আলতাফ ওর পাশে বসে বলে, আপা, আপনি কিছু চিন্তা করবেন না। আমি স্যারের কাছে যাচ্ছি। স্যার আপনাকে ঠিকই হাসপাতালে নিয়ে যাবে। আপনি যতক্ষণ পারেন এখানেই থাকেন।
মাহমুদা ঘাড় কাত করে দেখতে পায়, আলতাফ দৌড়াচ্ছে। ওর পায়ের সবটুকু জোর দিয়ে ও রাস্তা পার হওয়ার চেষ্টা করছে। গভীর প্রশান্তি মাহমুদাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। ও উঠে বসার চেষ্টা করে, কিন্তু পারে না।
বাড়ির গেটে পৌঁছে যায় আলতাফ।
কলিংবেল চাপতেই গেট খোলেন আকমল হোসেন। তিনি ভোররাত থেকেই নিজের টেবিলে বসে কাজ করছিলেন। ঘুম ভেঙে যাওয়ার পর আর বিছানায় যেতে পারেননি।
আকমল হোসেনকে বারান্দায় দেখে আলতাফ উৎকণ্ঠিত স্বরে চেঁচিয়ে ওঠে, স্যার, স্যার!
আস্তে আলতাফ। বুঝেছি, কিছু একটা ঘটেছে, কিন্তু চেঁচিয়ো না। আশপাশের বাসার লোকেরা জেগে যাবে।
গেটের ভেতরে ঢুকে হাঁফ ছাড়ে ও। ততক্ষণে আয়শাও বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে। আলতাফ হাতের ব্যাগ বারান্দায় রাখতে রাখতে বলে, স্যার, রাস্তার ধারে একজন আপা পড়ে আছে। পাকিস্তানি আর্মি তাকে শেষ করেছে। উঠে দাঁড়াতেও পারে না। একটা কিছু করা দরকার, স্যার। হাসপাতালে নিতে হবে।
আয়শা খাতুন বলেন, গাড়ি বের করো। আমরা তাকে উঠিয়ে নিয়ে আসব।
হ্যাঁ, আমারও তা-ই মত। গ্যারেজ খোলো, আমি চাবি নিয়ে আসছি। তুমি আমার সঙ্গে যাবে, আশা।
হ্যাঁ, আমি তো যাবই। মেরিনা ঘুমাচ্ছে, ঘুমাক।
কতটুকু সময় মাত্র। তিনজন মানুষ গাড়িতে ওঠে। মন্টুর মা গেট বন্ধ করে।
কতটুকু সময় মাত্র। গাড়ি এসে দাঁড়ায় মাহমুদার পাশে। সবাই মিলে ওকে ধরে গাড়িতে ওঠায়। পেছনের সিটে আয়শা খাতুন ওকে দুহাত দিয়ে চেপে ধরে রাখেন। মাহমুদার মাথা নিজের ঘাড়ের ওপর রাখেন।
মাহমুদা মৃদুস্বরে বলে, আমি কোথায় যাচ্ছি?
আপনি কিছু ভাববেন না। আমরা আপনাকে ঠিক জায়গায় নিয়ে যাচ্ছি। আপনি শান্ত থাকেন।
শান্ত থাকা কী? মাহমুদা অস্ফুট স্বরে কথা বললে আয়শা তাকে গভীরভাবে জড়িয়ে ধরেন।
অল্পক্ষণ সময় মাত্র।
সূর্য এখনো ঠিকমতো ওঠেনি। দিনের প্রথম আলো ছড়িয়েছে মাত্র। তারা পৌঁছে যায় বাড়িতে।
গেষ্ট-রুমের বিছানায় শুইয়ে দিলে মেরিনা এসে দরজায় দাঁড়ায়।
কী হয়েছে, মা? তোমরা কোথায় গিয়েছিলে? আমাকে ডাকোনি কেন?
