বিকেলে জবেদ আলীকে নিয়ে আবুল হাশেম হাটে যায়। ঘরে আতপ চাল ছিল। তার সঙ্গে খেজুরের গুড় দিয়ে রাহানুম পায়েস রান্না করে। সুখদীপ বসে আছে সামনে। ওর চোখে লোভ, কখন রান্না শেষ হবে। রাহানুম সুখদীপের মুখের দিকে তাকাতে পারে না। তাকালেই মনে হয় নিজের সুখের জন্য আজ ও এই ছেলেটিকে দূরে ঠেলে দেবে। এটা এক ধরনের চেষ্টা, মানুষ যেমন অনেক কিছু করার জন্য চেষ্টা করে এও তেমন। তারপর চেষ্টা সফল হলে ও চলে যাবে জবেদ আলীর সঙ্গে–লতাচাপালি, যে গায়ের কাছাকাছি একটি নতুন চর জেগে উঠলে ওর সৌভাগ্যের চিহ্ন হয়ে একজন মানুষ এই বাড়িতে আসে।
ও ধোঁয়া-ওঠা গরম হাঁড়ি চুলো থেকে নামায়। পাটালি গুড়ের খুশবুতে বেশ চনমনে হয়ে ওঠে খাবার ইচ্ছে। সুখদীপ জিভ চেটে বলে, মা, মোরে একটু দিবা?
মা, কে তোর মা?
রাহানুম প্রায় আঁতকে উঠে কথাটা বলতে চায়। কিন্তু পরক্ষণে নিজেকে শাসন করে। ছিঃ! কী কঠিন চেষ্টা। ও কেন ভাবছে এই ছেলেটির মা না হলেই ও কুমারী হয়ে যাবে? ও তো কুমারী নয়, জবেদ আলীর সঙ্গে ওর তো নতুন সংসার হবে না। জবেদ আলী যদি ওকে প্রত্যাখ্যান করে! তখন? রাহানুষের দুচোখে ছাপিয়ে জল আসে।
মা কান্দো ক্যা?
রাহানুম জবাব দেয় না। ছোট্ট একটা বাটিতে পায়েস বেড়ে দেয় সুখদীপকে। ও বাটি নিয়ে ঘরের বারান্দায় চলে যায়। ও যখন খুশি হয়ে কিছু খায় তখন গুনগুনিয়ে শব্দ করে। ওই শব্দ শুনলে রাহানুম বুঝতে পারে যে খাবারটি ওর খুব পছন্দ হয়েছে। ও তখন চুলোর আগুন নিভিয়ে। দিয়ে সুখদীপের কাছে এসে বসে। সুখদীপের খাওয়া শেষ। বাটি চেটেপুটে নিচ্ছে। তারপর রাহানুমের দিকে তাকিয়ে বলে, খুব মজা লাগছে মাগো।
রাহানুম মৃদু হেসে বলে, আর একটু নিবি!
ও লম্বা করে মাথা কাত করে। শূন্য বাটি এগিয়ে ধরে বলে, দেও।
মোর লগে আয়। হঠাৎ করে ওর মনে হয় আজ ছেলেটিকে খাইয়ে-দাইয়ে খুশি রাখা উচিত। বেচারা, কাল থেকে ভুলে যাবে মায়ের আদর। আর কাউকে কি ও পাবে যে ওকে এমন করে বুকে টেনে নেবে? যদি না পায়, তখন ও কী করবে? থাক, ভবিষ্যতের এতকিছুর ভাবনার দায় ওর নেই। যা ঘটবে তার অপেক্ষা করাই এখন দরকার।
বাটিভর্তি পায়েস নিয়ে দুজনে আবার বারান্দায় ফিরে আসে। সুখদীপ রাহনুমকে বলে, মা তুমি একটু খাইবা না?
না। অহন না?
মেহমান আল্যে খাইবা?
রাহানুম প্রশ্নের জবাব দেয় না। সুখদীপ আবার বলে, এমুন মেহমান পেত্যেক দিন আল্যে কত মজা! মাগো তাইলে তুমি কত কিছু রানধবা।
চুপ শয়তান ছেমড়া।
রাহানুম রাগে না, ওকে মিষ্টি আদর করে। ভাষাটা অমনই হয়।
সুখদীপ পুরো বাটি সাবাড় করে দিয়ে বলে, মাগো তুমি আইজকা এত খুশি ক্যা? আইজকা কিসের দিন? আইজতো ঈদ না।
ক্যাবল কথা। চুপ কর।
রাহানুম ধমকে ওঠে। তারপর বারান্দা থেকে নেমে বাইরে দরজার দিকে যায়। এখনো ফিরছে না কেন ওরা?
