আবুল হাশেম কোত করে ভাত গিলে বলে, এমনে।
ওদের মধ্যে আর কোনো কথা হয় না। ওর সব কাজ পড়ে আছে। রাতের হাঁড়িকুড়ি কিছুই দেওয়া হয়নি। নিজেরও খাওয়া হয়নি। পান্তা শেষ। এই বেলা ওর আর খাওয়া হবে না। মনে মনে ভাবে, থাক, না খেলে কী হবে? একবেলা না খেলে তো মানুষ মরে যায় না। রোজার সময় কতদিন সেহেরি খাওয়া হয়নি। সেদিন না খেয়েই রোজা রেখেছে। আর আজকের পরিস্থিতিতে অন্যরকম। একজন মানুষ হঠাৎ করে সাতসকালে উঠোনে এসে দাঁড়ালে তখন অন্য আর একজন মানুষের না খেয়ে থাকতে হয়। এই ব্যাকুলতাই কি ঘর? খুব কাছের কারো জন্য তীব্র আকাক্ষা। নইলে ঘরটা হয়ে যায় কেবলই বাসস্থান? শুধুই দিন কাটানোর আস্তানা? না এমন ঘর ও চায় না। ঘর হবে উষ্ণতার–ভালোবাসার; ব্যাকুলতার–তীব্রতার।
ঘরের স্বপ্নের ছবি দেখতে দেখতে ও পেছন দরজা দিয়ে উঠোনে নামে। কোন মুরগিটা ধরবে চিন্তা করতে থাকে। বাচ্চা ফুটানোর জন্য ধাড়ি মুরগিটা ডিমে তা দিচ্ছে। ওটার মুখ থেকে গরগর শব্দ বেরুচ্ছে। রাহানুম কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। মুরগিটা একটা ডিম ঠোকরাচ্ছে। এখন একটা বাচ্চা বের করবে। খোসাটা ভেঙে দুটুকরো হয়ে গিয়ে একটি বাচ্চা বেরুলো। ওটা নড়ছে। লোমহীন শরীরটা কাঁপছে। রাহনুম হাতে তুলে নেয়। কী নরম, কী তুলতুলে। রাহনুমের হাতের তালুতে ওর একটা অস্তিত্ব আছে। ওর হাতের তালুর রেখার মতো মুরগির বাচ্চাটির শরীর–আঁকাবাঁকা নীল রেখা বেড়ে উঠছে ওই শরীরে–পাতলা চামড়া ভেদ কের ফুটে উঠেছে অন্তরালের বস্তুনিচয়। ধাড়ি মুরগি গরগর শব্দে ক্রোধ প্রকাশ করছে, রাহানুমকে আক্রমণ করতে চাইছে, রাহালুমের উপস্থিতি ওর কাছে কাম্য নয়।
বাচ্চাটি রেখে দিয়ে ও নিজের করতলে তাকায়। যদি সমস্ত রেখাগুলো দেখা যেত? ও নিজের হাত কপালে ঠেকায়। এই মুহূর্তে ফুটে উঠুক কোনো সৌভাগ্যের চিহ্ন। আর একবার জ্বলে উঠকু ওর নিয়তি। আর একবার। ভাবতেই হৃদয় গুড়িয়ে যায় রাহানমের। বির হয়ে যায় শরীর। মুরগির খাঁচার সামনে থেকে উঠতে ইচ্ছে করে না। একদিন ও নিজেও ডিমের খোলস-ভাঙা সন্তান পেয়েছিল। তারপর? ঘরের ভেতর থেকে আবুল হাশেমের ডাক শুনতে পায়, মা মাগো। তবুও উঠতে পারে না রাহানুম। আবার আবুল হাশেম ডাকে, মাগো কই গেলা, পানি দেও।
ও নড়ে না। ডাকুক, ডেকে ডেকে ক্লান্ত হয়ে যাক আবুল হাশেম। ও আর সাড়া দেবে না। আবুল হাশেমের প্রয়োজন ওর জীবনে দীর্ঘস্থায়ী হোক ও তা চায় না। কারণ সত্যিকারের ঘরের বাইরে ছিটকে পড়ে এইভাবে একা একা বেঁচে থাকা অর্থহীন। ও খোপ থেকে মুরগি নিয়ে পাশের বাড়িতে যায় মুরগিটা জবাই করার জন্য। পেছনে পড়ে থাকে আবুল হাশেমের ডাক।
দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পরিপাটি আয়োজন হয়। বাতাসে ভেসে বেড়ায় পোলাওর গন্ধ। সুখদীপ অন্তহীন খুশিতে ভরপুর। যতক্ষণ রান্না। হয় রাহালুমের হাতের কাছে থাকে। এটা-ওটা এগিয়ে দেয়। তারপর একসময় ফাঁক বুঝে চলে যায় জবেদ আলীর সঙ্গে।
খাওয়া-দাওয়ার সময়ে রাহাম ইচেছ করে নিজ হাতে পরিবেশন করে। সকালে যে সাহসটুকু অর্জন করতে পারেনি দুপুরে সেই সাহসটুকু ও অর্জন করে। সাহস হবে না কেন? কতদিন ও প্রিয়জনকে সামনে বসিয়ে ভাত খেতে দেয়নি। কতদিন হয়ে গেল, তাজা স্মৃতি ঝাপসা হয়ে গেছে যে! সরাসরি মুখের দিকে না তাকালেও অনুভব করতে পারে যে জবেদ আলী গভীর দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকায়। লোকটির ভাসা চোখে ডাক আছে–সাগর যেমন জেলেকে ডাকে তেমন ডাক। কখনো জেলে ঝড়-জল উপেক্ষা করে, বুঝতে পারে না বিপদের সংকেত, ভুলে যায় মরণের কথা, জবেদ আলী এখন তেমন একটা সাগর। ওকে মরণের ডাক দিয়েছে। বাসন ভর্তি করে পোলাও-মাংস এগিয়ে দেবার সঙ্গে চোখাচোখি হয় জবেদ আলীর সঙ্গে। লোকটি মুচকি হাসে, এত চেনা সে হাসি যে চট করে বোঝা যায় না। শুধু বুঝতে পারে রাহানুম একা।
একটু দূরে একটা জলচৌকিতে আবুল হাশেম বসে আছে। ঘোমটার আড়ালে রাহালুমের মুখ দেখা যায় না। তাই রাহামের আবেগ আবুল হাশেম বুঝতে পারে না। জমি ফিরে পাওয়ার খুশিই প্রধান বলে ধরে নেয়। সে জবেদ আলীর সঙ্গে নানা প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলছে। জবেদ আলী ছোট্ট করে জবাব দিচ্ছে। কখনো হা-না করে মাথা নাড়ছে। ভাবটা এমন যে ওর কথা বলার খুব ইচ্ছে নেই। রাহনুমের ধারণা জবেদ আলী মন দিয়ে কথা শুনছে না। ওর আগ্রহ এখন খাবারে এবং রাহামে। দীর্ঘদিন এমন সুস্বাদু খাবার ও খায়নি। বছর দেড়েক আগে বউ মারা যাবার পর মা ছাড়া আর কেউ ওকে ভাত বেড়ে দেয়নি। জবেদ আলীর আজ সুখের দিন হবে না তো কার হবে?
ওর সঙ্গে সুখদীপ খাচ্ছে। পোলাও-মুরগি পেয়ে ও আজ খুব খুশি। কোনোদিকে তাকায় না, একমনে ভাত খায়। অনেকক্ষণ জবেদ আলীর সঙ্গে ঘুরেছে। পুকুরে গোসল করেছে। দুজনে অনেক গল্প করেছে। জবেদ আলী জেনে গেছে যে রাহানুম সুখদীপের মা, ওর বাবা নেই, কোথায় সেটা সুখদীপও জানে না। তবু জবেদ আলীর খানিকটুকু খটকা থেকেই যায়। ওর ধারণা রাহালুমের দৃষ্টিতে কুমারীর লজ্জা আছে, সংকোচও আছে–বিবাহিতা নারীর খোলামেলা ভঙ্গি ওর মধ্যে কম। কোথায় যেন খানিকটুকু ফাঁক থেকেই যায়। যেজন্য রাহানুম ওর কাছে কিছুটা রহস্য, কিছুটা বিস্ময়। বোঝাই যায় বিবাহিত জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ওর নেই–পুরোপুরি নারী হয়ে ওঠার শুরুতেই ও কোনো না কোনোভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। সেটা কীভাবে, জবেদ আলী তা বুঝতে চায়।
