তৃতীয় দিনে পাঁচজন কর্নেল-মেজরের জন্য ডিনারের আয়োজন হয়। শাশুড়ি চুপচাপ ধরনের মানুষ। ওর ব্যাপারে মাথা ঘামায় না। ওর ওপর কর্তৃত্বও ফলায় না। বিয়ের পরদিনই বলেছিল, এই বাড়িতে তুমি মেয়ের মতো থাকবে। ছেলেটা বড্ড মেজাজি, বুঝেসুঝে চলবে। কোনো কিছুর দরকার হলে আমাকে বলবে।
ও তো কোনো কিছু অকারণে চাওয়ার মেয়ে নয়। শাশুড়ি প্রয়োজনীয় জিনিস নিজের থেকেই অনবরত দিয়েছে। ও বাইরে কোথায় যাবে, সে ব্যাপারেও নাক গলায়নি। এমনকি জানতেও চায়নি। মাহমুদার মনে হয়েছে, এত উদাসীন মানুষ ওর বাইশ বছরের জীবনে দেখা হয়নি।
ডিনারের দিন ও সেনা অফিসারদের সামনে যাবে না বললে শফিকুল বলেছিল, বাড়াবাড়ি করবে না। সামনে না গেলে ওই চারজন অফিসারের সঙ্গে
এই ঘরে ঢুকিয়ে দেব। বুঝবে ঠেলা।
কী বললে? মাহমুদা অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে স্বামীর দিকে তাকিয়ে ছিল।
আমি যা বলি, তা করি। পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষা করা আমাদের জন্য ফরজ।
যদি দেশ স্বাধীন হয়?
চুপ, হারামজাদি। স্বাধীনতার কথা মুখে আনবি না। এই বাড়ির ভাত খেয়ে স্বাধীনতার কথা…
আমি এখনই চলে যাব। ঠিকই বলেছ। যার ভাগ্যে জুয়াড়ি স্বামী জোটে, তার আবার স্বাধীনতা কী!
এরপর শুরু হয় দুজনের মারামারি। মাহমুদা নিজের সব শক্তি প্রয়োগ করে মারতে ছাড়ে না শফিকুলকে। নখের খামচিতে দাগ পড়ে গালে। একসময় দুজনে আপন ইচ্ছায় থামে। দুজনে দুজনের দিকে তাকিয়ে ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে ফেঁসে।
সন্ধ্যার আগে শাশুড়ি ওকে ডেকে পাঠান তার ঘরে। মাহমুদা কাছে গেলে বলে, তুমি রেডি হও, বউমা। আমি চাই না এই বাড়িতে আর্মি অফিসাররা তোমার ঘরে ঢুকুক। আমার ছেলে এমন কাণ্ড করতে পারে।
তারপর নিজেই ওকে কাপড় বের করে দেন। গয়না দেন। কসমেটিকসও। মাহমুদা সেগুলো নিয়ে নিজের ঘরে আসে! মেহমান আসার আগে পর্যন্ত অনেকক্ষণ সময় নিয়ে সাজে। মনে মনে ভাবে, আজই এ বাড়িতে শেষ দিন। কাল সকালে বাসে উঠে রাজশাহী যাবে। ছোট খালার কাছে। তারপর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। লোক পেলে ইন্ডিয়ায় শরণার্থী হবে।
মেহমান বাড়িতে আসার আগে শফিকুল ওর দিকে তাকিয়ে শিস দেয়।
ভেরি গুড, দারুণ সেজেছ। লাইক এ হোর।
হোর? মাহমুদার শরীরে আগুন জ্বলে ওঠে।
শফিকুল বাঁকা চোখে তাকিয়ে বলেছিল, তাই তো বলেছি। হোর মানে বোঝো না? বেশ্যা। বেশ্যা। ও তখন দাঁত কিড়মিড় করে বলেছিল, বাস্টার্ড।
শফিকুল কথা না বাড়িয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। এই মুহূর্তে নিজেকে সংযত রাখা ওর স্বার্থ। মেজর-কর্নেল আসার আগে মাহমুদার সাজগোজ নষ্ট করতে চায় না। পরিস্থিতি নষ্ট করা চলবে না।
মাহমুদা মাথা চেপে ধরে বসে থাকে। ও তো জানে, লোকটা জাতে মাতাল তালে ঠিক। পরিবার নিয়ে আর ভাবতে চায় না। বাড়ির লোকজন বলাবলি করত, শান্তি কমিটির লোকেরা মেয়েদের আর্মি ক্যাম্পে পাঠায়।
নিজের জীবন দিয়ে এমন নির্মম অভিজ্ঞতা হবে—এটা ওর স্বপ্নেরও অতীত।
রাবেয়া এসে ডাকে, আপা।
বলো, রাবেয়া।
আপনাকে বোধ হয় অন্য কোথাও নিয়ে যাবে।
কোথায়?
