রেলগেট ছাড়িয়ে সামনে এগিয়ে মগবাজার চৌরাস্তা থেকে বাঁয়ে মোড় নিতেই সামনে হইচইয়ের শব্দ পান। মানুষজন চেঁচামেচি করছে। বোমা বোমা—পালাও পালাও!
তার পরও তিনি গাড়ি গলিতে ঢুকিয়ে শাঁই করে সেই বাড়ির সামনে দিয়ে বেরিয়ে যান। গাড়িতে বসে অন্যরা বাড়িটা দেখে। জানালা দিয়ে ধোঁয়া বের হচ্ছে। মানুষের চিৎকার-চেঁচামেচিতে চারদিকে হুলস্থুল। আকমল হোসেন গাড়ি নিয়ে মেইন রোডে ওঠেন।
গাড়ি ছুটছে তীব্র গতিতে।
পার হয়ে যাচ্ছে বেইলি রোড, কাকরাইল, বিজয়নগর, দৈনিক পাকিস্তান চৌমাথা, মতিঝিল।
মেরিনা মায়ের হাত ধরে ঝাকুনি দিয়ে বলে, স্বাধীনতার জন্য সবচেয়ে বড় মূল্য দিয়েছে মাহমুদা।
ও আমাদের ইতিহাস।
গাড়ি তখন হাটখোলার বাড়ির সামনে এসে থামে। আলতাফ গেট খুলে দেয়।
আকমল হোসেন আয়শার দিকে মুখ ফিরিয়ে বলেন, আজ আমার ডায়েরির পৃষ্ঠায় সবচেয়ে বড় অক্ষরে মাহমুদার কথা লিখব।
আলতাফ নিজেকে আর সামলাতে পারে না। ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে চিৎকার করে কাঁদতে থাকে।
০৯. কখনো জীবনের খেরোখাতার হিসাব
কখনো জীবনের খেরোখাতার হিসাব বাতাসে উড়ে যায়। মানুষ সব হিসাবের উর্ধ্বে উঠে গেলে যোগ-বিয়োগের ব্যাখ্যায় সে হিসাবের রশি টানা যায় না। একটি একটি গিট খুলে গেলে রশি লম্বায় বাড়াতে হয়। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত টানা হয় সে রশির সীমানা।
আকমল হোসেন-আয়শা খাতুন এমন উপলব্ধিতে নিচুপ হয়ে গেছেন। মেরিনার সঙ্গেও ঠিকমতো কথা বলতে পারছেন না। বড় বেশি নির্মম সত্যের সাক্ষী হওয়া মানুষ হয়ে বোকার মতো তাকিয়ে থাকেন মেরিনার দিকে।
মেরিনা রেগে গিয়ে বলে, আপনারা এমন করে বাড়িটাকে ভুতুড়ে বানাচ্ছেন কেন? ভুলে যাচ্ছেন নাকি যে এটা গেরিলাযোদ্ধাদের আশ্রয়বাড়ি? ওরা এমন ভুতুড়ে বাড়ি দেখলে ভুলেও কেউ আর এখানে পা ফেলবে না।
মায়ের হাত ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে মেরিনা বলে, কী, কথা বলবেন না, আম্মা?
আমি তো তোর কথা শুনতে পাচ্ছি, মা। বল না, কী বলবি?
মেরিনা মায়ের কথা শুনে বাবার দিকে তাকায়।
আব্বা, আপনি কি আমার কথা শুনেছেন?
শুনেছি। তুই কিছু বলবি?
না। আমি আপনাদের ভূত তাড়াতে চেয়েছি। যাই নিজের ঘরে।
মেরিনা চলে যাওয়ার পরও দুজন চুপচাপ বসে থাকেন। দু-চারটি টেলিফোন আসে। কথা বলেন। কথা তেমনভাবে জমে না। কেমন আছ, ভালো আছি জাতীয় কথা। রাত বাড়লে ভাত খান। ঠিকমতো খেতেও পারেন না। আয়শা খাতুন একবার বলেন, আমার শরীর খারাপ লাগছে।
তাই বলেন, সে জন্য আপনি এমন গুটিয়ে বসে আছেন? আব্বা, আপনার কেমন লাগছে?
