আয়শা এক গ্লাস পানি নিয়ে এসে বলেন, খাও। তোমার পিপাসা পেয়েছে।
দাও। আকমল হোসেন এক চুমুকে গ্লাস শেষ করেন। হাত দিয়ে মুখ মুছে বলেন, বুঝতে পারছি, খুব পিপাসা পেয়েছিল। কিন্তু টের পাইনি যে পিপাসা পেয়েছে।
তোমার উৎকণ্ঠার কারণে পিপাসার কথা মনে করতে পারোনি। তোমার মুখ দেখে আমি বুঝেছি যে তোমার পানি খেতে হবে।
তাই তো মনে হচ্ছে। তুমি এভাবে বুঝতে পারো বলেই তো আমার এমন সহজ বেঁচে থাকা। এ জন্য তোমার আগে আমি মরতে চাই, আশা।
দেখো, বাজে কথা বলবে না।
আকমল হোসেন সরল হাসি হাসেন। আয়শার বিবেচনার কাছে আত্মসমর্পণের ভঙ্গি জেগে থাকে তার হাসিতে। তিনি বিষয়টি উপভোগ করেন। আয়শা ভালোবাসার হাসিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকেন।
ফোন বেজে ওঠে।
তিনি দ্রুত পায়ে ফোন ধরতে যান। ফোনের অপর পাশে মারুফ।
আব্বা, আমরা হাইডে পৌঁছে গেছি। অপারেশন সাকসেসফুল।
লাইন ছেড়ে দেয়। তিনি কথা বলার সুযোগ পান না। রিসিভার হাতে দাঁড়িয়ে থাকেন।
আয়শা কাছে এসে দাঁড়ান।
কী হয়েছে? রিসিভারটা রাখো। এভাবে দাঁড়িয়ে আছ কেন?
ছেলেটার সঙ্গে কথা বলতে পারলাম না। ওর সঙ্গে আরও একটু কথা বলতে চেয়েছিলাম।
ও হয়তো ক্লান্ত। কে জানে, বিল সাঁতরে ওদের যেতে হয়েছে কি না! এখন কি আমাদের মন খারাপ করার সময়? ওরা সাকসেসফুল হয়েছে এই আনন্দ এখন আমাদের সবচেয়ে বড়। বাকি, ওরা ওদের মতো থাকুক।
ঠিকই বলেছ। বারবার আমিই ভুল করছি।
এটা কোনো ভুল নয়। আসলে তোমার উদ্বেগ কাটেনি।
ফোন আবার বেজে ওঠে। অপর প্রান্তে পুলু।
আঙ্কেল, সবকিছু ঠিকঠাকমতো শেষ হয়েছে। আমরা হাইডে পৌঁছে গেছি।
ফোন কেটে যায়। এবারও কথা বলার সুযোগ পেলেন না। কিন্তু মন খারাপ করলেন না। ভাবলেন, সময়কে বোঝার দায় এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়।
নিজের ঘরের টেবিলে এসে নানা কাগজপত্র খুলে বসলেন। ডায়েরির পৃষ্ঠায় লেখা নানা তথ্যের ওপর নজর পড়ে। চীন নগ্নভাবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করছে। চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই ইয়াহিয়া খানের কাছে পাঠানো বাণীতে পাকিস্তানের পাশে থাকার কথা বলেছেন। পাকিস্তান সরকারকে আশ্বস্ত করেছেন। আকমল হোসেন নানা কিছু মাঝেমধ্যে নোট করেন। লন্ডন টাইমস পত্রিকার প্রতিনিধি মাইকেল হনসবে তার রিপোর্টে পূর্ব পাকিস্তানে গণহত্যাবিষয়ক খবরকে ভারতের কাল্পনিক প্রচারণা বলে লিখেছেন। মরক্কোর সংবাদপত্র পাকিস্তান সরকারকে সমর্থন দিয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদম মালিক পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন, তাঁর সরকার বাংলাদেশকে কখনোই স্বীকৃতি দেবে না। ইরান ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরাও একই সুরে কথা বলছেন। তারা পাকিস্তানের অখণ্ডতার পক্ষে মুসলিম বিশ্বকে এক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