সন্ধ্যার পর জবেদ আলী হাট থেকে ফিরে আসে। হাতে দুটো বড়ো ইলিশ। তখন উঠোনে ফকফকে জ্যোৎস্না রাহানুম চুলা থেকে ভাত নামিয়েছে। মাছের অপেক্ষায় আছে। ওৱান্নাঘরের দরজায় চুপচাপ বসে থাকে। সুখদীপ উঠোনে দৌড়ে বেড়ায় আর ছড়া কাটে। ও মানুষটিকে উঠোনে ঢুকতে দেখতে পায়। মানুষটি সোজাসুজি রান্নাঘরের দরজায় এসে দাঁড়ায়। মাছ দুটো ওর সামনে বাড়িয়ে দেয়, চাচার আইতে এটটু। দেরি অইবে।
বাবা কেমনে?
বিব্রত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে রাহানুম। যেন এই মুহূর্তে ওর গোপনীয়তার সব লজ্জা থেকে উদ্ধার করতে পারে আবুল হাশেম। নইলে একা একা নিজেকে আর সামলানো যাচ্ছে না।
জবেদ আলী একটি সিঁড়ি টেনে দরজার কাছে বসতে বসতে বলে, ক্যা বাবো না থাকলে ডর করে?
রাহানুম সাহস করে বলে ফেলে, ডর কিয়ের? আমনহে আছেন না?
হো হো করে হেসে ওঠে জবেদ আলী। হাসতে হাসতে বলে, মুই ভাবলাম বাবো না থাকলে মোরে বুজি তোমার ডর। মুই তো একটা বাঘ, না অইলে ভালুক।
মুই কি তা কইলাম?
না, না, কও নাই, কইবা ক্যা।
আবার হাসে জবেদ আলী। এখন আর মুচকি হাসি নয়। সন্ধ্যা নামলে, উঠোনে পূর্ণিমার আলো ছড়িয়ে গেলে পুরুষ মানুষের ঠোঁটে মুচকি হাসি থাকতে নেই–সে হাসিকে শব্দে বিশাল করে তুলতে হয়।
জবেদ আলী রান্নাঘরের দরজায় বসে থাকে দেখে রাহানুম খানিকটা বিব্রত বোধ করে। এমনিতেই জবেদ আলীর সশব্দ হাসিতে ওর ভেতরের সমস্ত কলকবজা বিকল হয়ে যাচ্ছে। ও স্থির থাকতে পারছে না–কত অসংখ্য দিন পেরিয়ে একজন পুরুষ মানুষ ওর কত কাছে। যদি ও হাত বাড়ায় তাহলে ওকে ছুঁতে পারে। একটি শিশু ছাড়া বাড়িতে কেউ নেই। লোকটির এমন ইচ্ছে হতেই পারে। ও এখন বুঝতে পারে লোকটি কেন বাঘ বা ভালুক হতে চায়। রাহানুম ভয়ে ঘামতে থাকে। তড়িঘড়ি বলে, আমনহে হাতনায় বয়েন।
ক্যা, এহানে থাকলে কী অয়?
বাবো, যদি আহে।
ডর কী?
জবেদ আলী আবার হাসে।
রাহানুম বলে, ডর না শরম লাগে।
লজ্জায় ওর মাথা হাঁটুর ওপর নেমে আসে।
মুই দূরে যামু ক্যা। মুই তোমার ধারে থাকবার চাই। মুহূর্তে জবেদ আলীর মুখের দিকে তাকায় রাহানুম। অন্ধকারে ভালো দেখা যায় না, কিন্তু বুঝতে পারে দৃষ্টি চকচক করছে। চুলোর আগুনের হালকা আভায় জবেদ আলীর দৃষ্টি ছুঁচালো হয়ে উঠতে থাকে। রাহানুম দ্রুত মাথা নিচু করে ফেলে।
জবেদ আলী বলে, শরম পাও ক্যা? শরম কিয়ের? কথা বলতে বলতে ও রাহামের দু’হাত জড়িয়ে ধরে। গাঢ় কণ্ঠে বলে, মুই জানি তুমি।
