বলেছিলেন, ফোনটা ধরো, মা। মারুফই হবে।
নিজে কথা বলে ফোনটা আকমল হোসেনকে দেয় মাহমুদা। তিনি হ্যালো বলার সঙ্গে সঙ্গে ভেসে আসে মারুফের কণ্ঠ, আব্বা, সবকিছু ঠিকঠাকমতো হয়েছে। আমরা হাইডে চলে এসেছি।
কনগ্রাচুলেশনস, বাবা। সাবধানে থেকো।
ফোন রেখে দেয় মারুফ। আকমল হোসেন রিসিভার রাখার সময় চেঁচিয়ে ওঠে মেরিনা।
হিপ হিপ হুররে। মনে হচ্ছে, বাড়িতে একটা ফসফরাস বোমা ফাটাই।
হাসিতে ভেঙে পড়ে সবাই।
এই বাড়িতে আসার পর মাহমুদা এই প্রথম প্রাণখোলা হাসিতে উচ্ছ্বসিত হয়।
হাসতে হাসতে বলে, মনে হচ্ছে আকাশে হাজার হাজার বেলুন ওড়াই। সঙ্গে হাজার হাজার পায়রাও থাকবে।
আয়শা খাতুন বলেন, তোমাকে আজ মিষ্টি খাওয়াব, মা। তুমি একদিনও মিষ্টি খাওনি।
হ্যাঁ, খাব। চমচম খাব। আজকে যা দেবেন, তা-ই খাব।
আয়শা চমচম আনার জন্য আলতাফকে দোকানে পাঠান। ফ্রিজ থেকে আইসক্রিম বের করেন। দু-তিন রকম পিঠা বানানো হয়েছিল মারুফের জন্য, সেগুলোও বের করেন। বেশ কিছুক্ষণের জন্য আড্ডা জমে ওঠে। আবার বিষণ্ণ হয় মাহমুদা। বুঝতে পারে, আনন্দের মধ্যে নিজেকে ধরে রাখা খুবই কঠিন। সেদিনের ঘটনার পর থেকে জীবনের চিত্রপট পাল্টে গেছে। ও চেষ্টা করেও অনেক কিছু খুঁজে পায় না।
রাতে খাবার টেবিলে বসে ও সবার দিকে তাকিয়ে বলে, আমি কাল সকালে সূর্য ওঠার আগে মগবাজারের বাড়িতে যেতে চাই, আঙ্কেল।
এত ভোরে?
ভোরেই যেতে চাই। নইলে বাবা-ছেলে কাজে বেরিয়ে যেতে পারে।
কেউ আর কথা বাড়ায় না। তিনজনই জানে, ও কারও কথা শুনবে না। ও দুদিন ধরে নিজেকে প্রস্তুত করেছে।
আঙ্কেল, আপনি কখন আমাকে ফসফরাস বোমা আর গ্রেনেড দেবেন?
কাল সকালে। তুমি বের হওয়ার আগে।
ও মাথা নেড়ে বলে, আচ্ছা।
মেরিনা-মাহমুদা খাবার টেবিল থেকে উঠে যায়। দুজন বারান্দায় গিয়ে বসে। আকমল হোসেন আর আয়শা উঠতে পারেন না। এঁটো হাত ধুতেও ওঠেন না। দুজনে থালার ওপর আঙুল নাড়ান। দুজনেই এক চুমুক পানি খান। দুজনেই খুব বিষয় বোধ করেন। আগামীকাল কী ঘটবে, তা তাঁরা জানেন না। শুধু জানেন, এ মেয়েটিকে তারা হারাবেন। ও কঠোর প্রতিজ্ঞায় নিজেকে যুক্ত করেছে।
বেশ কিছুক্ষণ পর আয়শা বলেন, তুমি চা খাবে?
