তারপর একদিন বাবাকে বলেছিলাম, যে জুয়াড়ি এবং মাতাল তার সঙ্গে তো সুখ হয় না, আব্বা। বাবা বলেছিলেন, মানিয়ে নাও। বাচ্চাকাচ্চা হলে সব ঠিক হয়ে যাবে।
আমি ঠিক করার চেষ্টা করিনি, মেরিনা। ভেবেছিলাম দিন গড়াবে না। এখানকার পাট আমার চুকাতে হবে। আমার মাস্টার্স পরীক্ষার জন্য অপেক্ষা করেছিলাম। এর মধ্যে যুদ্ধ। আমি বুঝলাম যে সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করেছি। আমার মা-ও আমার পথের বাধা ছিলেন। তিনি কিছুতেই চাননি যে ওই বাড়ি থেকে আমি চলে আসি। তাহলে তার মেয়ের কলঙ্ক হবে। মেয়ের কলঙ্কের বোঝা তিনি সইতে পারবেন না। মায়ের সুখের দিকে তাকিয়ে আমি নিজেকে দমন করেছি। হায় আল্লাহ, সেটা যে এভাবে গড়াবে, তা কি আমি জানতাম!
মাহমুদা দুহাতে নিজের মাথা চেপে ধরে। মেরিনা ওকে এক গ্লাস পানি দিলে ও একচুমুকে পানি খায়। মেরিনা গ্লাসটা হাতে নিয়ে বলে, কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে থাকো।
ও বিছানায় গড়িয়ে পড়ে বালিশে মুখ গোঁজে। বালিশ থেকে চমৎকার গন্ধ আসছে। কিসের গন্ধ ও বুঝতে পারে না। ফুলের, নাকি কোনো সুগন্ধির? মাহমুদা ভুলে যেতে থাকে পুরো অতীত। ওর সামনে এখন শুধুই ভবিষ্যৎ। আর তা আশ্চর্য সুগন্ধিময়। ওর চেতনার রন্ধ্রে রন্ধ্রে সৌরভ ছড়াতে থাকে।
কয়েক দিন পর মারুফ বাড়ি ফিরে আসে।
মেরিনার কাছ থেকে প্রথমে পুরো ব্যাপারটা শোনে। বলে, ওহ্, এই ঘটনা! এখন এ বাড়িটা শুধু দুর্গবাড়ি নয়, এ বাড়ি এখন একটি যুদ্ধক্ষেত্র।
সে জন্য মাঝেমধ্যে আমি শঙ্কিত থাকি, ভাইয়া। মনে হয়, কখন এই বাড়িটা আবার রাজাকারদের নজরে পড়ে। ওরা আর্মি দিয়ে এই বাড়ির ভিটেয় ঘুঘু চরাবে।
থাক, এসব এখন ভাবিস না। তুই মাহমুদা আপাকে ডেকে নিয়ে আয়।
আয়শা খাতুন রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে ছেলের কাছে আসেন।
কী খাবি, বাবা? আলাদা কিছু রাঁধব?
পুঁইশাক আর চিংড়ি মাছ, মা।
বাতাসি মাছের চচ্চড়ি? তুই খেতে ভালোবাসিস।
মাছ কি ফ্রিজে আছে?
আছে তো। কবেই কিনে রেখেছি।
দারুণ হবে। মুগের ডাল, মা।
মেন্যুটা ভালোই দিয়েছিস। মাহমুদাও এমনই খেতে চায়। মাংসমুরগি—এসব ও খেতেই চায় না।
মেরিনা আর মাহমুদা একসঙ্গে ঘরে ঢোকে।
মারুফ উঠে দাঁড়িয়ে বলে, আমি আপনাকে চিনি। দেখিনি, এইটুকুই যা।
মাহমুদা মৃদু হেসে বলে, এই বাড়ির সবাই এমন। আপনি আলাদা হবেন কেন?
