আকমল হোসেন সন্ধ্যায় ঘরে এসে মশারি উঠিয়ে আয়শার কপালে হাত রেখে চমকে ওঠেন। জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। কী করব, ভাবলেন। ডেকে তোলা ঠিক হবে। পুরোনো কাপড় ছিঁড়ে জলপট্টি দেওয়ার ব্যবস্থা করলেন। মেরিনাকে ডাকলেন। অনেকক্ষণ জলপট্টি দেওয়ার পরে তাঁর মনে হলো জ্বর খানিকটা কমেছে। ভাবলেন, একটু দুধ বা হরলিকস খাওয়ালে বোধ হয় স্বস্তি পাবে।
মৃদুস্বরে ডাকলেন, আশা।
সাড়া নেই। ঘুমের মধ্যেও মুখমণ্ডলজুড়ে বিষণ্ণতা ম্লান করে রেখেছে চেহারা। আকমল হোসেন বিপন্ন বোধ করেন। আয়শাকে কখনো এত বিষণ্ণ দেখেননি। মাহমুদার ঘটনা কি তাকে এতই বিপর্যস্ত করেছে? সাহসী মেয়েটির সাহসকে কেন দেখবে না আয়শা? পরক্ষণে ভাবলেন, এভাবে ভাবলে আয়শার প্রতি অবিচার করা হবে। আয়শা নিজেও বলেছেন, মেয়েটি বোমা ফাটিয়ে গ্রেনেড ছুড়ে বাড়িটাকে যুদ্ধক্ষেত্র বানিয়েছে। এমন কথা বলার পরও মাহমুদার মৃত্যু আয়শাকে প্রবলভাবে ঘায়েল করেছে।
তিনি স্ত্রীর মুখের ওপর ঝুঁকে আবার ডাকলেন। সাড়া নেই।
ভাবলেন, তাঁর কাছে বসে থাকা উচিত। যদি নিজে নিজে ওঠেন। যদি কিছু চান। পানি কিংবা অন্যকিছু। কিংবা যদি তাকেই খোঁজেন? যদি বলেন, তুমি কি আমার কাছে একটু বসবে? দেখো তো আমার পালস ঠিক আছে কি না? তুমি আমার হাতটা ধরে রাখো।
আকমল হোসেন নিজের টেবিলে বসলেন। কাগজপত্র খুললেন। সকালের কাগজ আবার পড়বেন বলে উল্টালেন। সকালে পড়েছিলেন, কিন্তু প্রয়োজনীয় বিষয় নোট করা হয়নি। এখন ডায়েরিতে লিখবেন বলে পাতা খুললেন—৭ আগস্ট, শনিবার গোলাম আযম কুষ্টিয়ার পাবলিক লাইব্রেরির মাঠে শান্তি কমিটির সভায় বক্তৃতা করেন। তিনি বলেন, শেখ মুজিব ও বেআইনি ঘোষিত আওয়ামী লীগ ভারতের সঙ্গে আঁতাত করে জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। তাদের এই বিশ্বাসঘাতকতার ফলে দেশের মানুষ আজ অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশায় দিন কাটাচ্ছে। আমাদের ভাবী বংশধরেরা কোনো দিন এসব বেইমান ও বিশ্বাসঘাতককে ক্ষমা করবে না। দেশকে এদের হাত থেকে রক্ষা করতে না পারলে আমাদেরও জবাবদিহি করতে হবে।
সভায় সভাপতিত্ব করেন কুষ্টিয়ার শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান সাদ আহমেদ। সভায় যোগ দেন পশ্চিম পাকিস্তানের দুজন জামায়াত নেতা। একজন পাঞ্জাব থেকে নির্বাচিত এমএনএ নাজির আহমদ। আরেকজন রাওয়ালপিন্ডির রাজা মোহাম্মদ বারাসাত।
আকমল হোসেন নোট করার পর দেখলেন, কলমের কালি শেষ। দোয়াত থেকে কালি ভরলেন কলমে। আয়শার দিকে তাকালেন। ও গুটিসুটি শুয়ে আছে, যেন নিজেকে একটি পুঁটলি বানিয়েছে—নাকি ফসফরাস বোমা কিংবা গ্রেনেড? আকমল হোসেন চেয়ারে মাথা হেলান দিলেন। কলমের কালি পরীক্ষা করেন। মনে করেন, যুদ্ধের সবটুকু ইতিহাস তাঁকে লিখতেই হবে। মাহমুদা তার বুকের ভেতরের সবটুকু ভিত নাড়িয়ে দিয়ে গেছে। ওর কথা ভেবে তিনি বিপন্ন বোধ করেন। চোখে পানি আসে। তিনি দুহাতে পানি মুছে আবার পত্রিকার পাতায় চোখ রাখেন।
