কিছুই করব না, রাবেয়া।
আপনাকে পরিষ্কার করে রাখতে না পারলে ওরা আমাকে চাবুক দিয়ে পেটাবে।
পেটাক। মনে রাখবে, চাবুকের প্রতিটি বাড়ি স্বাধীনতার জন্য। আমি প্রতিশোধ নেব, রাবেয়া।
কীভাবে?
শান্তি কমিটির ওই দালালের বাড়িতে গিয়ে বোমা মেরে ওড়াব রফিকুল আর শফিকুল ইসলামকে।
আপনিও তো মারা যাবেন।
যাব। স্বাধীনতার জন্য শরীর দিয়েছি। এর পরে জীবন দেব। এরা যদি আমাকে এখান থেকে বের হতে না দেয়, তাহলে তুমি আমাকে পালাতে সাহায্য করবে, রাবেয়া। পারবে না?
মনে হয় পারব। আমার একটি শাড়ি পরিয়ে আপনাকে সুইপারের বেশে পার করে দেব।
কিন্তু ওরা তো সারাক্ষণ তালা লাগিয়ে রাখছে।
পালাতে হবে দিনের বেলা। যখন খাবার দিতে আসে, তখন ক্যানটিন বয়ের সঙ্গে সলাপরামর্শ করব।
মাহমুদা বাথরুমের দরজা বন্ধ করে। মনে হয়, যৌবনের সব শক্তি শরীরে ফিরে এসেছে। ওরা কিছুই নষ্ট করতে পারেনি। এখন প্রতিরোধের সময়। গ্রেনেড চাই, বোমা চাই। ও শরীর ভেজায়। শরীরের শক্তিকে আবাহন জানায়। এবং গুনগুন করে—মোরা ঝঞ্ঝার মতো উদ্দাম…।
দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে গুনগুন ধ্বনি শুনে স্বস্তি বোধ করে রাবেয়া। ওর মনে হয়, ওর আর দুঃখ নেই। ব্যারাকের অন্য জায়গার মেয়েরা যেমন ওর শক্তি বাড়িয়েছে, বড়লোকের বাড়ির বউ ওকে সেই শক্তি দিচ্ছে। দরজার তালা খোলার শব্দ শুনে ও দরজার দিকে এগিয়ে যায়। ক্যানটিন বয় ট্রে ফেরত নিতে এসেছে।
ট্রে-থালাবাটি ফেরত দাও, খালা।
খায়নি তো কিছু।
কেন? খিদে নেই?
এত নির্যাতনের পরে কি খাওয়া মুখে ওঠে?
হিহি করে হাসে ক্যানটিন বয়।
না খেলে বলো পাবে কোথায় থেকে? রাতে আবার শুতে হবে না।
আবার হিহি করে হাসে ও।
খেতে বলো, খালা। নইলে তুমি খাবার মুখে তুলে দাও। না খেলে তোমার আমার দুজনের কারও রেহাই থাকবে না।
তুই যা এখন। এখানে দাঁড়িয়ে হিহি করে হাসতে হবে না। শয়তান একটা।
তুমি কেমন করে বুঝবে যে এটা দুঃখের হাসি! অনেক দুঃখেও মানুষের হাসি আসে। আমি এখন আর আসব না। একবারে দুপুরের ভাত নিয়ে আসব। যাই।
বারান্দার শেষ মাথায় গিয়ে আবার ফিরে আসে। দেখতে পায়, রাবেয়া তখনো দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। ও এক দৌড় দিয়ে কাছে আসে। বলে, এ মাসের বেতন পেলে এখান থেকে চলে যাব।
কোথায় যাবি?
যেদিকে দুই চোখ যায়। গেরামেও যেতে পারি। এখানে আর থাকা সম্ভব না।
রাজাকার হবি না তো?
