সুখদীপ একথা শুনে আবার দৌড়ে রাহালুমের সামনে এসে দাঁড়ায়। কান্নার চোটে ওর কণ্ঠ দিয়ে স্বর বেরুতে চায় না। ও এখন রীতিমতো ফোঁপাচ্ছে।
মা তুমি কতা কও না ক্যা? কও মা ওই বেড়া যা কয় হে মিছা? বেড়া সব মিছা কতা কয়?
রাহাম নিজেকে সামলে নেয়। সুযোগের সদ্ব্যবহার করার জন্য তৈরি হয়ে যায়। নিস্পৃহ কণ্ঠে বলে, না বাবা, সব হাছা কতা।
রাহালুমের এই শক্ত উচ্চারণ করার সময় একটুও গলা কাঁপে না। বরং কথাটা বলতে পেরে নির্ভার হয়ে যায় ও। ধরে নেয় সুখদীপ কেঁদেকেটে চুপ করে যাবে। কিন্তু রাহামের কাছ থেকে ওই কথা শোনার পর ও মুহূর্তমাত্ৰ থমকে থাকে, তারপর দৌড়ে উঠোন পেরিয়ে পুকুরঘাটে চলে যায়। ওর ফোঁপানির শব্দ ভেসে আসছে। জবেদ আলী জানে, এটা নিয়ে ভাবার কিছু নেই। দুদিন কেঁদেকেটে ঠিক হয়ে যাবে সুখদীপ। তারপর নিজের ভাগ্য নিজেই বুঝবে। আবুল হাশেমের সংসারে থেকে যাবে ও। আবুল হাশেমের তো একজন কাউকে দরকার হবে।
আবুল হাশেম এখনো ফেরেনি। কোথায় গেল বুড়ো? ওর হাতে মাছ ধরিয়ে দিয়ে বলেছিল, তুমি যাও। মুই আহি। এতক্ষণে তো হাট ভেঙে গেছে। তাহলে আসছে না কেন? জবেদ আলী ট্র্যাক থেকে বিড়ি বের করে ধরায়। অন্ধকারে ধোয়ার কুণ্ডলী ওঠে। গোল্লা গোল্লা হয়ে ছড়িয়ে যায়। ছড়িয়ে পড়ে। গোল্লাগুলি রাহামের মুখ হয়–একজন নারী যে এতকাল ওরই প্রতীক্ষায় ছিল–প্রতীক্ষায় থাকাটাই সাধনা। প্রতীক্ষার অবসান মানে ফসল, গোলাভরা শস্যদানা। জবেদ আলীর ঠোঁটের কোণে চিকন হাসি ঝুলে থাকে, অন্ধকারে দেখা যায় না, ওটা শুধু ওর আত্মতৃপ্তি এবং আনন্দ।
রাহানুম ওর জন্য রান্না করছে, ভাবতে ওর ভালোলাগে–রান্নার চমৎকার গন্ধ আসছে, যেন খাবার নয়, তা রাহামের শরীর। চুল থেকে উঠে আসছে ফুলের গন্ধ–ছড়িয়ে যাচ্ছে বিছানায়, বালিশে, ঢুকে যাচ্ছে জবেদ আলীর ভেতরে। গন্ধ ওকে পাগল করে তোলে। জবেদ আলীর ঠোঁটে ঝুলে থাকা হাসি বিস্তৃত হয়–কতদিন নারীর শরীর স্পর্শ করা হয়নি, সেই আষাঢ় মাসে, প্রবল বৃষ্টির রাতে বউ মরে যাওয়ার পর। সেদিন আকাশে জ্যোৎস্না ছিল না–ওর সামনে উঠোনময় আলো ছিল না। প্রবল ব্যাঙের ডাকে তোলপাড় করছিল প্রান্তর, সেই রাতে মরে গেল ওর বউ। এখন রাহানুম ওর সামনে, ওর মুখে ভাষা আছে–চোখেও। যেন রহস্যময়ী নারী রাহানুম–গন্ধ এবং আলোয় ভরা। এইসব ভাবনার নিমগ্ন অবসরে সুখদীপ অন্ধকার ফুঁড়ে সামনে এসে দাঁড়ায়। ওর হাতে উদ্যত দা। চমকে ওঠে জবেদ আলী একলাফে সরে যায়।
তুই মোগ বাড়ি আইছ ক্যা? কে তোরে আইতে কইছে? মুই তোরে কোপাইয়া শ্যাষ করমু।
হারামজাদা, কুত্তার বাইচ্চা, জাউরা শয়তান।
জবেদ আলী চিৎকার করে গালি দেয়। রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসে রাহানুম।
ও বাজান, বাজান তুমি কী হরো?
