নারীকণ্ঠে চমকে ওঠে মাহমুদা। এই দোজখে কোথায় থেকে উড়ে এসেছে হুরপরি!
কে? কে আপনি?
আমি রাবেয়া। পুলিশ লাইনের সুইপার। আমাকে পাঠানো হয়েছে আপনাকে দেখাশোনা করার জন্য।
দেখাশোনা! বিড়বিড় করে মাহমুদা। ও আর ওকে কী দেখাশোনা করবে। দেখাশোনা খুব সহজ কথা নয়। এখন থেকে একটি কঠিন কাজের মধ্যে ওর প্রবেশ ঘটল। জয় বাংলা। জয় বাংলা বলার সঙ্গে সঙ্গে মাহমুদার সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্পন্ন হয়।
রাবেয়া মেঝেতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কাপড়গুলো কুড়িয়ে ভাঁজ করে। মাহমুদার পায়ে হাত রেখে বলে, আপা, উঠবেন?
ও উঠে বসে। দুই হাতে চুল সামলায়। লম্বা চুলের গোছা ছড়িয়ে ছিল পিঠের ওপর। রাবেয়া হাঁ করে তাকিয়ে থেকে ভাবে, এত সুন্দর! ওর দৃষ্টি সরে না মাহমুদার মুখের ওপর থেকে। আবারও বলে, এত সুন্দর! পরক্ষণে নিজেকে সামলে নিয়ে কুড়িয়ে তোলা কাপড়গুলো এগিয়ে দিয়ে বলে, পরেন।
আমি তো পরতে পারব না। তুমি আমাকে সাহায্য করো, রাবেয়া।
ক্লান্ত-বিষণ্ণ কণ্ঠস্বরে কোনো জোর নেই। মাহমুদার দৃষ্টি দেখে ঘাবড়ে যায় রাবেয়া। ভাবে, মানুষটি কী মরে যাবে! না, মরতে দেওয়া হবে না। দরকার হলে পায়ে ধরে ডাক্তারকে ডেকে আনবে। ও যখন দেখতে পায় মাহমুদা ঝিম মেরে আছে, তখন ও নিজের চোখের জল মোছে।
আপনাকে কোথায় থেকে ধরল ওরা?
ধরেনি।
মানে? তাহলে–
ওরা আমাকে জোর করে আনেনি। ওদের গাড়িতে আমাকে তুলে দেওয়া হয়েছে।
কে? কে এমন কাজ করল?
আমার শ্বশুর আর স্বামী।
শ্বশুর? স্বামী?
রাবেয়া দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। মেঝেতে বসে পড়ে। মাহমুদার মাথা ঝুঁকে আসে হাঁটুর ওপর। শরীরের ব্যথা যে কোথা থেকে আসছে, নিজেই বুঝতে পারে না। কখনো মনে হয় এখান থেকে, কখনো ওখান থেকে। কখনো মনে হয় সবখান থেকে। সেদিন আর্মির কয়েকজন অফিসারকে দাওয়াত খাইয়েছিল তার শ্বশুর। খাবার সার্ভ করার দায়িত্ব ছিল মাহমুদার। যতক্ষণ ওরা খেয়েছে, ততক্ষণ টেবিলের কাছে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছিল ওকে। শুনেছে ওদের ফিসফিস কথা, বহুত খুব সুরত। বহুত আচ্ছি।
হা-ভাতের মতো খেয়েছিল বিরিয়ানি, মাংসের রেজালা, মুরগির রোস্ট, পুডিং, ফিরনি, আম, লিচু…। তারপর ওরা যাবার সময় ওকে গাড়িতে তুলে দিয়ে বলেছিল, তুমিও ওদের খাদ্য। তোমাকেও ওরা হা-ভাতের মতো খাবে।
আপা।
তুমি কে?
আমি সুইপার রাবেয়া।
বিরক্ত করছ কেন আমাকে? দেখছ না আমি নড়তে পারছি না।
ওরা আমাকে পাঠিয়েছে আপনাকে পরিষ্কার করতে। আজ রাতে আবার আসবে আপনার কাছে। আর আমি যদি পরিষ্কার না করি, তাহলে আমাকে চাবুক মারা হবে।
চাবুক?
