সবাই মাথা নেড়ে বলে, ঠিক।
আমি রোজ ওকে দেখতে আসব। কোনো কিছু জরুরি হলে জানাবেন।
রওশন আরাকে বিদায় দিয়ে প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে আয়শা মেরিনাকে বলেন, কতটুকু সময়, কত কিছু ঘটে গেল!
মেরিনা দুহাত মুঠি করে ধরে বলে, মাহমুদা খুব শক্ত মেয়ে। একটুও ঘাবড়ায়নি। ও বলেছে, ওর শরীর স্বাধীনতার। ও বোমা দিয়ে ওর শ্বশুরবাড়ি উড়িয়ে স্বাধীনতার শহীদ হবে।
আল্লাহ ওকে হায়াত দিক।
ও হায়াত চায় না, আম্মা। ও ঠিকই করে ফেলেছে যে ও স্বাধীনতার শহীদ হবে।
আয়শা মাথা নাড়েন। বুঝতে পারছি, ও আমাদের একজন গেরিলাযোদ্ধা। চল, বারান্দায় বসে তোর আব্বার জন্য অপেক্ষা করি। ফিরে এলে আমরা একসঙ্গে নাশতা খাব।
মাহমুদার জন্য স্যুপ বানাতে বলেছি।
ভালো করেছিস। আলতাফকে পাঠিয়ে ওর জন্য আলাদা বাজার করতে হবে। তুই একটা তালিকা করিস।
কিছুক্ষণ পর ফোন আসে মারুফের।
আমি রূপগঞ্জ চলে যাচ্ছি, মেরিনা।
কবে ফিরবি, ভাইয়া?
কয়েক দিনের মধ্যে। তখন এসে বাড়িতে থাকব। আমাদেরকে ফার্মগেটে একটা অপারেশন করতে হবে।
আমাদের বাড়িতে একজন অতিথি আছে, ভাইয়া। আজ সকালেই তাকে আনা হয়েছে।
আনা হয়েছে মানে কী রে? কোথায় থেকে আনা হয়েছে। কে সে?
একজন গেরিলাযোদ্ধা।
গেরিলাযোদ্ধা? আমার পরিচিত কেউ? আমি কি চিনি?
না। তুমি তাকে চেনা তো দূরের কথা, কোনো দিন দেখোইনি।
সে কি আলতাফ ভাইয়ের কেউ?
না।
তার নাম কী? তার নাম কী? ঠিক করে কথা বলছিস না কেন? আমার খুব রাগ হচ্ছে, মেরিনা। তার নাম বল।
মাহমুদ।
তুই কি আমার সঙ্গে ফান করছিস? এটা কি আমাদের ইয়ার্কি করার সময়।
ফান নয়, রিয়ালিটি, ভাইয়া।
ঠিক আছে, আমি এসে দেখব। আম্মা-আব্বা কেমন আছে?
দুজনেই ভালো।
আব্বাকে দে।
আব্বা ডাক্তার খালাম্মাকে পৌঁছে দিতে গেছেন।
ডাক্তার? আম্মার কিছু হয়নি তো?
রাখছি, ভাইয়া। আমরা সবাই ভালো আছি।
আকমল হোসেন ফিরে আসেন। গাড়ি গ্যারেজে ঢুকিয়ে এসে বারান্দায় বসেন। আয়শা বলেন, কয়েক ঘণ্টা সময় মাত্র। কিন্তু কত বড় একটা ঘটনা ঘটে গেল।
আমার ডায়েরির পাতা আজ ভরে যাবে। আমরা ইতিহাসের একটি বড় সাক্ষী হলাম।
শুধু কি সাক্ষী?
আমরা তো অংশও নিলাম। মাহমুদাকে বাড়িতে আনাও আমাদের যুদ্ধে অংশগ্রহণ।
আকমল হোসেন পা থেকে স্যান্ডেল খুলতে খুলতে বলেন, সামনে একটা অপারেশন আছে। ছেলেরা প্রস্তুত হচ্ছে।
কোথায় হবে?
