হ, আছি। সাগরে গেইল্যা বুঝি?
হ, গেইল্যাম।
ভালো, ভালো। হিংরা টোকাইছো?
হ, আইজ মেলা পাইল্যাম।
ভালো, ভালো।
মুনসি ঘন ঘন মাথা নাড়তে নাড়তে চলে যায়।
রাহানুম দেখে গাছ-গাছালির মাথায় রোদ ভরে গেছে। ওর জীবনে আর একটি দিনের আলো এবং রোদ শুরু হলো। আলো এবং রোদ–আলো এবং রোদ–ভাবতে ভাবতে রাহানুম বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়ালে অবশ হয়ে যায় শরীর। দেখে সাগরের পাড়ে দেখা সেই লোকটি উঠোনে দাঁড়িয়ে আছে। কোমরে হাত রেখে চারদিকে তাকাচ্ছে। এখন রাহামের দিকে ওর পিঠ। ঘুরলেই রাহানুমকে দেখতে পাবে। ও চট করে ঘুরছে না। একভাবে দাঁড়িয়ে আছে। বারান্দায় উঠবে কি না হয়তো তা ভাবছে কিংবা চিৎকার করে কাউকে ডাকবে কি না সেকথাও ভাবছে। রাহানুম বুঝে যায় যে আবুল হাশেম এবং সুখদীপ ঘুম থেকে উঠেনি। তাই ও কাউকে দেখতে পাচ্ছে না। রাহানুম স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে হিংরাভা টুকরি নিয়ে রান্নাঘরের দরজার কাছে রাখে। তখন লোকটি রাহানুমকে দেখতে পায় এবং দু’পা এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করে, এইডা কি আবুল হাশেমের বাড়ি?
হ।
রাহানুম সোজাসুজি লোকটির মুখে দিকে তাকাতে পারে না। মাটির দিকে তাকিয়ে থাকে। মাথার ঘোমটা ঘন ঘন টানে।
লোকটি ভরাট কণ্ঠে বলে, হের ধারে মোর কাম আছে?
আইছেন কোমনে দিয়া?
লতাচাপালি দ্যা আইছি।
বয়েন।
রাহানুম বারান্দায় বিছানো হোগলা দেখিয়ে দেয়। এতক্ষণে লোকটির চোখে চোখ পড়ে। লোকটি গভীর চোখে ওর দিকে এক পলক তাকিয়ে বারান্দায় গিয়ে বসে। ওর পায়ে জুতো নেই। পরনে সবুজের ওপর সাদা চেক-কাটা লুঙ্গি। সেটা পায়ের গোড়ালি থেকে অনেকখানি ওপরে ওঠানো। জুতো না পরে অনেকদূর থেকে হেঁটে এলে বুঝি লুঙ্গি এভাবে পরতে হয়। গায়ে ছিটের জামা। সাদার ওপর খয়েরি রঙের লতাপাতা আঁকা ছিটকাপড়। জামার ওপরের দিকে দুটো বোম খোলা। বুকের ঘন কালো পশম দেখা যায়। ওর বাম হাতে তাবিজ বাঁধা–বেশ বড়ো সাদা রঙের তাবিজ। ওর চোখে চোখ পড়ার পর থেকে রাহামের মনে হয় চোখ জোড়ায় এক ধরনের মায়া আছে।
মনে মনে দুরন্ত সাহস সঞ্চয় করে জিজ্ঞেস করে, আমনেহর নাম কি?
জবেদ আলী।
নাম বলে লোকটি মুচকি হাসে। বড়ো গোঁফ। খাড়া নাক। শরীরের বাঁধুনি ভালো। খুব অল্প সময়ে জবেদ আলীকে দেখা হয়ে যায় রাহামের। ওর ভালোই লাগে। ওর ভেজা শাড়ি শরীরে শুকিয়ে গেছে।
অনুভব করে আঁটসাঁট শরীরের বাঁধনে ফুরফুরে ভাব। দ্রুত দরজা ঠেলে ঘরে ঢোকে।
বাজান? বাজান?