আমি জানি না, কেমন লাগছে। তবে তেমন খারাপ বোধ হয় নয়।
মেরিনা সপ্রতিভ কণ্ঠে বলে, যাক, বাঁচালেন।
খাওয়া শেষ হলে মেরিনা বাবা-মাকে শোবার ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে বিছানা গুছিয়ে দিল। আয়শা খাতুন বিছানায় গেলেন। আকমল হোসেন পড়ার টেবিলে বসলেন।
রাতে দুজনের কারোরই ঠিকমতো ঘুম হলো না।
ভোর হলো। শেষ রাতের দিকে খানিকটা ঘুমিয়ে উঠে পড়লেন দুজনে। দিনের শুরু থেকে এরকম কাটল। দুপুরের পর থেকেই আয়শা খাতুন বলছেন, ভালো লাগছে না। মাথা ছিঁড়ে যাচ্ছে মনে হচ্ছে।
আকমল হোসেন আয়শার কপালে হাত রেখে বললেন, জ্বর আসেনি। গা ঠান্ডা দেখছি। আমি আশরাফকে ফোন করে দেখি ও কী ওষুধের কথা বলে।
মাথাব্যথার জন্য তোমার ডাক্তার বন্ধুকে ফোন করার দরকার নেই। আশরাফ টিপ্পনী কাটবে।
মেরিনা হাসতে হাসতে বলে, ডাক্তার চাচা মজার মজার টিপ্পনী কাটে। শুনতে ভালোই লাগে।
আজ আমার শুনতে ভালো লাগবে না, মা। তোমরা আমাকে জ্বালিয়ে না। আমাকে একা থাকতে দাও। শরীর ঠিক হয়ে যাবে।
আব্বা, আপনি আম্মার কথা শুনবেন না।
ঠিকই বলেছ। আমি আশরাফকে দেখছি।
আকমল হোসেন ফোন ঘোরান। পাওয়া যায় আশরাফকে। মাথাব্যথার কথা শুনে ঝাড়ি দিয়ে বলে, মাথাব্যথা না ছাই। তোমার পিরিতের যন্ত্রণা। তোমার পিরিত কমাও, বন্ধু। আপাতত একটা পেইন কিলার খাওয়াও। আমি বিকেলে এসে দেখব।
আকমল হোসেন প্রয়োজনীয় ওষুধ রাখার বাক্স থেকে একটা নোভালজিন ট্যাবলেট এনে আয়শাকে খাইয়ে দিয়ে বলেন, আপাতত চুপচাপ শুয়ে থাকো। নিশ্চয়ই কমে যাবে।
আমি বিছানায় গেলাম। দেখি, ঘুম আসে কি না।
মেরিনা মায়ের হাত ধরে শোবার ঘরে নিয়ে আসে। বলে, আপনার জ্বর আসবে, আম্মা। গা গরম হচ্ছে। জ্বর কত উঠবে আল্লাহই জানে। মাথায় জলপট্টি দেব।
আমি একা থাকতে চাই, মা। আমার কিছু ভালো লাগছে না। দিনের বেলা হলেও মশারিটা ঠিকমতো খুঁজে দে। মশার উৎপাত বেড়েছে।
মেরিনা মশারি খুঁজতে খুঁজতে বলে, মাহমুদার ঘটনা কী…
মেয়েটা আমার ভেতরটা তোলপাড় করে দিয়েছে। পাকিস্তানি আর্মির হাতে নির্যাতিত হয়েও ও ভেঙে পড়েনি। কত বড় সাহসী কাণ্ড ঘটাল। বাড়ির একটি লোকও বাঁচল না। এমন একটা বীর মেয়েকে আমার স্যালুট করা উচিত।
আম্মা, আম্মা…
মেরিনা বুঝতে পারে, ওর মা আচ্ছন্নের মতো কথা বলছেন। মাহমুদার ঘটনা ওর মাকে বিধ্বস্ত করে রেখেছে। ওর দুঃসাহসী কর্মকাণ্ডের পর দিনরাত এক হয়ে গেছে আয়শা খাতুনের। মায়ের দিকে তাকিয়ে মেরিনা নিজেও বিষণ্ণ হয়ে যায়। মাহমুদা ওকেও যন্ত্রণাবিদ্ধ করে। ও আস্তে করে ডাকে, আম্মা আম্মা…
আয়শা খাতুন নিমীলিত চোখে তাকান। বলেন, বাতি বন্ধ করে দে।
তারপর চোখ বোজেন। মেরিনা বাতি বন্ধ করে চলে যায়। দরজা টেনে দেয়। তার মাথা ঝিমঝিম করছে। মনে হচ্ছে, কোথাও একঝাক মৌমাছি গুনগুন করছে। আয়শা বিছানায় উঠে বসেন। আবার শুয়ে পড়েন। একসময় নেতিয়ে আসে শরীর। তার আর কিছু মনে থাকে না। স্মৃতিতে ভেসে থাকে হাজার হাজার মৌমাছির ওড়াউড়ি।
