ততক্ষণে আবুল হাশেম হাতমুখ ধুয়ে এসেছে। এতক্ষণ সুখদীপ ওর সঙ্গে কথা বলছিল। লোকটি কী কথা জিজ্ঞেস করেছে সুখদীপকে? ও সুখদীপকে ডাকে। সুখদীপ দৌড়ে আসে, কী মা?
এইগুলা লইয়া যাও।
সুখদীপের হাতে পানির জগ আর লবণের বাটি পাঠায়। নিজে ভাতের বাসন দুটো নিয়ে এসে বারান্দায় হোগলার ওপর রাখে। ডিম ভাজা এবং লাল মরিচ সাদা ভাতের ওপর বেশ নকশি করা মনে হচ্ছে, ভালোই লাগে রাহামের। বুঝতে পারে লোকটির কাছাকাছি এলে ওর বিষণ্ণতা কেটে যায়। শুধু বুকের ভেতর আশঙ্কা, ডিমভাজা লোকটার পছন্দ হবে তো?
ভাত দেখে দরজার এপাশে আসার সঙ্গে সঙ্গে ও নিজের আচরণে নিজেই বিব্রত বোধ করে। বুঝতে পারে না যে লোকটাকে খুশি করার জন্য ওর এমন আপ্রাণ চেষ্টা কেন? ও এমন ভাব করছে যেন লোকটার খুশি-অখুশির ওপর ওর অনেক কিছু নির্ভর করছে? এইসব ভেবে ও খুব লজ্জিত হয়। গুড়ের বাটিটা নিয়ে ও আর লোকটির সামনে যেতে পারে না। সেটা নিয়ে যাবার জন্য সুখদীপকে ডাকে।
লোকটি খেতে শুরু করলে আবুল হাশেম ঘরে ঢোকে। রাহানুম তড়িঘড়ি জিজ্ঞেস করে, বাবো আমনহের ভাত দিমু?
অহন না, পরে।
আবুল হাশেমের মধ্যে সেই আবুল হাশেম জেগে উঠেছে, যার বাড়িঘর, জমি জলোচ্ছ্বাসে ধুয়েমুছে যায়নি। যার জমি ছিল, ধান ছিল, গাভী-বলদের বাথান ছিল, অসংখ্য হাঁস-মুরগি, ডিম–শত শত ডিম। ছিল। সে কেন বর্গাচাষীর সঙ্গে ভাত খাবে? আবুল হাশেম খানিকটা দূরত্বে বসে জবেদ আলীর খাওয়া দেখে। বেশ খেতে পারে ছেলেটি। মুহূর্তে দু’প্লেট ভাত সাবাড় হয়ে যায়। রাহানুম খালি প্লেটে আবার ভাত দিয়ে পাঠায়। আরো এক বাটি গুড় পাঠায়। সুখদীপ ছুটোছুটি করে এসব আনা-নেওয়া করে। রাহানুম দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে খাওয়া দেখে। হ্যাঁ, খাওয়ায় দারুণ মানুষটি। সুখদীপ ওর সামনে বসে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। এতক্ষণ এটা-ওটা প্রশ্ন করছিল। এখন একদম চুপ। জবেদ আলী এক জগ পানি খেয়ে ওর দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলে, আর এক জগ পানি লও।
মা, পানি দেও।
সুখদীপ জগ হাতে ঘরে ঢোকে। জবেদ আলী বুঝতে পারে তিনজন মানুষ অবাক হয়ে ওর খাওয়া দেখছে। ওর লজ্জা হয় না। বরং ওর আচরণে এক ধরনের বীরত্ব প্রকাশ পায়, যেন এভাবেই জয় করতে হয়। এভাবেই উপরে থাকতে হয়–নিজেকে প্রকাশ করতে হয়। অন্যদের চোখের সামনে দিয়ে বীরদর্পে হেঁটে যেতে হয়।
সুখদীপ জগভর্তি পানি এনে রাখে। ও ছুটোছুটি করে কাজ করে। পানি রেখে ছুটে গেলে রাহানুম ওর হাতে পানের থালা দেয়। সেটা রেখে এসে রাহানুমকে আস্তে করে জিজ্ঞেস করে, মা বেডারে কি কয়া ডাকমু?
চাচা।
মোর চাচা অয় বুজি?