থু, আমি বেইমান না। আমার বাপ-দাদার ঠিকানা আছে। আমার নদীর নাম আগুনমুখা।
ও আর দাঁড়ায় না। দ্রুত ফিরতে থাকে। সিঁড়ির মাথায় গিয়ে ফিরে দাঁড়ায়। দেখতে পায়, রাবেয়া তখনো দরজা ধরে দাঁড়িয়ে আছে। তখন ওর খেয়াল হয়। চাবি ওর হাতের মুঠোয়। দরজায় তালা দেওয়া হয়নি। দরজার কড়ার সঙ্গে খোলা তালা ঝুলছে। ওকে আবার আসতে দেখে রাবেয়া ঘরে ঢুকে ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে। শুনতে পায় ছেলেটি তালা লাগাচ্ছে। ডিউটি করছে ও।
পাঁচ দিন পার হয়েছে।
প্রতিটি রাত নরক-যন্ত্রণায় পার হচ্ছে। শরীর আর নড়তে চায় না। তবে মানসিক শক্তি সঞ্চয় করেছে মাহমুদা। মনে পড়ে শ্বশুরের সঙ্গে শেষ কথা, তিনি ছাত্র ফেডারেশন আয়োজিত সভায় যাওয়ার জন্য তৈরি হয়েছিলেন। সভার আলোচনার বিষয় ছিল—পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষায় সেনাবাহিনীর ভূমিকা। চায়ের টেবিলে তিনি জোর গলায় সেনাবাহিনীর ভূমিকার প্রশংসা করেন। বলেন, দুষ্কৃতিকারী ও বিভেদ সৃষ্টিকারীদের উৎখাত করার জন্য সামরিক বাহিনীকে ধন্যবাদ জানাতে হবে। ওরা প্রথম রাতে বিড়াল মেরে উচিত শিক্ষা দিয়েছে।
মাহমুদা আঁতকে উঠে বলেছিল, বিড়াল? আব্বা, সেনাবাহিনী তো গণহত্যা ঘটিয়েছে।
কী বললে? তিনি ক্রুদ্ধ চোখে মাহমুদার দিকে তাকিয়েছিলেন।
আব্বা, আব্বা, আপনি তো বাঙালি। আপনি পাঞ্জাবি না।
আমি পাকিস্তানি। আমি মুসলমান। আমি মালাউন না। সেদিন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের বক্তৃতা শুনলে না। তিনি একজন সাচ্চা মুসলমান।
আপনি যাদের দুষ্কৃতিকারী বলেন, তারা মুক্তিযোদ্ধা, আব্বা। দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছে।
খামোশ! স্বাধীনতা!
তারপর ছেলের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, ওকে শাস্তি না দিলে তোকে ত্যাজ্যপুত্র করব। আমার সম্পত্তির কোনো কিছু তোর কপালে নাই।
শফিকুল ওকে এক হেঁচকায় চেয়ার থেকে টেনে তুলে এনে ঘরের দরজা বন্ধ করেছিল। ও কোনো বাধা দেয়নি। যেন শফিকুল জোরজবরদস্তির সুযোগ না পায়, সেটা খেয়াল রেখেছিল। দরজা বন্ধ করলে আঙুল উঁচিয়ে বলেছিল, গায়ে হাত তুলবে না। গায়ে হাত তুললে আমিও তোমাকে ছাড়ব না।
তোমাকে আমি কুকুর দিয়ে খাওয়াব। ভেবেছ কী? বেশি বাড় বেড়েছে তোমার।
তোমাকে কি আমি ছেড়ে দেব? আমি যা বলি, সরাসরি স্পষ্ট কথা বলি। আড়ালে-আবডালে কথা বলা আমার পছন্দ না।
কী করবে, শুনি? কী সাধ্য আছে তোমার? বাপ তো একটা কেরানি। ফুটো পয়সা দিয়েও বিকাবে না।
খবরদার, আমার বাবাকে নিয়ে কথা বলবে না। নিজে তো একটা মাতাল-জুয়াড়ি। আগে একটা বিয়ে করেছিলে। সেই বউয়ের কাছ থেকে লাথি খেয়েছিলে। আমার বাবার কাছে সেই বিয়ের কথা স্বীকার করারও সাহস ছিল না।
চুপ কর, হারামজাদি, টাকা দিয়ে মাগি কিনেছি। তার জন্য কৈফিয়ত দিতে হবে নাকি? আর একটা কথা বললে–
তুই কথা বলবি না, ইবলিস।
ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল শফিকুল। ও কখনো ঠেকিয়েছে। মার খেয়েছে, মার দিয়েছে। মাঝে সময় গেছে দুই দিন। শফিকুল বাড়ি ফেরেনি। কোথায় ছিল, কেউ তা জানতে চায়নি। সবাই জানে ও এমনই। কোনো কলগার্ল পছন্দ হলে তাকে নিয়ে হোটেলে থাকে।