সেটা আমি জানি না। ক্যানটিনের লোকটা বলেছে, কাল থেকে এ ঘরে আর খাবার আসবে না।
আমি তো উঠে দাঁড়াতেও পারছি না। আমি অন্য জায়গায় যাব কী করে।
আপনার শরীর থেঁতিয়ে গেছে। ওরা আর আপনার কাছে আসবে না। আজই বোধ হয় শেষ রাত।
মাহমুদা কথা বলে না। ওর মাথা কাজ করছে না। ওর নিমীলিত চোখের পাতায় সন্ধ্যা ঘনায়। ও বুঝতে পারছে, ওর চেতনা লোপ পাচ্ছে। ও ড়ুবে যেতে থাকে। ওর আর কিছুই মনে থাকে না।
যখন ওর জ্ঞান ফেরে, ও দেখতে পায় রাস্তার ধারে পড়ে আছে। কত রাত ও জানে না। নাকি সকাল হব-হব করছে? ও চোখ ববাজে। ঘাসের ওপর পড়ে থাকার কারণে কেমন অস্বস্তি লাগছে। ঘাস-গুল্মের খোঁচা লাগছে। জ্ঞান না ফিরলেই হয়তো ভালো ছিল। ও উঠে বসার চেষ্টা করেও পারে না। রাস্তায় গাড়ি নেই। মানুষ নেই। মাহমুদার মনে হয়, ও এখন সচেতনভাবে নিজের অবস্থা বুঝতে পারছে। শুধু বুঝতে পারছে না কোথায় ওরা ওকে ফেলে রেখে গেছে। ওদের চাহিদা পূরণের সাধ্য ওর ছিল না। তাই ফেলে দেওয়া। শহরের একজন নামী লোকের পুত্রবধূ বলে এটুকু খাতির ওকে করেছে।
শুধু কি নামী লোক? সে তো ওদের পা-চাটা কুকুর। নিজের স্বার্থ ছাড়া আর কিছু বোঝে না।
চোখ খুলে রাখতে অসুবিধা হচ্ছে। আলো ফুটছে একটু একটু করে। এখন ও কোথায় যাবে? ওঠার চেষ্টা করে। পারে না। মাথা কাত হয়ে যায়। মাথা সোজা রাখা কঠিন। ও আবার চোখ বোজে।
ভোররাতেই লঞ্চ এসে পৌঁছেছে সদরঘাটে। নিজের ছোট ব্যাগটি নিয়ে লঞ্চ থেকে নেমে আর কোথাও দাঁড়ায় না আলতাফ। লঞ্চে সারা রাত ঘুমোতে পারেনি। লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে আসতে হয়েছে সেই আগুনমুখা নদীর পারের গ্রাম থেকে। এত সকালে রিকশা বের হয়নি রাস্তায়। ও হেঁটেই বাড়ি যাবে বলে ঠিক করে।
কতক্ষণ হেঁটেছে জানে না। ফুরফুরে বাতাসে হাঁটতে ওর ভালোই লাগছে। নিজের ভেতরে সতেজ ভাব অনুভব করছে। দূর থেকেই একজন নারীকে দেখতে পায় ও। রাস্তার ধারে পড়ে আছে। একবার হাত নাড়িয়েছে। আলতাফ দৌড়ে কাছে যায়।
আপা, আপা, কী হয়েছে আপনার?
পাকিস্তানি সেনারা আমাকে এখানে ফেলে রেখে গেছে।
হায় আল্লাহ, এখন আমি কী করব! হায় আল্লাহ, আপনাকে তো হাসপাতালে নিতে হবে। রিকশাও তো নেই।
মাহমুদা চোখ বুজে ওর কথা শোনে। বুঝতে পারে, লোকটি দালাল নয়। রাজাকারও না। বুকের গভীর থেকে ওর স্বস্তির নিঃশ্বাস আসে। মৃত্যুর আগে একজন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কাউকে দেখা হলো। এত দিন যে বাড়িতে ছিল, সেখানে এসব কথা শোনা যেত না। সেটি ছিল পাকিস্তানের পক্ষের পরিবেশ। যখন-তখন কারণে-অকারণে মুক্তিযোদ্ধাদের গাল দিয়েছে তারা। ওদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেবে, এমন আলোচনাই হতো সারাক্ষণ। আজকের সকাল আমার জন্য পুণ্যের সকাল আর মৃত্যুর জন্য শান্তির মৃত্যু। আমি খুশি। আল্লাহ মেহেরবান।
