পরদিন চান কুটির ভাড়া করতে এসে পুরো এলাকা দেখে নেন আকমল হোসেন। দেখেশুনে খুশি হন। হাইডের জন্য বাড়িটি চমৎকার। একদম সেনাদের নাকের ডগায়, কিন্তু আপাত সরলভাবে নিরাপদ। প্রাঙ্গণজুড়ে আছে বেশ বড় বড় গাছ। এর মধ্যে ডালপালা মেলে দেওয়া পেয়ারাগাছ আছে সবচেয়ে বেশি।
বাড়িতে ছিল একটি পরিবার। পরিবারের ছয়জন সদস্য যুদ্ধের সঙ্গে জড়ানোর জন্য উদগ্রীব ছিলেন। আকমল হোসেনের হাত জড়িয়ে ধরে আবদুল জব্বার বললেন, যুদ্ধের সঙ্গে যদি নিজেদের যুক্ত করতে না পারি, তাহলে সারা জীবন অপরাধী হয়ে থাকব। স্বাধীনতা কি সহজ কথা!
আকমল হোসেন তাকে জড়িয়ে ধরেন। তারা বাড়ির চারদিকে হাঁটেন। দেখতে পান, বৃষ্টিতে ঝরা পাতা মাটির সঙ্গে মিশে আছে। তাদের পায়ের চাপে দেবে যায়। শুকনো পাতার খসখস শব্দ হয় না। আচমকা আতঙ্কিত হতে হয় না। নিরাপদ থাকার জন্য সুন্দর বাড়ি বলে মনে হয় তার। আকমল হোসেন বলেন, এসব গাছের গোড়া খুঁড়ে অস্ত্র রাখা যাবে। ছেলেরা সহজেই কাজটি করতে পারবে।
নেহাল বলে, শুধু গাছের গোড়ায় না, গাছের মাথায়ও অস্ত্র বেঁধে রাখব। এই ঘন ডালপালা আমাদের সহায়ক শক্তি। নিচে দাঁড়িয়ে চট করে বোঝা কঠিন যে ওখানে অস্ত্র আছে।
আকমল হোসেন হেসে বলেন, এই যুদ্ধে বৃষ্টি আমাদের সহায়তা দিচ্ছে। এখন দেখি গাছও দিচ্ছে। রাস্তার অপর পারে ধানখেত আছে। বর্ষায় এলাকাটা পানিতে ড়ুবে থাকে। আমাদের যোদ্ধাদের পক্ষেও এসব থাকবে। প্রকৃতি আমাদের সহায়ক যোদ্ধা। পাকিস্তানি সেনারা এসবের ভালো দিক বুঝবে না। ওরা ঘাবড়াবে। বর্ষা দেখে, ঘন গাছের মাথা দেখে, ধানখেত দেখে ওরা ভয়ে কুঁকড়ে থাকবে।
সবাই মিলে চারদিকে তাকায়। সবাই মিলে অপারেশনের পরিকল্পনায় অংশীদার হয়। শুধু তারা একটি কথাই ভাবতে পারে না যে এই বাড়ির প্রাঙ্গণে শহীদদের কবর হবে।
বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় আকমল হোসেনের মনে হলো, স্যান্ডেলে কোনো লতা জড়িয়ে গেছে। কোথাও কেউ তাকে বলছে, দাঁড়াও। আমাকে রেখে তুমি চলে যাচ্ছ কেন? তিনি দাঁড়ালেন। স্যান্ডেল খুললেন। দেখলেন, শুকনো ঘাসের কুচি জমে আছে পায়ের তলায়। স্যান্ডেল ঝেড়ে আবার পা ঢোকালেন। তার পরও স্বস্তি নেই। পায়ের নিচে চুলকাচ্ছে। তিনি স্যান্ডেল খুলে ঘাসে পা মুছলেন। বুঝলেন, ঘাসের গায়ে ভীষণ মমতা। তার পা-জোড়া আদরে ভরে দিয়েছে। তিনি মনে মনে বললেন, বেশ তো করলে। এমন মায়া কেন তোমাদের? আমি তো আবার আসব তোমাদের কাছে। তখন পা-ভরে ভালোবাসা দিয়ো, ঘাসেরা। যাচ্ছি। তোমাদের বিদায় বলব না। তোমরা আমার জন্য অপেক্ষা করবে। আর আমার ছেলেগুলোকে দেখেশুনে রাখবে। আহ, এসব ভাবতে কী যে ভালো লাগে!
