খেতে বসলে আলতাফ-প্রসঙ্গ ওঠে।
আয়শা বলেন, আলতাফ কাল বাড়ি যেতে চাচ্ছে। তোমার সঙ্গে নাকি কথা হয়েছে?
হ্যাঁ, হয়েছে। আমি ওকে যেতে দিতে চাই। ওরা বাবা গভীর পারিবারিক সমস্যায় আছে।
ওকে ছেড়ে দিতে আমার মন চায় না। কখন কী খবর হবে কে জানে! তুমি একা একা কতটা সামলাতে পারবে, কে জানে! ও যখন যাওয়ার কথা বলল তখন আমার বুক ধক করে উঠল। বুঝলাম, আমাদের কাছে ও কত বড় একটা ভরসার মানুষ।
ওর ভাই রাজাকার বাহিনীতে যোগ দিয়েছে, আশা। ও ঢাকায় বসে ভাইকে কতটা শাসন করতে পারবে? ওকে আমাদের যেতে দেওয়া উচিত। ঘুরে আসুক বাড়ি থেকে। বাবা-মাকেও দেখে আসুক।
আয়শা চুপ করে থাকেন। মেরিনা বলে, আলতাফ ভাই যে কয়দিন থাকবে, সে কয়দিন আমরা না হয় আরেকজনকে বাড়িতে রাখতে পারি, আব্বা।
আয়শা নিজেই বাধা দিয়ে বলেন, না, এ বাড়িতে চট করে কাউকে আনা যাবে না। কারণ, এটা কোনো সাধারণ বাড়ি নয়। এটা একটা দুর্গবাড়ি।
আকমল হোসেন এক লোকমা ভাত মুখে পুরে বলেন, ঠিক। আমাদের আরও সতর্ক হতে হবে। শান্তি কমিটি পাকিস্তানকে অখণ্ড রাখার জন্য বড় একটা জাল ছড়িয়েছে। ওরা প্রতিটি জেলা-মহকুমা-গ্রাম পর্যন্ত কমিটি গঠন করে নির্যাতনমূলক কাজের প্রচার চালাচ্ছে। কয়দিন আগে সেন্ট্রাল শান্তি কমিটির আহ্বায়ক খাজা খয়েরউদ্দিন প্রেস রিলিজ দিয়েছেন। তারা স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির বিরুদ্ধে জঙ্গিদের উসকানি দিচ্ছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী যা করতে পারবে না, এরা তার দ্বিগুণ করবে। এরা মানুষের ঘরে ঘরে ঢুকবে। সেনাবাহিনীকে পথ দেখাবে।
মেরিনা মাথা চেপে বলে, উহ্, মাগো।
আয়শা মাথা নেড়ে বলেন, তোমার কথার সূত্র ধরে বলতে হয় যে সেনাবাহিনীকে সরাসরি চেনা যাবে। এদের চেনা যাবে না। এরা হলো গুপ্ত ঘাতক।
একদম ঠিক। এদের সব ধরনের লেবাস থাকবে।
অকস্মাৎ সবাই নীরব হয়ে যায়। তিনজনে নিঃশব্দে ভাত খায়। যেভাবে খেলে মানুষের মনের তৃপ্তি হয়, এ খাওয়া সে খাওয়া নয়। এটি রুটিন খাওয়া। কোনো রকমে খাদ্যকে পেটের নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে দেওয়া মাত্র। যে খাদ্য বেঁচে থাকার একটি শর্ত। এই শর্ত না মানলে একটু আগে চলে যাওয়ার কথা যে আয়শা বলেছে, তা-ই ঘটবে।
তিনজনের কেউই রাতে ঠিকমতো ঘুমোতে পারল না।
মেরিনা অনেক রাত পর্যন্ত ঘরে বাতি জ্বালিয়ে রাখল। বই পড়ার চেষ্টা করল। পুরো খাতা আঁকিবুকি-হিজিবিজিতে ভরিয়ে ফেলল। পায়চারি করল। পানি খেল। অস্বস্তি ওকে জাপটে ধরে রাখল।
