আমিও বানাব। মাকে বললে আমাকে উল কিনে দেবেন। মারুফ ভাইয়া সোয়েটার নিয়ে যাবে ক্যাম্পে।
হ্যাঁ, বানাবি। আমরা দুজনে মিলে অনেক বানাব। এটাও একটা বড় কাজ।
উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল নুসরাতের দৃষ্টি। ও মেরিনাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, আমাদের যুদ্ধে জিততে হবে, মেরিনা। আমরা পরাজিত হব না।
মেরিনা রিকশায় উঠলে বলেছিল, নওশীনের কথা বাড়িতে কাউকে বলিস না। ও আমাদের বাড়ির একটা কুলাঙ্গার। সেদিন ওর দিকে তাকিয়ে মনে হয়েছিল আত্মহত্যা করি।
মেরিনা ওর হাত চেপে ধরে বলেছিল, শান্ত হ। আমাদের আবার দেখা হবে।
এখন মনে হচ্ছে একজনকে শান্ত হতে বলা সহজ। কিন্তু কাজটি কি অত সহজ! ওর নিজেরই তো ঘুম আসছে না। ওকে কথা দিয়েছে বলে বাবামাকেও বলতে পারছে না।
শেষরাতে ঘুম এলে গভীর স্বপ্নে তলিয়ে যায় মেরিনা। স্বপ্ন দেখল, ও আর নুসরাত যুদ্ধক্ষেত্রের মাঝ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। চারদিকে প্রবল গোলাগুলি। ওদের ওপরে বৃষ্টির মতো গুলি পড়ছে। ওরা হেঁটেই যাচ্ছে। হাঁটতে হাঁটতে ওরা যে দ্বীপে পৌঁছায়, সেখানে অজস্র শহীদের সমাধি। কোথাও এক ইঞ্চি জমি খালি নেই।
ও নুসরাতের হাত চেপে ধরে বলে, আমরা কীভাবে এই দ্বীপে হাঁটব। পা রাখার জায়গা নেই।
পেছন থেকে কে যেন এসে হাত ধরে।
ওর হাত ধরে বলে, এসো আমার সঙ্গে।
তুমি কে? তোমাকে কোথায় যেন আমি দেখেছি।
আমার নাম জেবুন্নেসা।
ঘুম ভেঙে যায়। আশ্চর্য হয় মেরিনা। বিড়বিড় করে বলে, জেবুন্নেসা। তোমার শহীদ হওয়ার খবরটি আমি মারুফকে দিতে পারিনি। তোমার চিঠিও না। আমি যদি শহীদ হতাম এবং তোমার হাতে এমন একটি কঠিন দায়িত্ব থাকত, তাহলে তুমি কী করতে, জেবুন্নেসা? আমার আরেকটি গভীর স্বপ্নে তুমি আমাকে এই পরামর্শটি দিয়ে কিন্তু। মনে থাকবে তো, জেবুন্নেসা!
মেরিনা দুই হাতে চোখের পানি মোছে। দেখতে পায়, পর্দার ফাঁকফোকর দিয়ে ভোরের আলো আসছে ঘরে। বোঝা যায়, দিনের প্রথম আলো নয়। রোদ উঠেছে। আলোয় ভেসে যাচ্ছে শহর। মেরিনা আড়িমুড়ি ভাঙে।
পরদিন আলতাফ চলে যায় গ্রামের বাড়িতে। সবাইকে আশ্বস্ত করে বলে, দুই দিন আসা-যাওয়া, দুই দিন বাড়িতে থাকা। চার দিনের বেশি থাকব না, স্যার। পথে যদি কোনো ঝামেলা না হয়, বাড়িতে যদি সবকিছু ঠিক থাকে, তাহলে দেরি হওয়ার কোনো কারণই হবে না। সবার জন্য তালের রসের গুড় নিয়ে আসব। আপনারা বোধ হয় তালের রসের গুড় খাননি।
হেসে ফেলেন আয়শা।
ঠিক বলেছ, আমরা তালের রসের গুড় খাইনি। তবে ভেবে অবাক হচ্ছি, এত কিছুর মধ্যে তোমার একটা কিছু আনার তাগিদ থেকেই গেছে। নাকি আলতাফ?