ও তোমারে কাইড়া লইতে চায় মা। আমি ওরে কোপাইয়া শ্যাষ করমু।
সুখদীপ বারান্দায় লাফালাফি করে।
হোন, বাজান, হোন।
রাহানুম ওকে ধরতে চায়। সুযোগ বুঝে জবেদ আলী পেছন দিক থেকে ওর হাতটা মুচড়ে ধরে। দা কেড়ে নেয় এবং গোটা কয়েক থাপ্পড় দিয়ে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়। চিৎকার করে কাঁদে সুখদীপ। মাটিতে পড়ে গিয়ে ও আরো ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। রাহানুম ধরতে গেলে ওর হাত কামড়ে দেয়। ও পাগলের মতো উঠোনে ঘুরপাক খায়। চিৎকার করে জবেদ আলীকে গালাগাল করে। জবেদ আলী ওকে তাড়া করলে বাড়ির বাইরের দিকে ছুটে চলে যায়। অন্ধকারে ওকে আর দেখা যায় না। ওর কান্নার শব্দও আর নেই।
তখন আবুল হাশেম উঠোনে এসে দাঁড়ায়।
অর কী অইছে?
রাহানুম কথা বলে না, নিঃশব্দে রান্নাঘরে চলে যায়। জবেদ আলীও চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। কারো কাছ থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে আবুল হাশেমও আর কোনো কথা বলে না। সে নিজেও বেশ ক্লান্ত। ধরে নেয় সুখদীপের কী হয়েছে, এটা না জানলে ওর তেমন কোনো ক্ষতি নেই। বাচ্চাদের কত কিছু হতে পারে, সব জানার দরকারই বা কী? তবু মনটা খচখচ করে। আহা, এই ছেলেটিকে ও দুধের-শিশু থেকে পালছে। ওর কেউ না, তবুতো মনের মধ্যে একটা টান আছে। রাহানুম রান্নায় ফিরে গেছে। আজ ও কথা বলল না কেন? ওরইতো উচিত ছিল গলগলিয়ে সব কথা বলা। তবে ওর মুখ বন্ধ কেন? সুখদীপকে নিয়েতো ও-ই বেশি কথা বলে। ছেলে, ছেলে করে পাগল। আজ ওর মুখে কথা নেই, শুধু রান্নাঘরের কড়াইয়ে ইলিশ মাছের টুকরো তেলের ওপর ছ্যাকহঁ্যাক করে। এই শব্দ দিয়ে রাহামের কোনা কিছু বোঝা যায় না। ওর সবটাই আড়াল হয়ে থাকে। আবুল হাশেমের মনে হয় তাহলে কি বড়ো রকমের কোনোকিছু ঘটে গেছে?
এমন আশঙ্কা নিয়ে, অর কী অইছে, বলতে বলতে আবুল হাশেম বারান্দার হোগলার ওপর বসে। দু’হাত পেছনে ঠেস দিয়ে শরীর ছেড়ে দেয়। তখন অন্ধকার থেকে আবার তীরের মতো ছুটে আসে সুখদীপ।
দাদা, এই বেডা কয়, মুই তোমার কেউ না? মোরে তোমরা টোকায়ে আনছো? কও দাদা, এইডা এক্কেরে মিছা কতা?
আবুল হাশেম চুপ করে থাকে।
সুখদীপ ফোঁপাতে ফোঁপাতে একই কথা বলে।
আবুল হাশেম চুপ করে থাকে–ওর মাখার মধ্যে স্বপ্ন–নতুন চর জেগেছে, কিন্তু এই ছেলেটি ওর উত্তরাধিকার নয়, ওকে সত্যি কথাটা বলে দেওয়া ভালো। এখনই এক মহা মুহূর্ত। আবুল হাশেমের বুকের ভেতর উথালপাথাল। সুখদীপ ওর মুখখামুখি উবু হয়ে বসেছে, কান্নার ধ্বনি কমে এসেছে। ও এখন উদগ্রীব হয়ে আছে, ওর বুকের ভেতরে যাবতীয় কলকবজা চলাচল বন্ধ। অন্ধকারে সুখদীপের মুখ স্পষ্ট নয়, ওখানে কী বিচিত্র নকশা জেগেছে সেটা আবুল হাশেম দেখতে পাচ্ছে না। জ্যোৎস্না তত জোরালো নয়, কারণ চাদ ক্ষয়ে আসছে–চাদের কাছাকাছি এক টুকরো মেঘ। সুখদীপ একই কথা বারবার আউড়ে। যাচ্ছে। ওর কণ্ঠ ক্ষীণ। আবুল হাশেমকে নিশ্ৰুপ দেখে ওর ভেতরটা ক্ষয়ে গেছে, ও আর তেমন শক্তি পাচ্ছে না। নাকি ও এক প্রচণ্ড বিস্ফোরণের অপেক্ষায় থম ধরে আছে?