ও দুদিন ধরে বিভিন্ন বাড়িতে গেরিলা পত্রিকা পৌঁছে দিয়েছে। যুদ্ধের নানা খবর শুনেছে। প্রবাসী সরকারের খবর, চরমপত্র ইত্যাদি সবকিছু আলোচনায় আসে। চরমপত্র প্রচারের প্রশংসা করে সবাই। অবরুদ্ধ শহরে চরমপত্র শোনার অপেক্ষায় থাকে সবাই। কখনো আলোচনা জমে যায়। তখন আর দ্রুত উঠে পড়তে পারে না ও। যুদ্ধের হিসাব-নিকাশে ড়ুবে যায় পরিবারের সবাই। কোথাও দুপুরের ভাত খেতে হয়। যুদ্ধের পরিবেশ সবখানে আছে। কাছের কাউকে পেলে অন্যরা মন খুলে কথা বলে। বাড়িতে যা আছে, তা উজাড় করে। শুধু নুসরাতের বাসায় গিয়ে মন খারাপ করে ফিরল ও। গুম হয়ে থাকল। বাবা-মায়ের সঙ্গেও কথা বলল না। বাবার কথায় মনটা আরও খারাপ হয়ে গেল। ভাবল, যুদ্ধের ফ্রন্ট বাড়ছে। এসব ছদ্মবেশী কাছের মানুষের সঙ্গে প্রতিদিনের দেখা-সাক্ষাৎ কিংবা মাঝেমধ্যে দেখাশোনার জায়গা নষ্ট হলো। নিজের মর্যাদাকে উপেক্ষা করে ওরা নিজের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। কখনো বুঝে, কখনো না বুঝে। কখনো লোভে, কখনো ব্যক্তির স্বার্থপরতায়। নইলে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের পরিবারের ছেলে কী করে নিজে নিজে গিয়ে রাজাকারবাহিনীতে নাম লেখায়?
নুসরাতের কলেজপড়ুয়া ভাই নওশীন রাজাকার হয়েছে। ট্রেনিংও নিয়েছে। ওদের বাড়িতে এখন চরম অশান্তি চলছে। বাবা ওকে বলেছেন, বাড়ি ছাড়ো। আমি একমুহূর্তের জন্য তোমার মুখ দেখতে চাই না।
নওশীন দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে চিৎকার করে বলেছে, পাকিস্তানি সেনারা নুসরাতকে তুলে নিতে এলে তখন আমাকেই খুঁজবে তোমরা। এখন যেতে বলছ, যাচ্ছি। আর আসব না।
বাবা রেগে গিয়ে বলেছেন, আসিস না। তুই আমার একা সন্তান না।
এখন বাড়িতে সবাই চুপ। কষ্ট ওর মায়ের মনে বেশি। ঠিকমতো কাঁদতে পারছে না। নুসরাত বলে, মায়ের কষ্ট দুই ধরনের। ছেলেটা ঢাকা শহরে থেকেও বাড়িতে নেই। আবার স্বাধীনতাযুদ্ধে উল্টো পথে চলে গেল ছেলেটা। মা কারও সঙ্গেই মুখ খুলে কথা বলছে না। একদম নিজের ভেতর গুটিয়ে গেছেন।
তুই কী মনে করছিস?
নষ্টকে সামনে থেকে সরিয়ে দেওয়াই উচিত। গেছে, ভালো হয়েছে। আমিও ওর মুখ দেখতে চাই না। এমন একটি পরিবারে থেকে ও কী করে একা একা রাজাকার হলো? ও তো যুদ্ধ করার জন্য চলে যেতে পারত।
মেরিনা ওর ঘাড়ে হাত রেখে বলে, আস্তে বল। খালাম্মা শুনবে।
আম্মা আমার মনোভাব জানে। আমি রেখেঢেকে কথা বলি না। নওশীন আরও বেশি জানে। সে জন্য আমাকে পাকিস্তানি আর্মির ভয় দেখায়।
আমার সঙ্গে যাবি?
কোথায়?
আমাদের বাড়িতে। দুদিন থেকে আসবি।
না। আমার কিছু ভালো লাগে না। নওশীনের আচরণে আমার পৃথিবী ভেঙে পড়েছে। আমি ঠিক করেছি, সোয়েটার বুনব। কামাল ভাই ফোন করে সোয়েটার বানাতে বলেছেন। সামনের শীতে মুক্তিযোদ্ধাদের এক শ টা সোয়েটার দেওয়ার ভাবনা মাথায় নিয়েছি।