এখন প্রশ্ন না। ওকে দেখো। মন্টুর মাকে ডেকে ওকে বাথরুমে নাও। আমার আলমারি থেকে শাড়ি-কাপড় বের করে আনো। আমি ডাক্তারের ব্যবস্থা করছি।
কতটুকু সময় মাত্র।
আয়শা খাতুন ফোন করেন ড. রওশন আরাকে।
এক্ষুনি আসতে হবে। রেডি হন। আমি আসছি।
আকমল হোসেন তো তৈরিই ছিলেন।
ঢাকার রাস্তায় গাড়ি ছুটে যায়।
দিন বাড়ছে। রাস্তায় রিকশা-গাড়ি নেমেছে। লোক চলাচল শুরু হয়েছে। তার পরও গাড়ি চালাতে অসুবিধা হচ্ছে না আকমল হোসেনের। অল্পক্ষণে পৌঁছে যান ডাক্তারের বাসায়। তিনি তৈরি ছিলেন। ডাক্তারি ব্যাগ নিয়ে গাড়িতে ওঠেন। আয়শা খাতুনের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা জিজ্ঞেস করার চেষ্টা করেন। আয়শা খাতুন ঘাড় কাত করে বলেন, একটা কিছু ঘটেছে। এখন না। পরে বলব। বাড়িতে চলেন আগে।
কতটুকু সময় মাত্র।
গাড়ি পৌঁছে যায় হাটখোলার বাড়িতে। মেরিনা আর মন্টুর মা মাহমুদাকে পরিচর্যা করেছে। গোসল করিয়েছে। আয়শা খাতুনের আলমারি থেকে সুতির শাড়ি-পেটিকোট-ব্লাউজ এনে পরিয়েছে। মাথা আঁচড়ে দিয়েছে। মুখে হাতে লোশন লাগিয়েছে। আর দুজনেই বারবার ওর দিকে তাকিয়ে থেকেছে। মনে মনে বলেছে, এত সুন্দর! তারপর পানি খাইয়েছে। জুসও। এখন একটু স্বস্তিতে আছে ও।
ডাক্তার দেখলেন। প্রয়োজনীয় ওষুধ আনতে গেলেন আকমল হোসেন। সবকিছু মিলিয়ে যা ঘটল, তা দেখে মাহমুদা ভাবল, তার যুদ্ধের একটা পর্ব দেখা হলো। এই মানুষদের দেখা না হলে ওকে প্রবল দুঃখ নিয়ে মরে যেতে হতো। এখন ওর কোনো দুঃখ নেই। মৃত্যুবরণ খুব সহজ কাজ বলে মনে হয় ওর।
কতটুকু সময় মাত্র।
ওর জন্য ওষুধ এসে যায়। ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ওকে ওষুধ দেওয়া হয়। ওকে ওষুধও খাওয়ানো হয়। ঘুমের ওষুধ দেওয়া হয়। ওর বিছানার চারপাশে বসে থাকে সবাই। ওর কোনো কিছু না আবার ঘটে যায়, এমন আশঙ্কায় সবাই উদ্বিগ্ন।
ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে যাওয়ার আগে ও খুব দ্রুত ওকে নিয়ে ঘটে যাওয়া ঘটনার কথা বলে। শান্তি কমিটির কেন্দ্রীয় সদস্য রফিকুল ইসলামকে চিনতে পারেন আকমল হোসেন। মগবাজারে তার বাড়ি, কোথায় তা-ও জানেন। বিভিন্ন সভায় তাঁকে দেখেছেন।
ও ঘুমিয়ে পড়ার আগে বলে, আপনি আমাকে বোমা দেবেন। আমি ওই বাড়িতে বোমা ফাটাতে চাই। আমার শেষ যুদ্ধে আমি জিততে চাই।
সবাই ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। মাহমুদা বালিশে ঘাড় কাত করে। আয়শা ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করেন, হাসপাতালে ভর্তি করার দরকার আছে?
আমার মনে হয় দরকার নেই। ওষুধ ঠিকমতো খেলে ঠিক হয়ে যাবে। তা ছাড়া ও যেভাবে কথা বলেছে তাতে মনে হয়েছে, ওর মানসিক জোর আছে। ট্রমা আক্রান্ত না হয়, এদিকে খেয়াল রাখতে হবে। মেরিনা যেন ওর বন্ধু হয়ে যায়।
আকমল হোসেন বলেন, ওকে হাসপাতালে নিতে হচ্ছে না, এটাই আমাদের ভরসা। হাসপাতাল আমাদের জন্য বিপজ্জনক হবে। ওকে আমরা কেন রাস্তা থেকে উঠিয়ে ঘরে এনেছি—এটি একটি প্রধান ইস্যু হবে। হাসপাতালের লোকজনের কৌতূহলের কারণ হবে ও। ডাক্তারদের মধ্যে কেউ রাজাকার থাকলে ওরাই খবর ফাঁস করে দেবে।