চাচা অয় না। চাচা ডাকন লাগে।
মা, মোর বাপ কেমনে?
মুই জানি না।
বেডায় মোরে জিগাইলো।
কি?
মোর বাপ কোমনে? মুই কইছি, মুই জানি না। মোর বাপ নাই হুইনা বেড়ায় একটা হাস দিল। হাস দিলো ক্যা মা? বাপ না থাকলে কি হাস দেওন লাগে?
রাহানুম বুঝতে পারে সুখদীপ আহত হয়েছে। এতদিন ওকে কেউ বাপ নিয়ে কথা বলেনি। বয়স্করাতো সবাই জান ঘটনাটা। ছোটদের বাপ। নিয়ে মাথাব্যথা নেই। সুখদীপেরও এই নিয়ে কোনো প্রশ্ন ছিল না। লোকটি কেন শিশুটিকে খোঁচালো? কী মতলব ওর? সুখদীপের বাবা না থাকার ওপর কি ওর কিছু সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে। মিশ্র প্রতিক্রিয়ায় ও তাড়িত হতে থাকে।
সুখদীপ ওর হাত ধরে ঝাকুনি দিয়ে বলে, কথা কওনা ক্যা মা? বাপ থাকলে কি হাস দেওন লাগে?
ও ওকে আদর করে বলে, অইছে যা অহন।
ওর মনেও চিন্তা গেঁথে থাকে, সত্যিইতো সুখদীপের বাবা না থাকলে ওকে হাসতে হবে কেন? এটা কি হাসির কথা? নাকি ওর বাবা না থাকাতে লোকটি খুশি হয়েছে?
তখন আবুল হাশেম ঘাড়ের ওপর ফেলে রাখা গামছা দোলাতে দোলাতে ঘরে ঢোকে। রাহানুম দ্রুত কাছে গিয়ে দাঁড়ায়, বাবো ওনারে দুপুরে ভাত খাইয়া যাইতে কন?
দাওয়াত দিবি?
হ। আমনহে জমির মালিক হইলেন। এতবড়ো খুশির খবর।
খুশি?
আবুল হাশেমের দৃষ্টিতে রঙিন মাছটা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। ছাইরঙা শরীরে রুপোলি বুটি যেন আন্ধারমানিক নদীতে হাজার তারার বুজবুড়ি। উঠছে, এলিয়ে মিশে যাচ্ছে, আবার উঠছে, ওহ কী আনন্দ? ভাবতে ভাবতে আবুল হাশেমের ভুরু বারবার কপালে ওঠে। নাকের ফুটো বড়ো হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে ও একটা বিরাট হাঁচি দেয়। হাঁচি দিয়ে বলে, আলহামদুলিল্লাহ।
রাহানুম উদগ্রীব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ওর প্রশ্নের উত্তর ও পায়নি। আবুল হাশেম কী বলবে ও তা জানে না। তাই আবার দ্রুত কণ্ঠে বলে, বাবো, মুই কতদিন পলাও রান্দি নাই। শাক্যরখানি চাউল আছে গরে। আমনহে মেলাদিন মুরাও খান নাই।
রাহালুমের দীপ্ত দৃষ্টিতে আবুল হাশেমের দৃষ্টি আটকে যায়। বুঝতে পারে মেয়েটির কণ্ঠে এক ভিন্ন রকমের ব্যাকুলতা। ওর মনে হয় নতুন চরের কথায় রাহনুমের মনে এমন খুশির জোয়ার। মণিমালা বেঁচে থাকলে হয়তো এমন খুশিই হতো। ও রাহামের সঙ্গে বড়ো বেশি একাত্মতা অনুভব করে। ওর দিকে তাকিয়ে মিগ্ধ হাসি হেসে বলে, যা রান্নাবাড়ার জোগান দে। মুই বেডারে খাইয়া যাতি কমু। দেহিস আভা পাড়া মুরা যেন জবাই করিস না। মেলা খিদা লাগছে। অহন মোরে ভাত দে।
রাহানুম আবুল হাশেমকেও কাচের বাসনে পান্তা বেড়ে দেয়। ডিম ভাজা এবং ভাজা লাল মরিচ দেয়। আয়োজন দেখে মুচকি হাসে আবুল হাশেম। রাহানুম জিজ্ঞেস করে, বাবো হাস দিলেন ক্যা?