ফার্মগেট এলাকায়।
আকমল হোসেন উঠতে উঠতে বলেন, ভীষণ খিদে পেয়েছে, আশা।
গোসল করে টেবিলে এসো। নাশতা টেবিলে দিয়ে দিচ্ছি। দেরি কোরো না।
আসছি। তাড়াতাড়ি আসব। গায়ে শুধু পানি ঢালব আর মুছব।
দুজনে হাসতে হাসতে দুদিকে চলে যায়।
মাহমুদাকে বিশ্রামের বেশি সুযোগ দেয় সবাই। ও বেশ দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠছে। হাঁটতে পারছে। ডাইনিং টেবিলে গিয়ে খেতে পারছে। বাকি সময় নিজের ঘরে চুপচাপ বসে থাকে। বেশি কথা বলে না।
মেরিনাকে বলে, মগবাজারের বাড়িতে ঢোকা আমার জন্য সহজ। ওরা তো আমাকে দেখে চমকে উঠবে। ভাবতেই পারবে না যে আমি আবার ওই বাড়িতে যেতে পারব। আমি শাশুড়িকে সব কথা বলব। অসুস্থ হয়ে গেলে ওরা আমাকে রাস্তায় ফেলে দিয়েছিল, বলব। আশপাশের লোকজন আমাকে মেডিকেল হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল, বলব। এর পরে কাপড়চোপড় নিতে এসেছি বলতে পারব। আমার দু-তিনটি বোমা ও গ্রেনেড দরকার, মেরিনা। কোথায় থেকে জোগাড় করা যাবে?
ধরো, বোমা পাওয়া গেল। কিন্তু ওই বাড়িতে গিয়ে বোমা ফাটালে তুমি কি…
তুমি আমার কথা ভাবছ কেন?
আমি তো নিজের মৃত্যু হাতে নিয়েই ওই বাড়িতে ঢুকব। যারা যুদ্ধ করছে, তারা কি মৃত্যুকে সামনে রেখে যুদ্ধ করছে না?
মেরিনা চুপ করে থাকে। মাহমুদার দিকে তাকিয়ে ওর চোখের পলক পড়ে না। একসময় চোখ নামিয়ে বলে, আমরা ঠিক করেছি, আগস্ট মাসে পাকিস্তানের জাতীয় দিবসে আমরা শহরজুড়ে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে দেব। আমাদের অনেক পতাকা বানাতে হবে। তুমি আমাদের সঙ্গে থাকবে, মাহমুদা?
না। পতাকা বানানোর সময় আমি পাব না। আমি দু-এক দিনের মধ্যে মগবাজারের বাড়িতে ঢুকতে চাই। আঙ্কেল যদি আমাকে গ্রেনেড আর হাতবোমা জোগাড় করে দেন।
জোগাড় করতে হবে না। এ বাড়িতেই তোমার চাহিদার জিনিস আছে, মাহমুদা।
এই বাড়িতে?
হ্যাঁ, এটা একটা দুর্গবাড়ি। আগামীকাল ছয়জন মুক্তিযোদ্ধা আসবে বাড়িতে। এখান থেকে অস্ত্র নিয়ে ওরা অপারেশনে যাবে।
মাহমুদা উত্তেজনায় দাঁড়িয়ে পড়ে। বলে, কখন আসবে? আমার সঙ্গে দেখা হবে?
হ্যাঁ, দেখা তো হবেই। ওরাও তোমার সঙ্গে কথা বলার জন্য আগ্রহী হবে।
পরক্ষণে ও চুপ করে যায়। ঝিম মেরে বসে থাকে।
কী হয়েছে, মাহমুদা?
মায়ের কথা মনে হচ্ছে।
মায়ের সঙ্গে দেখা করতে চাইলে আমি তোমার সঙ্গে যাব।
না, আমি মায়ের দুঃখ বাড়াতে চাই না। ওই পরিবারে আমি আর ঢুকতে চাই না। বাবা যখন আমাকে বিয়ে দিয়েছিলেন, তখন আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, আব্বা, ওদের সম্পর্কে ভালো করে খোঁজ নিয়েছেন তো? আব্বা বলেছিলেন, ওরা নামী লোক,। মগবাজারে বড় বাড়ি আছে, অনেক সম্পদের মালিক। তুই সুখে থাকবি।
আমি বাবাকে বলেছিলাম, আব্বা, টাকাপয়সা থাকলে সুখ হয়? বাবা আমাকে বললেন, মাগো, তর্ক দিয়েও সুখ হয় না। আমি বললাম, আব্বা, আপনি তো ছেলেটির কথা কিছুই জানেন না। বাবা বললেন, দরকার নেই, মা। তোমাকে তোমার সুখ…। আমি হাসতে হাসতে বলেছিলাম, আল্লাহ আপনাকে সুখে রেখেছে, আব্বা। সে জন্য আপনি সুখের উল্টা পিঠটা কেমন, তা বুঝতে পারেন না।