এমন জঙ্গলাকীর্ণ একটি বাড়ির ছায়া তাঁকে আচ্ছন্ন করে। বুকের ভেতর কোনো অনুভব খচ করে উঠলেও তিনি স্বস্তি বোধ করেন। কোথাও কোনো বড় আয়োজন তার জন্য বুঝি অপেক্ষা করছে। তিনি সবার দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বললেন, যাই, বাবারা।
আবার আসবেন, চাচা।
হ্যাঁ, আসব। আমাকে তো বারবার আসতেই হবে। এই দুর্গবাড়ি ইতিহাসের বাড়ি হবে না!
গেরিলারা হা হা করে হাসতে পারে না। কেউ ভি দেখায়। কেউ ওপরে লাফ দিয়ে দুম করে নিচে পা ফেলে। কেউ এক পাক ঘোরে। তিনি ওদের আনন্দ দেখে নিজেও খুশি হয়ে ভি দেখান।
গাড়ি ছুটে যায় ফার্মগেট কারওয়ান বাজারের রাস্তায়। অনেক দিন পর তাঁর ভেতরে অফুরান শক্তির জোয়ার অনুভব করেন। স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে আকাশ দেখেন। পাশ দিয়ে চলে যায় আর্মির কনভয়।
০৮. রাজারবাগ পুলিশ লাইনে সন্ধ্যা নামেনি
রাজারবাগ পুলিশ লাইনে সন্ধ্যা নামেনি। চারদিকের বাতিগুলো জ্বলে উঠেছে। খুব সুনসান লাগছে এলাকা। মনে হচ্ছে, সেপাইরা সবাই মিলে বড় কোনো অপারেশনে গেছে। চারদিক সুনসান হয়ে আছে। আর্মির জিপ ব্যারাকের সামনে এসে দাঁড়ালে মাহমুদা শরীরের ভেতরে শৈত্যপ্রবাহ অনুভব করে। ও বুঝতে পারে, যারা ওকে এখানে পাঠিয়েছে, তাদের সম্মানের দিকে তাকিয়ে ওরা এই পর্যন্ত ওর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেনি। কিন্তু তার মানে এই নয় যে ওরা খারাপ ব্যবহার করবে না। সবাই তো চক্ষুলজ্জার ধার ধারবে না। তারা ঝাঁপিয়ে পড়বে এবং ছিন্নভিন্ন করবে ওকে।
গাড়ির দরজা খুলে যায়। একঝলক ঠান্ডা বাতাস স্পর্শ করে মাহমুদাকে।
বাঙালি ড্রাইভার নরম স্বরেই বলে, আপা, নামেন। তার পরে ফিসফিসিয়ে বলে, এইটা একটা দোজখখানা। আপনাকে কেন এখানে আনল? আপনার স্বামী-শ্বশুর আপনার এত বড় সর্বনাশ করতে পারল? কেমন মানুষ তারা?
মাহমুদা কথা বলে না। একটু সময় নিয়ে গাড়ি থেকে নামলে পেছন থেকে একজন রাইফেলের নল ঠেকিয়ে বলে, চলিয়ে।
ও মুখ ঘুরিয়ে বলে, কিধার?
ওপর মে।
সেপাই সিঁড়ি দেখিয়ে দেয়। খাড়া সিঁড়ি ভাঙতে কষ্ট হয়।
মাহমুদা একটি একটি করে সিঁড়িতে পা রাখে। এক ধাপ এক ধাপ করে ওঠে। ও জানে, ও কোথায় যাচ্ছে। ও জানে ওর পরিণতি কী। তার পরও নিজেকে শক্ত রাখে। নিজেকেই বলে, পাকিস্তানের অখণ্ডতার সঙ্গে তার শরীর জড়িত। তার শরীরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে তার শ্বশুর শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান। কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাকিস্তানের অখণ্ডতার জন্য নারীর শরীর দরকার হয় বলে মনে করেছে তার শ্বশুরবাড়ির দুজন পুরুষ। পিতার হুকুম পালন করেছে তার স্বামী, শফিকুল ইসলাম। বলেছে, যাও, ওদের খাদ্য হও। দেশের স্বাধীনতার কথা বলো। যাও, স্বাধীনতা কেমন তা বুঝে আসসা! দেখো, স্বাধীনতার স্বাদ কত মধুর! আমরা তোমার স্বাধীনতার স্বপ্নের শোধ ওঠাব।