মারুফ ওর কথায় থমকে যায়। হঠাৎ করে কী বলবে বুঝতে পারে না। মেরিনা এক বাটি চালতা-মাখা সবার সামনে ধরে।
খেয়ে দেখো একটু। নুন-মরিচ দিয়ে মাখিয়েছি।
কেউই খেতে রাজি হয় না। মেরিনা কোনার চেয়ারে বসে মনোযোগ দিয়ে চালতা-মাখানো খায়। আয়শা খাতুন রান্নাঘরে চলে গেছেন। আকমল হোসেন নিজের ঘরে পড়ার টেবিলে। মারুফ আগামীকালের অপারেশনের কথা মাহমুদাকে বলে যাচ্ছে। কীভাবে কী ঘটবে, তার পুরো বর্ণনা দিচ্ছে। মাহমুদা এখন এক মনোযোগী শ্রোতা। এক দিনের কম সময় ওর সামনে। মারুফের কণ্ঠস্বর শুনতে শুনতে ও রোমাঞ্চিত হয়।
ফার্মগেট অপারেশন আমাদের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, গ্রিন রোডে ঢোকার মুখে হাতের বায়ে যে সিনেমা হলটি হচ্ছে, ওখানে পাহারা দেয় একজন সেনা। ওখানে লাইট মেশিনগান বসানো আছে। ট্রাফিক আইল্যান্ডের ওপর এবং ফুটপাতেও পাহারা বসানো আছে। ওখানে তাঁবু খাঁটিয়ে মিলিটারি পুলিশ ও ওদের সহযোগী রাজাকার থাকে।
এত পাহারার মধ্যে আমরা ঢুকে পড়ব।
আমাদের সঙ্গে থাকবে চায়নিজ এএমজি আর স্টেনগান! আরও থাকবে ফসফরাস বোমা ও গ্রেনেড-৩৬। আমাদের অপারেশনের সময় ঠিক হয়েছে রাত ৮টা থেকে ৮টা ৫ মিনিট।
মাত্র পাঁচ মিনিট?
মাহমুদার মনোযোগী দৃষ্টিতে বিস্ময়। মাত্র পাঁচ মিনিটে অপারেশন হবে।
মারুফ বলতে থাকে, আমরা এখন একটি ফক্স ওয়াগন গাড়িতে করে ফার্মগেটের দিকে যাচ্ছি। আমার আব্বা আমাদের হাতে প্রয়োজনীয় অস্ত্র গুছিয়ে দিয়েছেন। আমরা প্রথম রেকি করেছি দুপুরের দিকে। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় ফাইনাল রেকির কাজ শেষ করা হয়। ওই সময় আমরা খেয়াল করেছি, চেকপোস্টে মিলিটারি পুলিশ ও রাজাকার পাহারা দিচ্ছে। মিলিটারি কেউ নেই। ক্যান্টনমেন্টের দিক থেকে এবং ক্যান্টনমেন্টের দিকে জিপ ও কনভয় আসা-যাওয়া করছে।
আমাদের সময় মাত্র পাঁচ মিনিট।
আমরা পাঁচ মিনিটের মধ্যে একটা ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটাব।
আমরা ছয়জন গেরিলাযোদ্ধা।
আমরা ফার্মগেটে পৌঁছে গেছি। আমাদের লক্ষ্য আইল্যান্ড ও ফুটপাত।
গাড়ি থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গে ওপেনিং কমান্ড হয়, ফায়ার।
পুরো এক মিনিট ব্রাশফায়ার চলে।
ঠিক এক মিনিট পর কমান্ড হয়, রিট্রিট।
মুহূর্তের মধ্যে গাড়িতে উঠে পড়ে সবাই। তার আগে ছুড়ে দেওয়া হয় ফসফরাস বোমা ও গ্রেনেড-৩৬।
আমরা দেখলাম, বোমা ও গ্রেনেড ফাটল না। ভুলে ওই দুটোতে ডেটনেটর ফিউজ লাগানো ছিল না।
আমরা দেখেছি, ব্রাশফায়ারে নিহত হয়েছে পাঁচজন মিলিটারি পুলিশ ও ছয়জন রাজাকার।
আমরা নিরাপদে চলে আসতে পেরেছিলাম।
আমরা পাঁচ মিনিট সময় রেখেছিলাম আমাদের পরিকল্পনায়। কিন্তু আমাদের পাঁচ মিনিট সময় লাগেনি।
মাত্র তিন মিনিট সময়ে আমরা শেষ করেছি অপারেশন।
এবং আমাদের অপারেশন সাকসেসফুল।
আমাদের গাড়ি ছুটছে। আমরা হাইডে চলে যাচ্ছি।
ফোনের এপাশ থেকে মাহমুদা বলে, আপনাদের কনগ্রাচুলেশনস। আঙ্কেলের সঙ্গে কথা বলেন।
মাহমুদা রিসিভার আকমল হোসেনকে দেয়। মারুফের সঙ্গে ওর কথা হয়েছিল, অপারেশন থেকে ফিরে ও বাড়িতে একটি ফোন দেবে। মাহমুদা সবাইকে বলেছিল, ফোনটা ও ধরবে। ঘড়ি দেখে আকমল হোসেন সবাইকে নিয়ে ফোনের কাছে এসে বসেছিলেন। ফোন বেজে উঠলে তিনি মাহমুদাকে