ওরা চাবুক হাতে ঘোরে। ওই সব ঘরের মেয়েরা ওদের খামচে-কামড়ে দিলে ওদের চাবুক মারা হয়। লোহার শিকের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয়।
তুমি আমাকে এসব কী বলছ, রাবেয়া? তোমার কথা আমি ঠিকমতো বুঝতে পারছি না।
এখানে তো এসবই হচ্ছে। আমি মিথ্যা কথা বলছি না।
মেয়েরা কি জয় বাংলা স্লোগান দেয়?
কাউকে কাউকে দিতে শুনেছি। তবে বেশির ভাগ দিতে পারে না। ওদেরকে সারাক্ষণ কাঁদতেই দেখি।
আমি এখানে বসে জয় বাংলা স্লোগান দিতে চাই, রাবেয়া।
আমি দরজা বন্ধ করে রেখেছি, আপনি যত খুশি স্লোগান দেন।
জয় বলে চিৎকার করতে গিয়ে মাহমুদা দেখল, শরীরের কোথাও কোনো শক্তি নেই। ধ্বনি দুটো বুকের ভেতরে গোঙানির মতো ঘুরপাক খায়। ও দম ফেলে ভাবে, থাক, জয় বাংলা ওর বুকের ভেতরে থাক।
আপা।
বলো, রাবেয়া।
দরজা খুলি?
খোলো। ওটা বন্ধ করারই বা দরকার কী? যার যার খুশি আসতে দাও।
সেটা তো হবে না, আপা। আপনি তো মাত্র কয়জনের।
ও, তা-ই, তাহলে তুমি তোমার মতো কাজ করো।
রাবেয়া দরজা খোলে। হাট করে খুলে দেয় দুই পাল্লা। এক ঝলক দমকা বাতাস ঢোকে ঘরের ভেতরে।
মাহমুদার জন্য নাশতা পাঠানো হয়েছে। ট্রেতে করে আনা হয়েছে খাবার। রাবেয়া প্রথমে একটু ধাক্কা খায়। ক্যানটিনের ছেলেটি বলে, ওপরের হুকুম। ও চোখের ইশারায় ট্রে দেখায়। ছেলেটি কিছু বলে না। রাবেয়া বুঝে যায় যে কোনো বড় ঘরের কেউ হবে। সে জন্য এই যত্ন। তা ছাড়া এই চালান ওপরের বসের জন্য, যত্ন তো একটু করতেই হবে।
রাবেয়া ট্রে নিয়ে দরজা বন্ধ করে। টেবিলের ওপর ট্রে রেখে নাশতার প্লেট নামায়। লুচি, ভাজি, ডিম, কলা দেওয়া হয়েছে। সঙ্গে ছোট ফ্লাস্কে চা।
আপা, খান। ওঠেন। এমন নাশতা এখানকার কাউকে দেওয়া হয়নি।
আমার শ্বশুর যে একজন নামী মানুষ। সে জন্য দিয়েছে। এটা আমার শ্বশুরকে দেওয়া হয়েছে। আমাকে না।
আপনার শ্বশুর অনেক বড়লোক?
হ্যাঁ, বড়লোকও। চারদিকে তার টাকাপয়সার ছড়াছড়ি।
এত নামী মানুষের এমন ভীমরতি কেন, আপা?
আরও দাম ওঠানোর জন্য। আরও টাকার জন্য।
আপনাকে ঘরে নেবে?
ঘরে রাখলে কি আর বের করে দেয়।
আপনার বাবা কেমন মানুষ গো?
তুমি আমাকে একটু বাথরুমে নিয়ে যাও, রাবেয়া। আমার ভীষণ বমি পাচ্ছে।
আপনি তো কিছু খাননি।
রাতে আমি বিরিয়ানি-রোস্ট খেয়েছি না। শ্বশুরবাড়ির শেষ খাবার আমি পেট পুরে খেয়েছি, রাবেয়া।
মাহমুদা রাবেয়াকে ধরে পা টানতে টানতে বাথরুমে যায়। ওয়াক করার পরও বমি আসে না। আসে কান্না। মাহমুদা বুকভাঙা কান্নায় চিৎকার করে কাঁদতে থাকে।
বাথরুমের দরজায় পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকে রাবেয়া। বুঝতে পারে, নড়ার শক্তি ও হারিয়েছে। কিছুক্ষণ পর কান্নার রেশ কমে এলে রাবেয়া পাশে গিয়ে বসে।
আপা, মুখ-হাত ধোন। গোসল করবেন?
