ওর বাসনে ভাত প্রায় শেষ, তরকারিও তেমন নেই। রাহানুম নতুন করে পোলাও তুলে দেয়। তাঁর হাত কাঁপে। তরকারি দেবার সময় বাসনের বাইরে ঝোল পড়ে যায়। আবুল হাশেম হা-হা করে ওঠে, এইডা কী করলি মা? চৌউকখে দেহ না? গায়ে বল নাই। হাত কাঁপে ক্যা?
আবুল হাশেমের কড়া ধমকে জবেদ আলী ব্ৰিত বোধ করে। তবু মৃদু হেসে বলে, থাউক চাচা। কিছুতো অয় নাই।
না, না, কামডা ঠিক অয় নাই। মাইয়ামানষের হুঁশ থাকা লাগে।
আবুল হাশেম যে কিছুটা বিরক্ত তা বোঝা যায়। সে এখানে রাহানুমের উপস্থিতি পছন্দ করছে না। ভাবতেই রাহানুম মনে মনে ফুসে ওঠে। যদি ওর করতলে কোনো সৌভাগ্য চিহ্ন জেগে ওঠে তাহলে ও আর আবুল হাশেমের কর্তৃত্ব মানবে না। আবুল হাশেমের ধমক নিঃশব্দে হজম করলেও রাহামের চিত্ত অপ্রসন্ন হয় না। ও কিছুতেই ভুরু কুঁচকে রেখে নিজের ক্রোধ প্রকাশ করবে না বলে ঠিক করে। এ সময়ে মন খারাপ করলে চেহারায় তার ছাপ পড়বে, যেটা জবেদ আলীর ভালো নাও লাগতে পারে। ও বুঝতে পারে জবেদ আলীও আবুল হাশেমের ওপর বিরক্ত হয়েছে।
তখন আবুল হাশেম জবেদ আলীর দিকে মনোযোগ দেয়, খাও, বাজান খাও। মাগো, ওরে আরো দু’খান গোস্ত দাও। তোমারে মুই কত ছোড় দেখছিলাম। কতকাল মোগ দেহা নাই। তোমার বাপে ভালো আছে?
হ, ভালো আছে।
তোমার পরিবার কি বাজান?
মোর পরিবার নাই। বিয়া কইল্যাম। গত বছর মইরা গেছে। গুড়াগাড়াও নাই।
আহা, দুখের কতা।
জবেদ আলী মুচকি হাসে। আবুল হাশেমকে আড়াল করে রাহানুম ঝটিতে ওর মুখের দিকে তাকায়। মুচকি হাসি জবেদ আলীর স্বভাব। ওর ভালোই লাগে। রাহানুম বুঝতে পারে লোকটি ক্রমাগত ওকে টানছে–যতই দিন বাড়ছে সে টান প্রবল হচ্ছে। এখন ওর বউ নেই এবং ছেলেমেয়েও নেই শুনে ওর বুকের ওপর থেকে বিশাল ভার নেমে যায়। এবং সেখানে অকস্মাৎ বাঁধভাঙা আনন্দের স্রোত এসে ভরে যায়। ও সঙ্গে সঙ্গে একটি সিদ্ধান্ত নেয়, কঠিন সিদ্ধান্ত।
জবেদ আলীকে জানাতে হবে যেও সুখদীপের মা নয়। কোনো সুখদীপ ওদের মাঝে দেয়াল তুলে দাঁড়াবে না। ওর জীবনে পিছুটান নেই, ও একা–ভীষণ একা। অনায়াসে সুখদীপকে ছেড়ে জবেদ আলীর হাত ধরে চলে যেতে পারে। বউ-ছেলেমেয়ে না থাকার মতো এত ভালো খবর আজ ওর জন্য জমা ছিল–কী দারুণ দিন। নিশ্চয়ই করতলে সৌভাগ্য চিহ্ন ফুটে উঠেছে। ও দেখতে পাচ্ছে না; দেখার দরকারও নেই। শুধু সৌভাগ্যের ঘটনাগুলো ঘটে গেলেই হয়।
ও আবুল হাশেমের শ্রবণশক্তি আড়াল করে চাপা কণ্ঠে বলে, আমনহেরে আর দুগ্যা পোলাও দি?
