কী ভয়াবহ ক্রুর ছিল শফিকুলের কণ্ঠস্বর। ওর শারীরিক সৌন্দর্যের জন্য ওকে বিয়ে করেছিল লোকটি। মানসিক-মানবিক সম্পর্ক তৈরি হয়নি লোকটির সঙ্গে। মাহমুদা থু করে স্বামীর মুখের ওপর থুতু দিলে শফিকুল ওর গলা চেপে ধরেছিল। ওর গোঁ গোঁ ধ্বনি তীব্র হয়ে উঠলে হাত ছেড়ে দেয়। অনেকক্ষণ পড়ে ছিল বিছানার ওপর। উঠে দাঁড়াতে পারছিল না। অতিথিদের মনোরঞ্জনের জন্য ভারী গয়না পরতে হয়েছিল শাশুড়ির নির্দেশে। সবকিছুর বোঝা বইবার সামর্থ্য হারিয়ে কতক্ষণ পড়ে ছিল, তা বুঝতে পারেনি মাহমুদা। এখনো ঘোরের মতো লাগছে সবকিছু। সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে আছে একজন। সামরিক পোশাকে নয়। ক্যাজুয়াল ড্রেস। পায়জামা-কুর্তা পরে আছে। পুরু ঘন মোছের আড়ালে ক্রুর হাসি ঝলকায়। ও কাছাকাছি যেতেই হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলে, আইয়ে।
মাহমুদা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকে। লোকটি যে শব্দ উচ্চারণ করেছে, তা ভৌতিক ধ্বনির মতো ওর চারপাশ অন্ধকার করে দেয়। ওর মনে হয়, ও কিছুই দেখতে পাচ্ছে না।
আইয়ে।
অফিসার হাত বাড়িয়েই রাখে। মাহমুদা হাত বাড়ায় না। শক্ত হয়ে যায়। এই জীবনে কেয়ামতের এমন প্রত্যক্ষদর্শী হতে হবে, ও তা স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি। তা-ও আবার তার মাধ্যমে, যে তার বাবাকে বলেছিল, আপনার মেয়েটিকে আমাদের পরিবারে নিতে চাই। ও আমার পুত্রবধূ হবে। বছর দেড়েক আগে ও এই পরিবারের পুত্রবধূ হয়েছিল। বিত্তশালী পরিবার। মগবাজারে অনেক বড় একটি বাড়ির মালিক। কোনো কিছুর অভাব নেই। ও ঘর পেয়েছিল, কিন্তু স্বামী পায়নি। মাতাল, জুয়াড়ি একটি লোক। আগে একটি বিয়ে করেছিল। বউ তাকে ছেড়ে চলে গেছে। এই তথ্য তাদের গোপন করা হয়েছিল, নাকি ওর বাবা বিষয়টি জানত, সেটা ও অভিমানে জিজ্ঞেস করেনি। মাঝেমধ্যে অভিমান তীব্র হলে ভেবেছে, ঘরে সত্য বলে বাবা ওর দায় এড়িয়েছে এমন একটি জুয়াড়ি লোকের কাছে বিয়ে দিয়ে। পরবর্তী সময়ে মেয়ের তেমন খোঁজখবর করেনি। এমনকি কতটুকু ভালো আছে, এটাও জিজ্ঞেস করেনি। মাহমুদা একা একা দহন করেছে নিজেকে।
সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে থাকা লোকটি হুংকার দিয়ে ওঠে। হুংকারের বীভৎস শব্দে আচমকা চমকে ওঠে ও। এমন সম্মুখ বজ্রপাত ওর জীবনে আর কখনো ঘটেনি। একমুহূর্ত সময় নষ্ট না করে লোকটি ওকে হেঁচকা টান দেয়। তারপর বারান্দার ওপর উঠিয়ে নিয়ে যায়। মাহমুদা ধাক্কা সামলানোর আকস্মিকতায় লোকটির হাত চেপে ধরে। পড়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করে নিজেকে।