ও মাথা চুলকে হাসে। বলে, একটা কিছু আনতে তো হবেই। খালি হাতে আসলে আমার মা বেশি রাগ করবে। আমি তো জানি, মা পারলে পিঠে-পুলি বানিয়ে দেবে। বাড়ির অবস্থা কেমন আছে কে জানে।
আকমল হোসেন হাসতে হাসতে বলেন, যুদ্ধ কি ওর আতিথেয়তার জায়গাও বন্ধ করে দেবে, আয়শা! বাঙালির প্রাণের টানই এমন। এটা আমাদের কালচারের অংশ। আমরা এর বাইরে যেতেই পারব না।
বিকেলে আলতাফ চলে যায়।
আলতাফ চলে যাওয়ার পরপরই ক্র্যাক প্লাটুনের ছয়জন সদস্য আসে। আকমল হোসেনের সঙ্গে কথা বলবে ওরা।
নেহাল বলে, ফার্মগেট একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। ওখান থেকে বিভিন্ন অপারেশন চালাতে হবে। এলাকাটি জঙ্গলে প্রায় ভরা। ওখানে আমাদের একটি ঘাঁটি দরকার।
আমাদের কোনো বন্ধুর বাড়ি যদি না থাকে, তাহলে একটি বাড়ি ভাড়া করা যায়। সে জন্য আমাদের খোঁজ নিতে হবে।
আমরা খোঁজ নিয়েছি, আঙ্কেল। আপনাকে নিয়ে যাব। ওই গাছগাছালির মধ্যে গেলে আপনার ভালো লাগবে। যে বাড়িটা পছন্দ করেছি, সেটিও চমৎকার। একতলা বাড়ি। দেয়াল পাকা, ওপরে টিন। মেঝে খুঁড়ে অস্ত্র লুকিয়ে রাখা যাবে।
তাহলে চলল, কাল সকালে গিয়ে দেখে আসি। যার বাড়ি তার সঙ্গে কথা বলব। ভাড়ার টাকা আমি দেব।
যে বাড়িটি আমরা ঠিক করেছি, তার অবস্থানও খুব ভালো, আঙ্কেল। ফার্মগেটের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গা, যেখানে আর্মি নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে, সেখানে আমাদের অপারেশন হতেই হবে। নইলে নিজেরাই নিজেদের কাছে জবাব দিতে পারব না।
আকমল হোসেন হাঁ করে নেহালের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন। ছেলেটি কত দৃঢ়তার সঙ্গে কথা বলছে। পরক্ষণে নিজেকে নিজেই উত্তর দেন, ওরা তো এই সময়ের শ্রেষ্ঠ সন্তান। ওরা তো এমনই হবে। ওদের নিয়ে এভাবে ভাবাই উচিত নয়। ভাবলে, নিজের কাছে নিজেকে ছোট হতে হবে।
নেহাল আবার বলে, তা ছাড়া মুক্তিযোদ্ধা মিলন ভাইয়ের বাড়ি আছে ফার্মগেট এলাকায়। চারদিকের ঘন গাছপালার কারণে বাড়িটা বেশ নিরাপদ। তিনি বলেছেন, দরকার হলে তিনি তার নিজের বাড়িটা দেবেন।
বাহ, বেশ তো। তবে বেশ সাবধানে কাজ করতে হবে। রাজাকারদালালেরা শহরে বাড়ছে। কোনো কিছু ঠিক করার আগে ভালো করে দেখেশুনে নেবে। তোমরা কোন বাড়িতে আগে অবস্থান নেবে, ঠিক করেছ?
যে বাড়িটি ভাড়া করতে চাই, সেটি আগে নিই। মিলন ভাইয়ের বাড়িটি আরও দু-এক মাস পরে নেব।
গুড। তোমরা যা ভালো মনে করবে, সেটাই আমি তোমাদের সিদ্ধান্ত হিসেবে নেব। দ্বিতীয় চিন্তা করার সুযোগ রাখব না। কাল সকালে আমি তোমাদের সঙ্গে ফার্মগেটে যাব।
ছেলেরা খুশি হয়ে মাথা নাড়ে। ওরা জানে, এই পথে ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেরিয়ে আর্মির গাড়ি চলাচল করে। এই পথের উত্তর দিকে তেজগাঁও এয়ারপোর্ট। ফার্মগেট জঙ্গলাকীর্ণ এলাকা হলে কী হবে, গুরুত্ব অনেক। কারণ, এখানকার মিলিটারি চেকপোস্ট অনেক বড়। নানা দিক থেকে জায়গাটির গুরুত্ব বুঝে এর পাহারা জোরদার করা হয়েছে। ক্যান্টনমেন্ট, অপারেশন হেডকোয়ার্টার, এমপি হোস্টেল, সর্বোপরি দ্বিতীয় রাজধানীর সংযোগস্থল মিলিয়ে জায়গাটির যে গুরুত্ব, সেখানে আঘাত করতে পারলে যুদ্ধকৌশলের বড় সাফল্য আসবে। ট্রাফিক আইল্যান্ডের মধ্যে তাঁবু খাঁটিয়ে মিলিটারি, পুলিশ আর তাদের সহযোগীদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। গ্রিন রোডের মুখের বাঁ দিকে তৈরি হচ্ছে একটি সিনেমা হল। এই অর্ধেক নির্মিত দালানের মাথায় লাইট মেশিনগান হাতে পাহারা দেয় সেনাসদস্যরা। ট্রাফিক আইল্যান্ডের ফুটপাতে ও চেকপোস্টের প্রহরীরা রাইফেল ও লাইট মেশিনগান হাতে রাত-দিন পাহারা দেয়।