দ্যান।
জবেদ আলী মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। ও নিজেও আবুল হাশেমের শ্রবণশক্তি আড়াল করতে চায়। কিন্তু বুঝতে পারে ঘটনাটি আড়াল করা হয় না। তা আবুল হাশেমের প্রখর দৃষ্টিশক্তি এড়ায় না। এই ছোট্ট নাটকটুকু ও ধরে ফেলতে পারে।
রাহানুম থালা ভরে পোলাও দেয়। নারকেলের দুধ দিয়ে ডিম রান্না করেছে, মুরগির ঝোল করেছে, সঙ্গে চিচিঙ্গার ভাজি। ও জবেদ আলীকে আরো দুটো ডিম তুলে দেয়। বুঝে যায় যে এ বেলাও ওর নিজের তেমন কিছু জুটবে না, হয়তো মুরগির নরলি বা পাখনা বা গিলা। কী এসে যায়? একজন মানুষ তো খুশি হচ্ছে, যার খুশির সঙ্গে নিজের খুশি যুক্ত করার জন্য ও উদগ্রীব হয়ে উঠেছে।
আবুল হাশেম বিড়ি ফুকছে, একটার পর একটা। সাধারণত এমন। একটানা টানে না ও। কিন্তু আজ ভেতরে ছটফটানি–বিড়ির নেশা একটা অবলম্বনের মতো। আবুল হাশেম একরাশ ধোয়া ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত কিছু চিন্তা করে। রাহানুমকে দেখে, সুখদীপকেও অন্য দৃষ্টিতে অবলোকন করে। বুঝতে পারে রাহানুম জবেদ আলীকে সামনে রেখে এই সংসারকে উপেক্ষা করছে। করুক, করতে পারলে মঙ্গলই হয়। এখন রাহামের মুখটা ওর সামনে জলোচ্ছ্বাসে আছড়ে পড়া ভাঙা ট্রলারের মতো মনে হয়–টুকরো টুকরো, বিক্ষিপ্ত। আবর্জনার মতো জমিয়ে আগুন ধরিয়ে দিলেই হয়–পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। ও সুখদীপের দিকে আবার তাকায়–দেখে সুখদীপ একটা কাঁকড়া, কারো পায়ের। নিচে চাপা পড়ে মরে চ্যাপ্টা হয়ে আছে। ওটার ঠ্যাং ধরে সমুদ্রে ছুড়ে ফেলে দিলেই হয়। নদী থেকে যে মানুষের জমি জেগে ওঠে তার আর পুরনো জোড়াতালি চলে না। তাকে সবকিছু নতুন করে ঢেলে সাজাতে হয়।
ও তখন আকর্ণ বিস্তৃত হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে বলে, তুমি আজ রাতে আমার এহানে থাকো বাজান। কার্ল বেহানে আমি তোমার লগে নতুন চরে যামু।
রাহানুম চমকে আবুল হাশেমের মুখের দিকে তাকায়। ও দেখতে পায় বালুর ওপর কাঁকড়ার হেঁটে যাওয়ার মতো আঁকাবাকা রেখা জেগে উঠেছে সেই মুখে। ভুরু কুঁচকে আছে এবং দুভুরুর মাঝে প্রশ্নবোধক চিহ্ন। সেজন্যই বোধহয় চোখ জোড়া ছোট দেখাচ্ছে। আবুল হাশেম কেন জবেদ আলীকে থাকতে বলছে? কী মতলব? শুধুই কি জমি দেখতে যাওয়া নাকি অন্যকিছু? রাহানুম কিছু বুঝে ওঠার আগেই জবেদ আলী খুশিতে মাথা ঝাকায়। ঘন ঘন মাথা নেড়ে বলে, হ, ঠিকই কইছেন চাচা। আমনহের যাওনেরই কাম।
কথাটা বলার পরপরই জবেদ আলীর সঙ্গে রাহালুমের চোখাচোখি হয়। রাহামের ঠোঁটে চিকন হাসির রেখা, প্রায় অদৃশ্য, গভীর দৃষ্টিতে না তাকালে দেখা যায় না, তবু সেই হাসির রেখা জবেদ আলীর দৃষ্টি এড়ায় না। বউ মরে যাওয়ার পর থেকে ওর মনে যে দুঃখবোধ জমাট ছিল এই মুহূর্ত থেকে তা দ্রবীভূত হতে শুরু করেছে। ও আশ্বস্ত হয় এই ভেবে যে যাক কাউকে খুঁজে পাওয়া গেল। যে খানিকটা অন্যরকম, ভাবে প্রকাশ করে, শুধুই ঘরের বউ হবে না। সন্তানের মা হতে গিয়ে হয়তো মরেও যাবে না।