জবেদ আলী বারান্দায় বসে রাহালুমের কণ্ঠস্বর শুনতে পায়। মনে হয় এক আশ্চর্য কণ্ঠ–এর সঙ্গে সাগরের কলধ্বনির মিল আছে, তবু শুনতে ভালো লাগছে। রাতদিন শুনলেও ভালো লাগা ফুরোবে না। জবেদ আলী মনে মনে হিসেব কষে। ক্ষেত, লাঙ্গল, গরু, ফসল ইত্যাদির হিসেব। কত ধানে কত চাল সে হিসেবও মনের মধ্যে পাক খায়।
রাহানুম আরো দুতিন বার বাজান, বাজান বলে ডাকে। শেষ রাতের দিকে ঘুমিয়েছে আবুল হাশেম। ধরতে গেলে প্রায় সারারাতই জাগা। তাই ঘুম ভাঙে না। আরো কয়েকবার ডাকতে হয় রাহনুমকে। যখন ঘুম ভাঙে তখন বিভ্রান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে আবুল হাশেম, যেন পূর্ণিমার সুরা পান করে তার মগজে এখন খোয়ারি। রাহানুম ওকে ধাক্কা দেয়।
ও বাবো, ওঠেন। লতাচাপালি দ্যা আমনহের ধারে অউক্যা ব্যাডা আইছে।
কোমনে? ক্যা?
যেন আবুল হাশেমের কান পরিষ্কার নয়। ঠিকমতো শুনতে পাচ্ছে না।
লতাচাপালি দ্যা বাবো? লতাচাপালি?
রাহানুম কিছুটা চেঁচিয়ে বলে। আবুল হাশেম তবুও জিজ্ঞেস করে, ক্যা আইছে?
মুই জানি না।
অকস্মাৎ মন খারাপ হয়ে যায় রাহালুমের। অভিমানও হয়। লোকটিতো ওকে বলেনি যে কেন এসেছে। লোকটিতে ওকে বলতে পারত? বললে কী ক্ষতি হতো। অভিমানে ওর চোখ ছলছলিয়ে উঠতে চায়। ও ঠোঁট কামড়ে রেখে নিজের আবেগ দমন করে।
আবুল হাশেম বিছানায় উঠে বসে। ঘুমের আমেজ কাটতে চায় না। বসে বসে হাই তোলে। চোখ কচলায় আড়মোড়া ভাঙে। বালিশের নিচ থেকে গেঞ্জিটা টেনে বের করে গায়ে দেয়। গামছা খুঁজে নিয়ে ঘাড়ের ওপর ফেলে। রাহানুম ভেবে দেখল লোকটি যদি ওকে বলত কেন এসেছে তাহলে আবুল হাশেমের কাছে ও বেশ বাহাদুরি নিতে পারত। খবরটা বলতে পারলে আবুল হাশেমের কাছে ও গুরুত্বপূর্ণ হয় যেত। সেটি হলো না। এটি একটি পরাজয় বলে মনে হয় ওর।
এখন আবুল হাশেম উঠছে না দেখে ওর রাগ হয়। লোকটি বাইরে অপেক্ষা করছে। ও কতক্ষণ অপেক্ষা করবে? কাউকে বসিয়ে রাখলে তাকে গুরুত্ব কম দেওয়া হয়। রাহানুম দাঁত কিড়মিড় করে। আবুল হাশেম দ্রুত বেরিয়ে লোকটিকে আপ্যায়ন করলে লোকটির কাছে ওর গুরুত্ব বাড়ত। বুঝত বাবার সংসারে রাহামের ভীষণ প্রতিপত্তি। মনে হয় এখানেও ওর পরাজয় হলো। সকাল বেলার দারুণ সময় পেরিয়ে ও এখন খারাপ সময়ে প্রবেশ করেছে। ও বিষণ্ণ হয়ে যায়। খারাপ লাগতে শুরু করে।
আবুল হাশেম তখনো বিছানায় বসেই আছে। রাহানুম দৃষ্টিতে আগুন ঝরিয়ে বিড়বিড়িয়ে গাল দেয়, বুড়া হাবড়া। য্যান ল্যাংড়া অইছে। আঁটতে পারে না।
আবুল হাশেম রাহানুমকে ভ্রুক্ষেপ করে না। ধীরেসুস্থে স্পঞ্জের স্যান্ডেলে পা ঢোকায়। রাহানুম ঘরের কোণে গিয়ে এঁটো বাসনকোসন নিয়ে পুকুরঘাটে যাবার জন্য তৈরি হয়। পরক্ষণে ও চুপ করে বসে থাকে। ওই লোকটির সামনে দিয়ে পুকুরঘাটে যেতে লজ্জা করে। দুদুটো পরাজয় ওকে ম্রিয়মাণ করে রেখেছে। দেখতে পায় আবুল হাশেম ধীরেসুস্থে বাইরে যাচ্ছে। সুখদীপ ঘুম থেকে উঠে বাইরে গিয়েছিল–পুকুর থেকে হাতমুখ ধুয়ে এসেছে। হোগলার ওপর বসেই চেঁচিয়ে বলে, মা ভাত দাও।