এসব নোট করে আকমল হোসেন লাল কালি দিয়ে বড় বড় করে নিচে লিখলেন, বাস্টার্ড। মানুষের মুক্তির সংগ্রামকে সাপোর্ট দিতে শেখেনি।
আবার ডায়েরির পৃষ্ঠা উল্টান।
শান্তি কমিটির খবরের ওপর ঝুঁকে পড়েন। বেশ কিছুদিন আগে শহরের বিভিন্ন ইউনিট ও মহল্লায় শান্তি কমিটি গঠনের কথা পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। সেসব কমিটির আহ্বায়ক মনোনীত করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। সেই অনুযায়ী কমিটির সদস্যদের মধ্য থেকে লিয়াজো অফিসার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তারা কাজ শুরু করেছে।
গতকালই আকমল হোসেন মারুফকে বলেছিলেন, স্বাধীনতার পক্ষের বাঙালিদের চিহ্নিত করে ক্যান্টনমেন্টে আর্মির কাছে তাদের নামের তালিকা পৌঁছে দেওয়াই হচ্ছে লিয়াজোঁ অফিসগুলোর মূল কাজ। লিয়াজো অফিসগুলোকে রাজাকার-দালালেরা নির্যাতন কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করবে। বিষয়টি আমাদের খুব ভালো করে খতিয়ে দেখতে হবে।
এ নিয়ে আমাদের ভাবনার বড় জায়গা রয়েছে, আব্বা। ওরা এখন যা খুশি তা-ই করবে।
হ্যাঁ, তা করবে। যারা নিরীহ বাঙালি, তাদের ওপরও নির্যাতনের স্টিমরোলার চালাবে।
আকমল হোসেন ডায়েরি বন্ধ করেন।
খবরের কাগজের পৃষ্ঠা উল্টান।
দৃষ্টি আটকে যায় একটি খবরে-কনভেনশন মুসলিম লীগের সভাপতি ফজলুল কাদের চৌধুরী গভর্নর হাউসে টিক্কা খানের সঙ্গে দেখা করেন। তিনি সেনাবাহিনীর পাশে থেকে কাজ করবেন বলে তাকে আশ্বাস দেন।
এমন আরও খুঁটিনাটি তিনি নোট করেন। কিন্তু ঘুরেফিরে শান্তি কমিটির কাজের বিস্তার তাকে ভাবিয়ে তোলে। এসব দালাল দেশজুড়ে ছড়াতে থাকবে। সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচারের সীমা-পরিসীমা বাড়বে।
প্রচণ্ড অবসন্ন বোধ করেন তিনি। নিজেদের মানুষগুলো নিজেদের বিরুদ্ধে যাচ্ছে। যুদ্ধের আরেকটি ফ্রন্ট ওপেন হয়েছে। দেখা যাক কত দূর যেতে পারে স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণকারী দালালেরা।
আয়শা কাছে এসে দাঁড়ান। ঘাড়ের ওপর হাত রাখেন। বাম হাত দিয়ে চুল এলোমেলো করেন।
খাবে চলো। টেবিলে খাবার দেওয়া হয়েছে। অবশ্য তেমন কিছু রান্না হয়নি।
আজ রাতে খেতে চাচ্ছি না। কিছু ভালো লাগছে না। খিদে নেই বলে মনে হচ্ছে।
খাওয়া নিয়ে তালগোল পাকানো চলবে না। ওঠো। দুমুঠো খেয়ে শুয়ে পড়ো। এটাও তুমি জানো যে আমি তোমাকে না খেয়ে শুতে দেব না। এসো।
আয়শা খাতুন হাত ধরে টানেন। তারপর হাত ছেড়ে দিয়ে বলেন, নিজে নিজে এসো। তোমার আগে আমি চলে গেলে কে তোমাকে এভাবে খেতে ডাকবে!
আহ, আশা, এভাবে বলবে না।
আয়শা খাতুন সামনে এগিয়ে যান। পেছন ফিরে আর তাকান না। যেন আকমল হোসেনের দীর্ঘশ্বাস এবং বেদনাভরা কণ্ঠস্বর তিনি শুনতে পাননি।
