রাহানুম তাকের ওপর থেকে একটা কাচের বাসন নামায়। সেই বাসনে সুখদীপকে পান্তা বেড়ে দেয়। সুখদীপের চোখ জ্বলজ্বল করে ওঠে। ও বুঝতে পারে না মায়ের আজ কিসের খুশি যে ওকে কাচের বাসনে খেতে দিল? ও মার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। কাচের বাসনে ভাত দিলে ও ভীষণ খুশি হয়, কিন্তু বাসন তো সবদিনের জন্য নয়। সুখদীপ ইচ্ছে করলেই কাচের বাসনে খেতে পারে না–তার জন্য বিশেষ দিন বা অতিথির প্রয়োজন হয়। ও ধরে নেয় আজ তাহলে মায়ের কাছে ওই লোকটি বিশেষ অতিথি। ও সাবধানে দু’হাত বাড়িয়ে মার হাত থেকে বাসনটা নেয়।
কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে জিজ্ঞেস করে, বাসনে ভাত দিলা ক্যা মা?
রাহানুম মৃদু হাসে, কিছু বলে না। পান্তা ভাত সপসপিয়ে খায় সুখদীপ। রাহানুম ওর উজ্জ্বল মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। এই ছেলেটিকে ও গর্ভে ধারণ করেনি, কিন্তু ও জানে ও ওর মা। এই স্বস্তি নিয়ে ছেলেটি কি সারাজীবন কাটাবে? না কি এখনই ওকে সবকিছু বলে দেওয়ার সময়? ও জেনে যাক ওর জীবনের এক কঠিন সত্যকে। কেন ওকে এই সত্য থেকে আড়াল করে রাখতে হবে? কী লাভ? তাতে ওর জীবনের ক্ষতিবৃদ্ধিই বা কী? রাহানুম নরম কণ্ঠে ডাকে, সুখদীপ।
ও মুখ তুলে তাকায়। মুখভর্তি ভাত, গাল ফুলে আছে। কথা বলতে পারছে না। ভুরু উঁচিয়ে ইশারায় ইঙ্গিত করে, কী?
রাহানুমের বুক তোলপাড় করে ওঠে। বলেই ফেলবে বুঝি সব। সুখদীপ কেঁাত করে ভাত গিলে বলে, কি মা?
তখন বারান্দা থেকে আবুল হাশেম প্রবল উচ্ছ্বাসে চেঁচিয়ে ওঠে, ও রাহানুম, সুখদীপ? হুইন্যা যা?
রাহানুম দরজার কাছে এসে দাঁড়ায়, বাজান।
জবেদ আলী খবর আনছে আন্ধারমানিক নদী দ্যা যে চর জাগছে ওইডা মোর। ওহানে আগে মোর জাগা আল্যে। বেডারে তো মিষ্টিমুখ করান লাগে। গরে মিডা আছে?
আছে বাবো। তালের মিডা।
দে মিডা দে, ভাত দে।
রাহানুম বুঝতে পারে যে জবেদ আলী ওর দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আবুল হাশেমকে কাজের কথা বলা হয়ে গেছে জবেদ আলীর। সুতরাং আবুল হাশেমের সঙ্গে কাজ শেষ। এখন সে মুক্ত মানুষ। অনায়াসে রাহামের দিকে মনোযোগ দিতে পারে। এখন আর কে তাকে বাধা দেবে? চোখে চোখ পড়লেও দেখে জবেদ আলীর দৃষ্টি একটুও নড়ে না, কাঁপে না–স্থির অচঞ্চল। ওর শরীর শিরশির করে। রঙিন মাছের সূঁচালো মুখটা ওর উরুতে এসে আটকে যায়। ও দ্রুতপায়ে ফিরে আসে আগের জায়গায়। সুখদীপের খাওয়া শেষ। ওর বাসনে পানি ঢেলে হাত ধুয়ে নেয়। একবার মুখ তুলে জিজ্ঞেস করে, কী অইছে মা?
রাহানুম আস্তে করে বলে, তোর দাদা নতুন চরের মহাজন অইছে।
ক্যামনে?
ওহানে আগে তোর দাদার জাগা আল্যে। নদী ওই জাগা ভাইঙ্গা নেয়। অহন ওহানে চর উঠছে।
মোরা যামু না?
জানি না বাজান।
রাহালুমের চিত্তে শঙ্কা। সুখদীপের মতো খুশিতে লাফিয়ে উঠতে পারে না। আবুল হামেশের অনেককাল আগের সম্পত্তি। তাতে ওদের কী? ওরাতো আবুল হাশেমের কেউ না। ফলে জমিতে ওদের কোনো ভাগ নেই। কোনো দাবিও নেই।
তাই বলে ওরা কি খুশি হবে না? আবুল হাশেম এই মুহূর্তে ওদের আশ্রয়দাতা, শুধু আশ্রয়দাতাতো নয়, আবুল হাশেম ওদের প্রিয়জন। ওরা আবুল হাশেমকে ভালোবাসে, আবুল হাশেম ওদের ভালোবাসে। তাই আবুল হাশেমের ভালোেমন্দের সঙ্গে ওদের জড়িত হওয়া উচিত। রাহানুম অকস্মাৎ খুশিতে গদগদ হয়ে বলে, হ, বাজান, মোরাও নতুন চরে যামু। তোমার দাদার চরতো মোগও চর। আল্লারে নতুন মাটির গন্ধ না জানি কেমুন।
হ মা, ঠিক কথা।
লাফিয়ে ওঠে সুখদীপ। একছুটে বারান্দায় গিয়ে আবুল হাশেমের কোল ঘেঁষে বসে।
রাহানুম তালের গুড়ভরা কলস নামায় তাকের ওপর থেকে। একটা কলসের গুড় তলানিতে এসে ঠেকেছে। ও সে কলসটা না নামিয়ে নতুন একটা কলস খোলে। নতুন মেহমানের জন্য একটু ভিন্ন আয়োজন। আবুল হাশেম ঘরে ঢোকে। ভীষণ উত্তেজিত। ফিরে পাওয়া সম্পত্তির কথা শুনে নিজেকে ধরে রাখতে পারছে না। উত্তেজিত হলে আবুল হাশেম দ্রুত কথা বলে এবং কাঁধে রাখা গামছা ঘন ঘন নাড়ায়। বলে, কাচের বাসনে ভাত দে মা?