হ্যাঁ, চা চাই। কিন্তু তুমি উঠবে না। মন্টুর মাকে বলো।
মন্টুর মা কাছেই ছিল। বলে, চুলায় গরম পানি আছে। আমি এখনই চা আনছি।
তখন গুনগুন ধ্বনি তোলেন আয়শা, এই শ্রাবণের বুকের ভেতর আগুন আছে—সেই আগুনের কালো রূপ যে আমার চোখের পরে নাচে…
মাহমুদা চমকে উঠে মেরিনার হাত চেপে ধরে।
মেরিনা মৃদুস্বরে বলে, আমার মা। এ জন্য মুক্তিযোদ্ধারা আমার মাকে জয় বাংলা মামণি ডাকে।
আমিও তা-ই ডাকব। গান শেষ হলেই আমি জয় বাংলা মামণির পায়ে চুমু দেব। বলব, আজ আমার জীবন ধন্য হলো।
ধ্বনি ছড়াতে থাকে—ও তার শিখা ছড়িয়ে পড়ে দিক হতে ওই দিগন্তরে—তার কালো আভার কাঁপন দেখো তালবনের ওই গাছে গাছে…।
টেবিলে চা আসে। আকমল হোসেন চায়ের কাপ সামনে নিয়ে বসে থাকেন। দুকান ভরে বাজতে থাকে গানের বাণী। গেটের কাছে বসে থাকা আলতাফ কান খাড়া করে। খুশিতে হাত নাড়তে নাড়তে বলে, জয় বাংলা মাগো। রান্নাঘরে বসে মন্টুর মা ভাতের গ্রাস মুখে তুলতে পারে না। মুঠিভরা ভাত নিয়ে হাত থালার ওপর স্থির হয়ে থাকে। ভাবে, আজ রাতে ভাত না খেলেও ওর খিদে পাবে না।
গানের সুরে মগ্ন হয়ে গেছে মাহমুদা। ওর মনে হয়, এই মুহূর্তে গানের গুনগুন ধ্বনি ছাড়া বিশ্বসংসারের আর কোনো কিছুই ওর সামনে নেই। আগামীকাল ও একটি মৃত্যুর ঝুঁকি নেবে, সে কথাও ওর মনে আসে না। সুরের ব্যাপ্তি ওর সবটুকু দখল করে রাখে।
আয়শার কণ্ঠস্বর কখনো চড়া হয়-বাদল-হাওয়া পাগল হলো সেই আগুনের হুংকারে—দুন্দুভি তার বাজিয়ে বেড়ায় মাঠ হতে কোন মাঠের পারে—ওরে, সেই আগুনের পুলক ফুটে কদম্ববন রাঙিয়ে উঠে—সেই আগুনের বেগ লাগে আজ আমার গানের পাখার পাছে…
একসময় গুনগুন ধ্বনি থেমে যায়।
একসময় ঘুমানোর সময় হয়।
রাত বাড়ে। আকাশে নক্ষত্রপুঞ্জের জ্বলজ্বলে আভা পৃথিবীর ওপর নেমে আসে। মাহমুদা চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে বলে, আশ্চর্য এক সুন্দর রাত পেয়ে আমার জীবন ধন্য হলো। মেরিনা, আরেক জীবনে তুমি আমার বন্ধু হবে।
চলল, তোমাকে তোমার ঘরে দিয়ে আসি। মাহমুদা কথা বাড়ায় না। উৎফুল্ল থাকার চেষ্টা করে। বলে, তুমি আমাকে অ্যালার্ম ঘড়ি দিয়েছ, সে জন্য থ্যাংকু, মেরিনা।
আমার ঘরেও একটি অ্যালার্ম ঘড়ি আছে। মা-বাবাও ঘড়িতে অ্যালার্ম দিয়েছেন, মাহমুদা। তুমি ঘুমাও।
গুড নাইট, মেরিনা।
মাহমুদা দরজায় সিটকিনি লাগায় না। দরজা মুখে মুখে লাগিয়ে রাখে। মশারির নিচে ঢুকতে ঢুকতে বলে, আম্মা, বিদায়। আব্বা, বিদায়। সনজিদা, ফাহমিদা, আশফাঁক, বিদায়। আমার সব আত্মীয়স্বজন, বিদায়। আজ রাতই আমার শেষ ঘুমের রাত। বিদায়, মুক্তিযোদ্ধারা।
মাহমুদা বালিশে মাথা রাখলে ওর ঘুম আসে। ও দ্রুত গভীর ঘুমে তলিয়ে যায়।
টেবিল ল্যাম্পটা জ্বালিয়ে আকমল হোসেন নিজের কাগজপত্রের পাতা উল্টান। দেখতে চান কোথায় কী ঘটছে। দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকায় লেখা হয়েছে, কয়েকটি সামরিক আদেশ জারি করা হয়েছে। এই আদেশে রাজাকারদের যেকোনো লোককে গ্রেপ্তার করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
তিনি একমুহূর্ত ভাবলেন। আয়শার দিকে তাকালেন। দেখলেন, আয়শা মনোযোগ দিয়ে সোয়েটার বুনছেন। ভাবলেন, ও ওর মতো থাকুক। ওর সঙ্গে এত রাতে এসব শেয়ার করার দরকার নেই। সকালে মেরিনাকে বলবেন যে সামরিক আইনকে আরও নিপীড়নমূলক করা হয়েছে। রাজাকারদের অত্যাচারের মাত্রা বেড়ে যাবে।
