পাতা উল্টাতে উল্টাতে শান্তি কমিটির নেতা মাওলানা নুরুজ্জামানের বিবৃতি পান। তিনি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ছাত্রছাত্রীদের অভিনন্দন জানান। রাজাকারদের কৃতিত্ব দিয়ে বলেন, একমাত্র তাদের তৎপরতার কারণেই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
আকমল হোসেন পরিস্থিতি আঁচ করেন। ধরে নেন যে হাতে অস্ত্র পাওয়া রাজাকাররা অস্ত্রের মুখে ভয় দেখিয়ে ছেলেমেয়েদের পরীক্ষার হলে ঢুকিয়েছে। মেরিনাকে এই কথা বললে ও বলবে, আব্বা, আপনি যে কেন পত্রিকার এসব খবর পড়েন।
পাতা উল্টাতে গিয়ে চোখে পড়ে শান্তি কমিটির নেতাদের সভা। তারা দুষ্কৃতিকারীদের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য অঙ্গীকার ব্যক্ত করে। কথার ফুলঝুরি ছড়িয়েছে তারা।
তিনি পত্রিকা বন্ধ করে রাখেন। আয়শার দিকে তাকালে দেখতে পান, আয়শা তার দিকে তাকিয়ে আছেন।
ঘুমাবে না?
তুমি?
মনে হচ্ছে, আজ রাতে ঘুমাতে পারব না।
আমারও তো সে রকম লাগছে।
তার পরও আমরা তো শুয়ে থাকতে পারি।
আকমল হোসেন উঠতে উঠতে বলেন, সেটা হতে পারে। টেবিলের কাছে দাঁড়িয়ে পানি খান। আয়শা খাতুন উল-কাঁটা গুটিয়ে রাখেন।
কতগুলো সোয়েটার হলো?
অনেক বাড়িতেই বানানো হচ্ছে। শ দুয়েক হয়েছে।
অনেক হয়েছে। শীত আসতে আসতে আরও হবে।
শ পাঁচেক তো হবেই।
আয়শা খাতুনও উঠে পানি খান।
আকমল হোসেন বিছানার ধারে দাঁড়িয়ে বলেন, আজকের রাতটা অন্য রকম।
হ্যাঁ। ঘড়িটা মাথার কাছে আনব?
না। টেবিলে আছে টেবিলেই থাকুক। অ্যালার্ম বাজলে ঠিকই শুনতে পাব।
দুজনে ঘুমাতে গেলেন। কিন্তু কেউই ঘুমাতে পারলেন না। বুঝলেন, রাতটা অনেক দীর্ঘ।
একসঙ্গে ঘড়িতে অ্যালার্ম বাজে তিনটি ঘরে।
আকমল হোসেন ধড়মড়িয়ে উঠে বসেন। মাথা ঝিমঝিম করে। আয়শা খাতুন শুয়ে থাকেন। গুটিসুটি হয়ে বালিশ আঁকড়ে ধরেন।
মেরিনা হাত বাড়িয়ে ঘড়ি নেয়। অ্যালার্ম পুরো বাজতে না দিয়ে সেটা বন্ধ করে। ঘড়িটা বালিশের নিচে ঢুকিয়ে রাখে। বিছানায় উঠে বসে থাকে। ওর মনে হয়, ওর সামনে সময় স্তব্ধ হয়ে গেছে। বিছানাই এখন ওর পৃথিবী। ও মাথা ঝাঁকায়।
মাহমুদা কানভরে অ্যালার্মের শব্দ শোনে। এই ভোরে শব্দের রেশ—ওর ভালোই লাগে। ও বিছানা ছাড়ে। বিছানা গোছায়। বাথরুমে ঢোকে। মুখহাত পোয়। পানির স্পর্শের স্নিগ্ধতায় নিজেকে সজীব মনে করে। আলমারিতে গুছিয়ে রাখা নিজের শাড়িটা বের করে সেটা পরে। চুল আঁচড়ায়। একমুহূর্ত বিছানার ওপর বসে থাকে। যেদিন ওকে আর্মি অফিসারদের গাড়িতে জোর করে তুলে দেওয়া হয়েছিল, সেদিন ওর কোনো অস্ত্র ছিল না। আজ ওর কাছে অস্ত্র থাকবে। ফসফরাস বোমা আর গ্রেনেড। ওই বাড়ির বাথরুমে ঢুকে ও সেগুলোর পিন খুলবে। তারপর প্রতি ঘরে…। রফিকুল ইসলাম সকালে ড্রয়িংরুমে বসে কাগজ পড়েন। ওখানে একটি। শফিকুল ইসলামের ঘরের দরজা খোলা না পেলে ও নিজেই ধাক্কা দিয়ে ডাকবে। ওর কণ্ঠস্বর শুনে চমকে উঠবে শফিকুল ইসলাম। দরজা খুলে বলবে, তুমি! ও বলবে, অফিসাররা আমাকে নামিয়ে দিয়ে গেছে। আমি কয়েকটি কাপড় নিতে এসেছি। ওদের সঙ্গে থাকতে হলে তো সেজেগুজে থাকতে হয়। ওরা আবার আমাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য আসবে। দশ মিনিট সময় দিয়েছে।