লোকটি ওকে একরকম টানতে টানতে ঘরে নিয়ে ঢাকায়। তারপর দরজা বন্ধ হয়ে যায়। মাহমুদা চোখ বুজে নিজেকে সামলায়। দাঁত কিড়মিড় করে। একটি লাথি মারার প্রবল বাসনায় নিজেকে তৈরি করতে চায়। কিন্তু পারে না। লোকটি ওকে বিছানায় ফেলে দিলে ও চেঁচিয়ে বলে, শুয়োরের বাচ্চাদের পাকিস্তানের অখণ্ডতা। শুয়োরের…বাচ্চাদের…পাকিস্তানের…অখণ্ডতা…এর শোধ…আমি…নেবই-নেবই-নেবই।
লোকটি শক্ত থাবায় ওর মুখ চেপে ধরে।
ভোরের দিকে ওর মনে হয় বিছানা থেকে ওঠার কোনো সাধ্য নেই। আলোর তীব্রতা দেখে বুঝতে পারে, বেলা বেড়েছে। ও হাত বাড়িয়ে শাড়ি নেওয়ার চেষ্টা করে। নাগাল পায় না। তারপর গড়িয়ে খানিকটুকু এগিয়ে শাড়িটা টেনে নিতে পারলে সেটা গায়ের ওপর ছড়িয়ে দেয়। মনে করতে পারছে না যে কয়জন ঢুকেছিল ঘরে। পাঁচজন পর্যন্ত মনে আছে। তারপর জ্ঞান হারিয়েছিল। এখন মাথা ঝিমঝিম করছে। তার পরও স্মৃতিতে প্রথম ভেসে ওঠে শ্বশুরের চেহারা। দাড়ি-টুপিতে একজন পরহেজগার মানুষ। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন। কোরআন শরিফ তেলাওয়াত করেন। বন্ধুবান্ধব অনেক। ব্যবসার হিসাব-নিকাশ নাই। বাতাসে টাকা ওড়ে। প্রথম দেখায় তাঁকে একজন পরহেজগার মানুষ বলে মনে হবে, কিন্তু ন্যায়ের পক্ষে কাণ্ডজ্ঞানহীন মানুষটি নিজের ছেলের বউকে ব্যবহার করতে পিছপা হলেন না।
মাহমুদা চেতনে-অবচেতনে বিড়বিড় করে, আপনি রফিকুল ইসলাম। শান্তি কমিটির কেন্দ্রীয় সদস্য। অখণ্ড পাকিস্তানের জন্য জীবনপাত করে ফেলছেন অসহযোগ আন্দোলনের সময় থেকে। নিজের ছেলের বউকে ওদের হাতে তুলে দিয়েছেন। ওরা যখন আমাকে গাড়িতে ওঠায়, তখন আপনি ওদের বলেছেন, তোমরা খুশি থাকো। তোমাদের যা দরকার, তা আমরা সাপ্লাই দেব। তোমরা পাকিস্তানকে হেফাজত করো।
আমার অপরাধ ছিল, আমি আপনাদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে থাকার জন্য বলেছিলাম।
আমার অপরাধ আমি গেরিলাযোদ্ধাদের সহযোগিতা করার কথা বলেছি।
মার অপরাধ আমি দেশের স্বাধীনতা চাই।
আমার অপরাধ আমি আমার ঘরে বাংলাদেশের পতাকা রেখেছি।
আমার অপরাধ আমি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র শুনতাম।
আমার অপরাধ আমি আপনাদের না বলে সাতই মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনতে গিয়েছিলাম।
মাহমুদা নিজের অপরাধের খতিয়ান করে বড় শ্বাস টানে। তখন শুনতে পায় দরজার তালা খোলার শব্দ। আবার চোখ বোজে মাহমুদা। যে আসে আসুক। আর কোনো পরোয়া নাই। আমার অপরাধ একটি ভুল ঘরের তালা খুলে আমাকে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আমি তালা খুলে বের হতে পারিনি। এই কঠিন কাজটি করা আমার সাধ্যের বাইরে ছিল।
এখন কেউ তালা খুলে ঘরে ঢুকছে। ও পায়ের শব্দ পায়। চোখ খোলে। কেউ একজন কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। মনে হয় ওকে দেখেছে-প্রবল কৌতূহলে কিংবা বিতৃষ্ণায়। মুহূর্ত সময় মাত্র। ভেসে আসে কণ্ঠস্বর, আপা।
