কী চাও। জানি না?
হ, জানেন।
রাহানুম দ্বিধাহীন মাথা নাড়ে। তারপর বলে, হাত ছাড়েন। মাছ কাটি। রান্দনের দেরি অইয়া যাইবে।
অউক।
খিদা পাইবে না?
পাইবে।
খিদা লাগলে সুখদীপ কানবে।
কান্দুক।
ভাত রান্দা না অইলে বাবো রাগ অইবে।
রাগ অউক।
রাহানুম ফিক করে হেসে ফেলে। প্রবল ছেলেমানুষি জবেদ আলীর। কণ্ঠে। দৃষ্টিতে দুষ্টুমি। ওর মুঠিতে রাহালুমের হাত ঘেমে ভিজে যায়।
জবেদ আলী বলে, যদি হাত না ছাড়ি? ছাড়ুম না। এই হাত ধইরা লগে লইয়া যামু।
ওহ্ ছাড়েন। সুখদীপ আইতে পারে।
তখন জবেদ আলী হাত ছেড়ে দিয়ে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে, ওর বাপ কহন মরছে?
ও মোর পোলা না।
তোমার পোলা না?
না, মোর পোলা না।
জব্বর খুশির খবর। তাইলে তো তোমারে বিয়া করতে মোর বাধা কি? মোর মা-বাবো কিছু কইব না। একটা কথা, সুখদীপ তোমারে মা ডাকে ক্যা?
তখন রাহানুম জবেদ আলীকে জলোচ্ছ্বাসে আক্রান্ত সেই প্রলয়ঙ্করী রাতের গল্প শোনায়।
গল্প শুনে জবেদ আলী বলে, তোমার রিয়া অইছিলো এইডা মোগ বাড়িতে কারো ধারে কওনের কাম নাই।
তারপর ও শিস বাজাতে বাজাতে গিয়ে উঠোনে দাঁড়ায়। এদিক-ওদিক তাকিয়ে সুখদীপকে দেখতে পায় না। ও হয়তো বাড়ির বাইরে গেছে কিংবা পুকুরঘাটে। জবেদ আলী চিৎকার করে সুখদীপকে ডাকে।
রাহানুম কাঠে লাগানো বড়ো বটিতে মাছ কাটে, তাজা কচকচে মাছ। রক্ত বটির গা বেয়ে গড়াতে থাকে। মাছের পেট থেকে বড়সড় ডিম বের হয়, একগাদা নাড়িভূঁড়ি, কালো রঙের পিত্তথলি–এই থলিটি সাবধানে ছাড়িয়ে নিয়ে দূরে ফেলে দেয় ও। পিত্ত গলে গেলে মাছটা তেতো হয়ে যাবে–বিস্বাদ লাগবে খেতে। জবেদ আলীর মুখেতো বিস্বাদ খাবার দেওয়া যায় না। বড়ো গামলায় করে মাছ ধুয়ে নেয় ও। কিছু মাছ ভাজবে, কিছু রাঁধবে। প্রচুর পেঁয়াজ-কাঁচামরিচ দিয়ে দুইজোড়া ডিম সঁতলে নেবে। দারুণ হবে খেতে। তাজা ইলিশের গন্ধে ম-ম করে বাড়ি। রাহালুমের মনে হয় কত দিন পর বাড়িতে আজ উৎসব।
এইসব কাজের ফাঁকে জবেদ আলীর ডাক শুনে ওর কাছে ছুটে আসে সুখদীপ। এসেই হাত চেপে ধরে, ডাকেন ক্যা?
গেলহি কেমনে?
এ প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে সুখদীপ খলখল করে হাসে। দুজনে। হাতনায় হোগলার ওপরে বসে।
তোর কাইল স্কুল নাই? অহন পড়ালেখা নাই?
স্কুলে যামু না।
ক্যা?
আমনহে যদি বাড়ি থাহেন—
মুই কাইল চল্যা যামু।
তখন সুখদীপ ওর গলা জড়িয়ে বলে, আইজ একটা খুশির দিন। মা কতকিছু রাব্দে। আমনহে আমার লগে একটা গল্প কন।
গল্প?
