ইসলামী ছাত্রসংগঠন সহশিক্ষা বাতিলের দাবি জানায়। তারা বলে, সহশিক্ষা আমাদের সমাজের জন্য অভিশাপ। এর দ্বারা তরুণসমাজের চারিত্রিক অধঃপতন ঘটছে। সহশিক্ষা ব্যবস্থা আর চলতে দেওয়া উচিত না। একে বিলুপ্ত করতে হবে।
আকমল হোসেন এটুকু পড়ে মৃদু হেসে অন্য পাতায় যান। ডাইনিং টেবিল থেকে মাহমুদা আর মেরিনার কথা ভেসে আসছে। আকমল হোসেন উফুল্ল বোধ করেন। মেয়েটির স্পিরিট তাঁকে অনুপ্রাণিত করে। মেয়েটি ভীত নয়। বেঁচে থাকার চিন্তায় তাড়িত নয়। আয়শা খাতুন তার পাশে এসে বসেন। বলেন, আমি রেডি। তুমি কি চা খাবে?
এখন না। ফিরে এসে খাব। আমি ওদের জন্য অপেক্ষা করছি। ওরা আসুক আমার কাছে। আমি ওদের ডাকব না।
তিনি আবার কাগজের পৃষ্ঠায় ফিরে যান। দেশের কত জায়গায় শান্তি কমিটির নেতারা সভা করে, সে খবর পড়েন। প্রথমে কুমিল্লার হাজীগঞ্জ-তারা দেশের পরিস্থিতির জন্য ভারতকে দায়ী করে। তার পরের সভা হয় সিলেটের রেজিস্টার ময়দানে। সভা শেষে রাজাকাররা কুচকাওয়াজ করে। সভা হয় চৌমুহনীতে। তারপর চট্টগ্রামের বোয়ালখালীতে। এখানে ছয়জন রাজাকার মুক্তিযোদ্ধাদের একটি ঘাঁটি আক্রমণ করে। একজন মুক্তিযোদ্ধাকে সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেয়। এরপর ময়মনসিংহ। শান্তি কমিটির গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যরা রাজাকারের হাতে তুলে দেয় দুজন মুক্তিযোদ্ধাকে। এরপর পাংশা। এলাকার দালালেরা বলে, রাজাকার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সার্বক্ষণিক সতর্ক প্রহরার কারণে এলাকায় শান্তি বিরাজ করছে।
একনজরে সবটুকু পড়ে তিনি কাগজ ভাঁজ করেন। শান্তি কমিটির দালালেরা কোথায় কী করছে, তা জেনে রাখা তিনি জরুরি মনে করেন। সে জন্য খুঁটিয়ে কাগজ পড়েন।
কাগজ ভাঁজ করে সামনে তাকালে তিনি দেখতে পান, আলতাফ গাড়ির কাছে দাঁড়িয়ে আছে। পুবের আকাশ লাল করে সূর্য উঠি-উঠি করছে। আকমল হোসেন আয়শার দিকে তাকিয়ে বলেন, চমৎকার আগুনে-আভার আকাশ।
আয়শা চুপ করে থাকেন। একটু পর কী হবে, তা ভেবে বুক ধড়ফড় করে। তোলপাড় করছে তার ভেতরের সবটুকু।
মাহমুদা আর মেরিনা কাছে এসে দাঁড়ায়।
মাহমুদা শান্ত কণ্ঠে বলে, আমি এখন যেতে চাই। আমাদের এখনই বের হতে হবে। আর দেরি করা ঠিক হবে না।
আকমল হোসেন ব্যাগটা এগিয়ে দিয়ে বলেন, এটা তোমার ব্যাগ। আমি তোমাকে পিন খোলা শিখিয়েছি।
আমার ভুল হবে না। আপনার কাছ থেকে যা শিখেছি, তা আমি ঠিকঠাকমতো করতে পারব। বাকিটা আমার ভাগ্য। আমার জয় বাংলা মামণির দোয়া। মেরিনার ভালোবাসা। আর আপনার মতো একজন বাবার স্নেহচ্ছায়ায় কয়েকটি দিন কাটানো আমার জীবনের বিরল সৌভাগ্য। আমি রেডি।
তাহলে চলো। তোমার যাত্রা শুভ হোক, মা।
মাহমুদা একমুহূর্ত দাঁড়ায়। দুহাতে চোখ মুছে আয়শা খাতুনের পায়ের কাছে বসে পড়ে। আয়শা খাতুন ওকে টেনে তোলেন। বলেন, এখন তোমার মনের জোর দরকার।