নেত্রকোনায় শান্তি কমিটির সভা হয় বাংলা প্রাইমারি স্কুল প্রাঙ্গণে। কমিটির নেতা ফারুক আহমদ বলেন, পাকিস্তান টিকে না থাকলে মুসলমানদের ধর্ম, কৃষ্টি, তাহজিব-তমদুন, ইজ্জত—কিছুই রক্ষা হবে না। চব্বিশ বছর আগে এ দেশের মুসলমানরা যেমন অধিকারবঞ্চিত ও অবহেলিত ছিল, ঠিক তেমনি অধিকারহীন হয়ে হিন্দুদের গোলামে পরিণত হবে। আর এ জন্যই শেখ মুজিব ও তাঁর বাহিনী চক্রান্তে লিপ্ত রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আমাদের এবং দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীর শরীরে একবিন্দু রক্ত থাকতে কোনো শক্তি পাকিস্তানকে ধ্বংস করতে পারবে না।
সভার সভাপতি বলেন, এই ডাকাতদল দেশকে মুক্ত করার নামে হিন্দুদের দাসত্বে আবদ্ধ করতে চায় জাতিকে। কাজেই এদেরকে মুক্তিবাহিনী বলা ন্যায়সংগত নয়। আকাশবাণীর জঘন্য মিথ্যা ও ভিত্তিহীন প্রচারণা কোনো মুসলমানেরই শোনা উচিত নয়।
আকমল হোসেন দ্রুত চোখ বোলালেন অন্যান্য খবরের ওপর। দেশজুড়ে রাজাকাররা কত কী করছে তার একটা খতিয়ান করলেন ডায়েরির পাতায়। ভাবলেন, এখন কি ঘুমোতে যাবেন? নাকি এই চেয়ারে বসে রাত কাটিয়ে দেবেন? ভোরের অপেক্ষায় থাকবেন? আয়শার ঘুম ভাঙলে বলবেন, চলো, সূর্য ওঠা দেখি। গতকাল রাব্বানী বলেছে, তোমার বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধাদের আনাগোনা বেশি। বাসাটা ছাড়বে কি না ভেবে দেখো। আর তা না করলে তুমি একা থাকো। আয়শা আর মেরিনাকে অন্য কোথাও পাঠিয়ে দাও।
আকমল হোসেন রাব্বানীকে বলেন, সবাই মিলে এই বাড়িটাকে দুর্গবাড়ি বানিয়েছে। এই বাড়ি ছেড়ে আয়শা-মেরিনা অন্য বাড়িতে প্রাণ বাঁচাতে যাবে না। ওরা এই বাড়ির প্রহরী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে। রাব্বানী মিনমিন করে বলেছিল, সবই বুঝি, কিন্তু পরিস্থিতি সামলেও চলতে হবে।
তিনি ভাবলেন, গেরিলাযোদ্ধাদের আশ্রয়ের ঠিকানা ভেঙে ফেলা ঠিক নয়। বিভিন্ন অপারেশনে গেরিলাদের সহযোগিতা না দিলে চলবে কেন? রাজারবাগ পুলিশ লাইনের সুইপার রাবেয়া আর পরদেশী নির্যাতিত মেয়েদের খবর নিয়ে কার কাছে যাবে? না, এ বাড়ি ছাড়া চলবে না। তবে আরেকটু সাবধান হতে হবে।
তিনি চেয়ারে মাথা হেলিয়ে ঘুমোতে চাইলেন। টেবিল-ল্যাম্প নেভালেন। ভাবলেন, ল্যাম্পের চারপাশে পিপড়েরা ভিড় করুক। ওরা আলোর কাছে জীবনের সমাপ্তি টানুক। মানুষেরও উচিত আলোর কাছে জীবনের সমাপ্তি টানা। স্বাধীনতাযুদ্ধ তো আলোর সময়। একজন মানুষের গৌরবের অর্জন সারা জীবনের সঞ্চয়। মাহমুদা আলোর সময়ে বীর নারী হয়েছে। এই নারীর স্মৃতি এই পরিবারের সবার জীবনের সঞ্চয়। মানুষ নিজে সঞ্চয় করে, অন্যের সঞ্চয়ও মানুষ নিজের মধ্যে রাখতে পারে। ওহ, এভাবেই ইতিহাসের পাতা ভরাবেন তিনি। যুদ্ধের ইতি ও নেতির সবটুকু তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। আকমল হোসেন দেখলেন, টেবিল-ল্যাম্পের চারপাশে পিপড়েরা উড়ে আসতে শুরু করেছে। আস্তে আস্তে বাড়ছে। দু-একটা ডানা ঝাপটে পড়ে যাচ্ছে। আশ্চর্য, পিপীলিকার পাখা হয় মরিবার তরে—এমন একটি প্রাকৃতিক নিয়ম, হায় বিধাতা! তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠতে উঠতে বললেন, তোমাদের জন্য জায়গা ছেড়ে দিলাম। মৃত্যু যে আলো, এই সত্য তোমাদের চেয়ে বেশি আর কে বোঝে! তিনি বারান্দায় এসে দাঁড়ান।
