মতিন টেলিফোন লাইন কেটে দেবে।
গাজী থামলে মারুফ জোরের সঙ্গেই বলে, স্টেনগানের সঙ্গে আমরা গ্রেনেড ৩৬ নিয়েছি।
গাড়ির ভেতরে শব্দ গমগম করে, অপারেশনের সময় রাত সাড়ে আটটা থেকে পৌনে নয়টা।
সময়টা আমাদের জীবনমরণ।
সময়টা আমাদের স্বাধীনতার জন্য।
তখন সবাই একসঙ্গে উচ্চারণ করে, জয় বাংলা। জোরে চেঁচাতে পারে। গাড়ির ভেতরে মৃদু শব্দে ধ্বনিত হয় জয় বাংলা।
একই রকমের কথা বলে গুলবাগ পাওয়ার স্টেশন উড়িয়ে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত যোদ্ধারা। ওরা ক্র্যাক প্লাটুনের আটজন। ছোটখাটো একটা দল। পুলু বলে, আমরা নিয়েছিলাম ৪০ পাউন্ড পিকে।
কুড়ি পাউন্ড পিকে দিয়ে চার্জ বানানোনা হয়েছে ট্রান্সফরমারের গায়ে লাগানোর জন্য।
তোমরা সবাই আমাকে দায়িত্ব দিয়েছ ট্রান্সফরমারের গায়ে চার্জ বাধার জন্য। আমার কাছে ২৪ ফুট প্রাইমা কর্ড আছে। এই বিস্ফোরক কর্ড এক্স দিয়ে আমি চার্জ বাঁধব, প্রয়োজনে…
পুলু কথা বাড়ায় না। ভাবে, অন্যরা বলুক প্রয়োজনে কী করতে হবে। ওর থেমে যাওয়ার পর একমুহূর্ত সময় মাত্র। সবাই একসঙ্গে বলে, প্রয়োজনে যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
দ্রুত সিদ্ধান্ত।
সাকসেসফুল হওয়ার জন্য অপেক্ষার সময় নেই।
আমাদের সময় রাত সাড়ে আটটা থেকে পৌনে নয়টা। একমুহূর্ত এদিকওদিকে হওয়া চলবে না।
আমরা সময়ের সন্তান। সময়কে জয় করে বীরের মতো ঘরে ফিরব। আমরা প্রস্তুত।
ওরা আটজন এগিয়ে যায় গুলবাগ পাওয়ার স্টেশনের দিকে। ততক্ষণে ক্র্যাক প্লাটুনের ছয়জন সদস্য উলন পাওয়ার স্টেশনের কাঁটাতারের বেড়ার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।
হ্যান্ডস আপ।
ওদের হুকুমে কেঁপে ওঠে পুলিশ ও দারোয়ান। তিনজন ওদের রিভলবারের মুখে দাঁড় করিয়ে রাখে। অন্যরা ট্রান্সফরমারের গায়ে চার্জ বসায়।
সময় স্তব্ধ হয়ে থাকে ওদের সামনে। সময় এখন ওদের সহযোগী সঙ্গী। বন্ধু। ওদের মতো সাহসী যোদ্ধা। ওদের জীবনে এমন সময় তো আগে আসেনি। ওরা সবাই সময়ের সন্তান। সময়ের সেই সন্তানেরা গুলবাগ পাওয়ার স্টেশনে চার্জ বাধে ২৪ ফুট প্রাইমা কর্ড দিয়ে। কর্ডের মাঝখানে বসানো হয় ডেটোনেটর ২৭। দেওয়া হয় এক মিনিট ফিউজওয়্যার। চার্জ লাগানোর পর পুলু খেয়াল করে, যেভাবে চার্জ লাগানো হয়েছে, তাতে ট্রান্সফরমার ধ্বংস হবে, কিন্তু বেস-বার ওড়ানো যাবে না।
দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হয়। বাশার ফিসফিসিয়ে বলে, যা ভেবেছিস, সেটাই ঠিক। একমুহূর্ত দেরি না। পুলু দ্রুত নতুন পজিশনে চার্জ লাগায়। মুহূর্ত সময় মাত্র। ওদের সামনে সময় দাঁড়ায় না। সময় উড়ে যায়। নতুন পজিশনে চার্জ লাগানো শেষ। ৮টা ৪৪ মিনিটে পুলু ইগনাইট করে। বেরিয়ে আসে সবাই। দ্রুত নিরাপদ দূরত্বে চলে যায়। ৮টা ৪৭ মিনিটে প্রচণ্ড বিস্ফোরণে ট্রান্সফরমারের মাথা উড়ে গিয়ে পড়ে পাশের বাড়ির টিনের চালের ওপর। অন্ধকারে ড়ুবে যায় এলাকা।