রাহানুম আরো দুটো কাচের বাসন মামায়। জবেদ আলী ওদের জীবনে ওলটপালট ঘটিয়ে দিয়েছে। রাহানুম হাতের কাজ বন্ধ করে আবুল হাশেমের দিকে তাকায়। আবুল হাশেম দুবার পায়চারি করে। আবার বলে, তুই জবেদ আলীরে ভাত দে মা। মুই পুকুর ধার দ্যা আই।
বাবো, বেডাটা কে? আগে তো দেহি নাই?
ওর বাপ মোর জমির বর্গাদার আল্যে।
অহন নাই?
জমিতো ছেল না। অহন চর জাগছে।
আবার বর্গা দেবেন?
দেহি, কী করি। আবুল হাশেম মাথা নেড়ে চলে যায়। উত্তেজনা রাহানুমকেও আচ্ছন্ন। করে। নতুন চর? কেমন দেখতে? মাটি কি ফকফকে সাদা নাকি লাল? সেটা কি পলিমাটির চর? নাকি কাদাভরা? স্বপ্নের মতো মনে হয় নতুন চরের গল্প। ছোটবেলার শোনা রূপকথা যেন। তেপান্তরের মাঠ আর পঙ্খীরাজ ঘোড়ায় করে চড়ে আসা রাজপুত্র। ওই কী আনন্দ। বাবো একডা চরের মহাজন। ভাবতে ভাবতে পান্তাভাতের হাঁড়িতে হাত ড়ুবিয়ে কাচের বাসনে ভাত ওঠায়। বেশ বড়ো একটা বাটিতে গুড় ভরেছে। লোকটি কেমন খেতে পারে? অনেক? কী খেতে ভালোবাসে? কেমন তরকারি? কী মাছ বেশি পছন্দ? ও কি আইট্টা কলা দিয়ে ভাত মাখিয়ে খায়? মোষের দুধ খায় নাকি গরুর? ওর স্বাস্থ্য ভালো, চমৎকার তাগড়া। নিশ্চয়ই ও প্রচুর খায়। এই সিদ্ধান্তে আসার সঙ্গে সঙ্গে লোকটির খাওয়া সম্পর্কে ওর ধারণা হয়ে যায়। কাচের বাসনে ভাত বেড়ে ওর মনে হয় রাতের বাসি তরকারি দিয়ে ভাত দেওয়া ঠিক হবে না। ও দ্রুত মাচানের ওপর উঠে মাটির হাঁড়িতে তুষের ভেতর লুকিয়ে রাখা দুটো হাঁসের ডিম বের করে। রান্নাঘরে গিয়ে পেঁয়াজ-মরিচ কুচিয়ে ভেজে ফেলে। ওর খুব। ইচ্ছে করে আরো কিছু রান্না করতে, কিন্তু এখনতো সময় নেই। এখন ভোরের খাবার দিতে হবে। লোকটি অনেকদূর থেকে হেঁটে এসেছে, নিশ্চয়ই ভীষণ খিদে পেয়েছে। তাহলে কি লোকটিকে ও দুপুরে খেয়ে যাবার জন্য বলবে? মন্দ হয় না। আবুল হাশেম রাজি হতে পারে। বাড়তি ঝামেলা মনে করবে না। কারণ অতিথি তো ওদের তেমন কেউ আসে না। কেউ এলে কত যে খুশি লাগে আজ তা মনে হলো। ডিম ভাজা পান্তাভাতের ওপর সাজিয়ে দেয় ও। সরষে তেলে শুকনো মরিচ ভেজেছে অনেকগুলো। কয়েকটা মরিচ ভাতের ওপর গেঁথে দেয়, যেন উঁচু পাহাড়ের ওপর পতাকা উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ভাতের থালার দিকে তাকিয়ে থেকে ও নিজেই মুগ্ধ হয়ে যায় সারক্ষণে মনে হয় এতকিছু ভাবা কি সংগত না অসংগত? তাহলে ওকি অন্যকিছু ভাববে? ও কী কাজ করে? মাছ ধরে না জমি চাষ করে? ওর কি ঘরে বউ আছে? ছেলেমেয়ে? ওর কি সুখের সংসার? মুহূর্তে বিষণ্ণ হয়ে যায় রাহানুম। সঙ্গে সঙ্গে ওর মনে হয় এতকিছু ভাবা উচিত নয়। যে ভাবনা মন খারাপ করে সে ভাবনা। দূরে থাকুক বলে ও উঠে পড়ে।