পরক্ষণে নিজেকে ধমকায়। এসব ভাবার সময় এটা নয়। ওই বাড়িতে গিয়ে অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নিতে হবে। ও বারান্দায় আসে।
আকমল হোসেন বারান্দায় বসে ওর জন্য ব্যাগ গোছাচ্ছেন—ফসফরাস বোমা আর গ্রেনেড। ওসবের ওপর আয়শা খাতুনের কাপড় দেওয়া হয়েছে। তার ওপরে খবরের কাগজ। মাহমুদার কাছে এলে বলেন, তুমি চা খেয়ে নাও, মা। আমি তোমাকে নামিয়ে দিয়ে আসব।
না, আঙ্কেল। আপনার যেতে হবে না। আমি রিকশায় যাব।
এসব নিয়ে রিকশায় যাওয়া ঠিক হবে না। তুমি চা খাও। আমি গাড়ি বের করছি। আলতাফও যাবে আমাদের সঙ্গে।
এসো, মা। ডাইনিং টেবিলে মেরিনা বসে আছে তোমার জন্য।
আয়শার দিকে তাকিয়ে মাহমুদার বুক ধক করে ওঠে। এই মানুষটি সেদিন ওকে রাস্তা থেকে তুলে বুকে জড়িয়ে এ বাড়িতে নিয়ে এসেছিল। কালকে তার গুনগুন ধ্বনি দিয়ে ওর জীবন ভরে দিয়েছে।
টেবিলে বসলে মেরিনা ওর দিকে একটি চমচম এগিয়ে দিয়ে বলে, মা তোমাকে খেতে বলেছেন। কালকে তুমি চমচম পছন্দ করেছিলে, সে জন্য মায়ের ইচ্ছা, তুমি একটা চমচম খাও।
আর কিছু না কিন্তু।
সে আমরা বুঝেছি। চমচম খেয়ে চা খাও। তোমার সঙ্গে আমি আর মাও যাব।
সত্যি? মাহমুদা খুশি হয়।
তুমি মাঝখানে বসবে। আমরা দুজন দুপাশে।
মন্টুর মা চা এনে টেবিলে রাখে, আপা, আপনি আবার আসবেন। আপনি তো পোলাও-রোস্ট খাননি। আবার এলে পোলাও-রোস্ট খেতে হবে।
মাহমুদা মুখে কিছু না বলে শুধু ঘাড় নাড়ে।
তখন গাড়ি রেডি করে খবরের কাগজে চোখ বোলান আকমল হোসেন। শিক্ষার পাঠ্যসূচি সংস্কার করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পাঠ্যসূচি থেকে উদারনৈতিক চিন্তা-চেতনা বাদ দিয়ে মৌলবাদী চেতনার বিকাশ ঘটানোর কথা বলা হয়। এ প্রক্রিয়াকে স্বাগত জানান জামায়াতে ইসলামী নেতা গোলাম আযম। তিনি পাঠ্যপুস্তক থেকে ইসলাম-পরিপন্থী সব লেখা বাদ দেওয়ার কথা বলেন।
শিক্ষা সংস্কারকে অভিনন্দন জানিয়ে স্মারকলিপি দেয় ইসলামী ছাত্রসংঘ। বলা হয়, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা সমাজের জন্য প্রবলভাবে ক্ষতিকর। এই শিক্ষা সমাজকে হিন্দুবাদ-ইহুদিবাদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আমরা জন্মগতভাবে পাকিস্তানি। কিন্তু পাঠ্যসূচিতে অনেক কিছু আছে, যা পাকিস্তানের আদর্শ, সংহতি ও অখণ্ডতার পরিপন্থী। ইসলামি সমাজ কায়েমের লক্ষ্যে ইসলামি শিক্ষা প্রবর্তন করা উচিত।