মনের জোর আমি একটুও হারাইনি মামণি।
আয়শা খাতুন ওর গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে দেন।
আপনারা আমাকে শান্তির মৃত্যু দিচ্ছেন, সে জন্য আমি আপনাদের কাছে কৃতজ্ঞ।
কাউকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে ও সোজা আলতাফের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়।
আপনার কাছে আমি গভীরভাবে কৃতজ্ঞ। আপনি যদি সেদিন আমাকে পথ থেকে তুলে না আনতেন, তাহলে আমি দেশের স্বাধীনতার জন্য এই কাজটুকু করার সুযোগ পেতাম না।
আলতাফ দুহাতে চোখ মুছে নিজেকে সামলায়। চোখ মোছেন আয়শা আর মেরিনা। রান্নাঘরে বসে হাউমাউ করে কাঁদে মন্টুর মা।
গেট থেকে গাড়ি বের হয়। মাহমুদার কোলের ওপর ব্যাগ। ও দুহাতে ব্যাগ ধরে রাখে। ওর দুপাশে বসে আছে আয়শা আর মেরিনা।
আঙ্কেল, আপনি আমাকে মগবাজার রেললাইনের কাছে নামাবেন। তোমার ঠিকানা তো আরেকটু সামনে।
আমার মনে হয়, বাড়ির কাছাকাছি যাওয়া ঠিক হবে না। আশপাশে রাজাকাররা থাকতে পারে। আমি একটি রিকশা নেব।
আচ্ছা। তুমি যা বলবে আজ আমি সেটাই করব। সিদ্ধান্ত তোমার। আমরা তোমার সহযোগী মাত্র।
অল্পক্ষণেই মগবাজার রেললাইনের কাছে পৌঁছে যায় গাড়ি।
আকমল হোসেন গাড়ি থামান। মেরিনা দ্রুত দরজা খুলে নামে। ওর হাতের ব্যাগ নিজে নিয়ে ওকে নামতে সাহায্য করে। আলতাফ নেমে একটি রিকশা দাঁড় করিয়েছে।
মাহমুদা মৃদুস্বরে বলে, বিদায়, জয় বাংলা মামণি।
বিদায়, মেরিনা।
রিকশাটা চলে যাওয়া পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকেন আকমল হোসেন। আয়শা খাতুন-মেরিনা গাড়ির ভেতরে। তিনি দেখতে পান, আলতাফ নিজেকে সামলাতে পারছে না। কেঁদেকেটে বুক ভাসাচ্ছে।
আকমল হোসেন ধমক দিয়ে বলেন, থামো।
ও কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলে, স্যার, বাড়ি চলেন।
এখানে আর কিছুক্ষণ থাকব।
আশপাশের লোকজন কিছু ভাবতে পারে। সন্দেহ করতে পারে। দুচারজন দেখেছে যে রিকশাওয়ালার ভাড়া আপনি দিয়েছেন।
আমাদের গাড়ির ইঞ্জিন খারাপ হয়েছে, এমন ভান করতে হবে। গাড়ির ঢাকনা খোলো।
আয়শা খাতুন বলেন, তুমি এখানে থাকতে চাইছ কেন? আমাদের কাজ তো শেষ হয়েছে।
পনেরো মিনিট এখানে অপেক্ষা করে ওই বাড়ির গলিতে ঢুকব। জানতে হবে তো মাহমুদা কিছু ঘটাতে পেরেছে কি না।
মেরিনা সোৎসাহে বলে, আব্বা ঠিকই বলেছেন। আমাদের শেষ দেখে যাওয়া উচিত।
আকমল হোসেন গাড়ির ইঞ্জিনের ওপর ঝুঁকে পড়েন। চারদিকে রোদ ছড়িয়েছে। আলো-ঝলমল দিনের শুরু হয়েছে। রাস্তায় মানুষের চলাচল দেখা যাচ্ছে। তিনি ঘড়ি দেখেন। দশ মিনিট শেষ হয়েছে। ভাবেন, এখন সরে পড়াই দরকার। দরকার হলে মালিবাগ-রামপুরা চক্কর দিয়ে এসে মগবাজারের গলিতে ঢুকবেন, যেখানে মাহমুদার রাজাকার শ্বশুরের বাড়ি।
