছে। এখন কেবল গোল্লাছুটের বাকি। এই পুঁচকে ছেলেকে জব্দ করা এক নিমেষের কাজ। জবেদ আলী জোরসে টান দিয়ে বিড়িটা ছুড়ে ফেলে দেয়। মনে হয় এখনও পুরোপুরি তৈরি। শিশুটি ওর নাগালের ভেতর। হাতটা ধরে মুচড়ে দিলেই হয়।
আবুল হাশেম জবেদ আলীর ব্যবহারে কিছুটা দ্বিধান্বিত। ও বুঝতে পারে না যে কেন জবেদ আলী সুখদীপকে রাহানুম থেকে আলাদা করে দিল? কী এর উদ্দেশ্য? ও কি রাহানুমকে বিয়ে করতে চায়? যেমন আবুল হাশেমের নিজেরও একটি পরিকল্পনা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে–যে জন্য ও হাট থেকে ফেরার পথে নূরুল আলমের বিধবা বোনের খোঁজ করতে গিয়েছিল–যার হাতের বানানো পান খেয়ে কিছুতেই উঠতে ইচ্ছে করছিল না, তাই এত রাত হয়েছে। জীবনে নারীর কথা ও ভুলেই গিয়েছিল–সেই নারী প্রথম পূর্ণিমার বিশাল চাদ, আলোকিত করে দিতে পারে আবুল হাশেমের এই জীবন। আবুল হাশেম চমকে নিজের দিকে তাকায়। এই জীবন! এই জীবন আবার কী? আর কত? অনেক, অনেক–নিজেই নিজের প্রশ্নের উত্তর দেয়। যার জীবনে হারানো চর নতুন হয়ে ফিরে আসে তার জীবনের তো সবে শুরু, তার আর বয়স কী, বার্ধক্য কী? আর দেরি নয়–আর বৃথা সময় নষ্ট নয়, এখন ওর গোছানোর পালা। কিন্তু জবেদ আলী কী চায়? রাহনুমকে? ভেবেছে রাহানুম আবুল হাশেমের মেয়ে?
আবুল হাশেমের প্রচণ্ড হাসি পায়। কিন্তু ও অতি কষ্টে নিজেকে দমন করে। এখনই এতকিছু প্রকাশ করতে চায় না। আগে জবেদ আলীকে বুঝতে চায়। ও যদি শুধুই রাহনুমকে বিয়ে করতে চায়, ভালো–আপত্তি নেই। কিন্তু রাহানুমকে আবুল হাশেমের মেয়ে ভেবে নতুন চরের উত্তরাধিকারী হতে চাইলে তো গোল বাধবে। কিন্তু পরক্ষণে নির্ভাবনা হয়ে যায় ও। গোলই বা বাধবে কেন? সময়ই সব কথা বলে দেবে। এত তড়িঘড়ি সব ফয়সালা না করাই ভালো। আজ রাতটুকু ওই শিশুটির রাত হয়ে থাক–নিজেকে জানার, কষ্টের এবং বড়ো হয়ে ওঠার।