এই বিস্ফোরণের কয়েক মিনিট পর বিস্ফোরিত হয় উলন পাওয়ার স্টেশন।
প্রচণ্ড বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে আশপাশের এলাকা। অন্ধকার নেমে আসে। শব্দ বুকে নিয়ে ওরা নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে যেতে থাকে। গুলবাগ এলাকা থেকে সরে পড়তে অসুবিধা হয় না। আটজনের দল এক এক করে আলাদা হয়ে যায়। উলন থেকে সরে যাওয়ার সময় ক্র্যাক প্লাটুনের ছয়জন দেখতে পায়, টেলিভিশন সেন্টারে পাহারারত আর্মি সেপাইরা রাস্তার ওপর পজিশন নিয়েছে। রাস্তা দিয়ে যাওয়ার পথ বন্ধ। মুহূর্তমাত্র দেরি না করে ওরা বিলের পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সাঁতার দিয়ে এগিয়ে যেতে থাকে। মাথার ওপর তারাভরা আকাশ। বর্ষার আকাশ হলেও ঘন কালো মেঘ নেই আকাশে। চিতসাঁতার দিয়ে যেতে যেতে একজন বলে, ভালোই তো লাগছে প্রচণ্ড বিস্ফোরণের পরে এমন বিলের জলে সাঁতার কাটতে। আগুন-বারুদমৃত্যু-রক্ত-পানি এবং আমাদের জীবন এখন একই সমান্তরালে। এ বড় গভীর আনন্দ।
সে জন্য আকমল আঙ্কেল বলেন, মুক্তিযোদ্ধারা সময়ের শ্রেষ্ঠ সন্তান।
সে জন্য তিনি বলেন, যুদ্ধের সময় তোমাদের শরীর তোমাদের না।
এই খেসারত সবচেয়ে বেশি দিতে হচ্ছে আমাদের বোনদের। ওদের প্রতিরোধও কঠিন। আমরা ওদের স্যালুট করি।
হাফিজের কণ্ঠস্বর জলে ভেজা স্বরের মতো গাঢ় বিষণ্ণতায় দমে থাকে। কেউ আর কথা বলে না। দূর থেকে শোনা যায় পুলিশের বাঁশির শব্দ। হইচই। মানুষের কণ্ঠস্বর উচ্চকিত। এলাকার রাজাকাররা হয়তো জড়ো হয়েছে। ওরা তোলপাড় করবে চারদিক। ওরা অস্ত্র ও ক্ষমতা পেয়েছে। দুর্ভাগ্য এই দেশের। দুর্ভাগ্য স্বাধীনতার। এ দেশের দামাল ছেলেদের পাশাপাশি ওদের মনে হয় ভুইফোড় কেউ। নইলে জলদস্যুদের অবৈধ সন্তান, যারা এ দেশে শুধুই লুটপাট করতে এসেছে। এ দেশের মাটি, বৃষ্টি, গাছপালাকে নিজেদের মনে করে না। এমন কুসন্তানদের নিয়ে কী করবে স্বাধীন দেশ! ওরা মন খারাপ করে বিলের ধারে পৌঁছে যায়। ওদের মনে হয়, ওরা শুনতে পাচ্ছে আয়শা খাতুনের গুনগুন ধ্বনি।
আকমল হোসেন ঘড়ির দিকে তাকিয়ে থাকেন। বুঝতে পারেন, ওরা এখন আর অপারেশনে নেই। সময়ের হিসাব তা-ই বলে। নিশ্চয়ই এতক্ষণে ওদের অপারেশনের সময় শেষ হয়েছে। ওরা এতক্ষণে নিজ নিজ হাইডে পৌঁছে গেছে। গুলবাগের ছেলেরা তো পৌঁছে গিয়েছে। আর উলনের ছেলেদের বিল সাঁতরাতে হলে ওদের সময় লাগবে। তবে নিশ্চিত যে ওরা নিরাপদে আছে। ওদের মাথার ওপরে সাদা শাপলা লেগে আছে। আকমল হোসেন মনে মনে স্বস্তি বোধ করেন।