জবেদ আলীর চোখে হিংস্র আলো ফুটে ওঠে। একটু আগে ও রাহানুমের কাছে একটি গল্প শুনেছে। এই গল্পটি এই ছেলেটি জানে না। গল্পটি ছেলেটিকে জানতে হবে। গল্পটি ওকে জানিয়ে দিয়ে রাহনুমকে নিয়ে ওর নতুন সংসার।
ও তখন ছেলেটিকে গল্প বলতে আরম্ভ করে, ভয়াল হিংস্র রাতের গল্প। একটু একটু করে, গল্পের খোসা ছাড়ায়, একটু একটু করে এগোয়–রূপকথা নয়, অথচ ভিন্ন এক জীবন–ছেলেটির কাছে একদম নতুন। ও রুদ্ধশ্বাসে জবেদ আলীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে, চোখের পলক পড়ে না, চোখের মণি নড়ে না, ওর কণ্ঠ রুদ্ধ। কারণ তখনো ও জানে না যে সুখদীপ নামের একটি ছেলে এই গল্পের নায়ক, অথচ সে শিশুটি প্রবল জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যাওয়ার পর থেকে ওই শিশুর জন্য ওর বুক ফেটে যাচ্ছে। শিশুটি মা খুঁজে পেলে ওর মুখে হাসি ফুটে ওঠে। জবেদ আলী ইনিয়ে-বিনিয়ে গল্প বানায়, কণ্ঠ কখনো ওঠা-নামা করে, কখনো বিস্তৃত হয়, কুঁকড়ে যায় এমনকি হিসহিস শব্দে হিংস্রও হয়ে ওঠে। হিংস্র হয়ে উঠলে সুখদীপের ভয় করে। তখন ও জবেদ আলীর হাত চেপে ধরে। আবার ভালো মুহূর্তে হাত ছেড়ে দেয়।
রাহানুম রান্নায় ব্যস্ত। ছাঁকছুক শব্দে ও জানতেও পারে না যে জবেদ আলী আর একটি নাটক তৈরি করেছে। ওই নাটকে দ্রুত বদলে যাচ্ছে রাহানুষের জীবন। ও হারাচ্ছে সুখদীপকে, যে দায়িত্বটি ও নিজেই পালন। করতে চেয়েছিল, সে দায়িত্ব আর পালন করতে হবে না।
গল্পের শেষে সুখদীপকে যখন শোনানো হয় যে গল্পের শিশুটি ও নিজে তখন ও চিৎকার করে কেঁদে ওঠে, মিছা কতা। এক্কেরে মিছা কতা? মিছা কতা কন ক্যা?
মিছা না–হাছা কতা।
সাপের মতো হিসহিস করে জবেদ আলীর কণ্ঠ। ও এখন জল্লাদের মতো ক্রুর–একই নিষ্ঠুর ভঙ্গিতে বলে যাচ্ছে, তোর বাপ নাই, মা নাই, কেউ নাই, তুই অউক্কা এতিম পোলা।
সুখদীপ ছুটে রান্নাঘরে যায়, মা তুমি মোর মা না?
রাহানুমের বুক কটকট করে। ও চট করে উত্তর দিতে পারে না। এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য যদিও ওর মনে মনে ভাবনা ছিল, কিন্তু প্রস্তুতি ছিল না। ও মুহূর্তের মধ্যে নিজেকে নির্মম করে তুলতে পারে না। মনে পড়ে এইতো সেদিন ও সুখদীপকে বুকের দুধ খাইয়ে বড়ো করে তুলেছে। এ ছাড়া সুখদীপ আর কারো কাছে যেতে চাইত না। এখনো তো ওর গলা না জড়িয়ে ধরে সুখদীপ ঘুমোতে পারে না। মা, মা করে যখন ডাকে তখন ক্ষণিকের জন্যও মনে পড়েনি যে সুখদীপকে ও গর্ভে ধরেনি। তাহলে এত তাড়াতাড়ি–এত তাড়াতাড়ি সবকিছু–নাহ্ রাহানুম সুখদীপের প্রশ্নের জবাব দিতে পারে না।
মার কাছ থেকে কোন সাড়া না পেয়ে সুখদীপ আবার জবেদ আলীর সামনে এসে দাঁড়ায়। চিকার করে বলতে থাকে, মুই এতিম পোলাতো তোমার কি কুত্তার বাচ্চা? তুমি ক্যা মোরে এতিম বানাইবা? মায়েতো কিছু কয় না?
জবেদ আলী ওকে তেড়ে ওঠে, বাব্বা কেউটা একটা। কে তোর মা? এহানে তোর মা নাই। তোর মা ঝড়ের রাইতে মরছে।
