বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবন এলাকার পাশের মাঠে রাজাকারদের ট্রেনিং হচ্ছে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে। গাড়ি চালালেন সেদিকে। একটি চক্কর দিয়ে বাড়িমুখো হলেন। তিনি জানেন, এই ট্রেনিং দেড় থেকে দুই সপ্তাহ হয়। মোহাম্মদপুরের ফিজিক্যাল ট্রেনিং কলেজের মাঠেও ট্রেনিং হচ্ছে।
আলতাফ জোরে জোরেই বলে, একটা অস্ত্র পেলে ওদের ফিনিশ করে দিতাম। বাঙালি কুত্তার বাচ্চা। নিজের দেশের বিরুদ্ধে যেতে লজ্জা করে না। আলতাফের ক্ষোভ প্রকাশে আকমল হোসেন মৃদু হাসেন। এই বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে হবে কি না, তা-ও ভাবেন। আশপাশের লোকেরা এই বাড়িকে কতটা নজরদারিতে রেখেছে, তা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। প্রতিবেশীরা এখন পর্যন্ত অনাবশ্যক কৌতূহল দেখায়নি। এসব ছেলে কারা আসা-যাওয়া করে, এ প্রশ্ন কাউকে করেনি। আলতাফকেও না। গাড়ি গেটের সামনে এসে দাঁড়ালে আলতাফ দরজা খুলে নামে। গেট দিয়ে ঢোকার সময় ভাবেন, মারুফের কাছে বাড়িটি অন্য রকম হয়ে গেছে। এ বাড়ি ছেড়ে চলে গেলে পরদেশী তাকে কোথায় খুঁজে পাবে। ও তো শহীদদের তালিকা দিতে আসবে, এমনই তো কথা বলে গেছে ও। তাহলে?
তিনি গ্যারেজে গাড়ি রেখে ঘরে ঢুকলেন। মেরিনা এগিয়ে এল।
আব্বা, আপনি ভীষণ ঘেমে গেছেন। শরবত দেব? নাকি ফ্রিজ থেকে এক গ্লাস পানি দেব?
কিসের শরবত, মা?
বেলের, আব্বা।
দাও, মা। বেশি ইচ্ছে করলে দুগ্লাসও খেতে পারি।
তিনি ড্রয়িংরুমে ঢুকলেন। মারুফের সঙ্গে আরও কয়েকজন ক্র্যাক প্লাটুনের সদস্য আছে। ছেলেরা দাঁড়িয়ে সালাম দেয়। নজরুল বলে, কেমন দেখলেন, আঙ্কেল?
অপারেশন সাকসেসফুল হবে। এলাকা এখনো নিরিবিলি। যে কজন পুলিশ আছে, ওরা তোমাদের সঙ্গে পারবে না। উলন এলাকা আমার কাছে খুবই নিরাপদ মনে হয়েছে। বাড্ডার ঝুঁকি একটু বেশি। পাশেই রামপুরা টেলিভিশন সেন্টারে কড়া পাহারা আছে তো, এ জন্য। তবে তোমরা পারবে। এ আমার গভীর বিশ্বাস। বিল সাঁতরে সরে যেতে পারবে।
আশার কথা। আমাদের ভরসার জায়গা আপনি যেভাবে বললেন তাদের মনের জোর দ্বিগুণ হয়ে গেল।
আশাই আমাদের ভবিষ্যৎ। তোমরা আমাদের ভবিষ্যৎ গড়ছ ছেলেরা।
মেরিনা শরবত দিলে তিনি এক চুমুকে শেষ করেন। বললেন, আরেক গ্লাস দাও, মা।
বাইরে কি খুব রোদ? গরম কি বেশি, আঙ্কেল?
বেশি তেতেছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে রাজাকারদের ট্রেনিং দেখে। অস্ত্র দিয়ে ওদের দাম্ভিক বানানো হচ্ছে। ওদের সামনে কোনো আদর্শ নেই বলে ওরা অস্ত্রের যত্রতত্র ব্যবহার করবে।
এই শয়তানদের আমরা গ্রাহ্য করি না। আমাদের লড়াই ওদের বসদের সঙ্গে।
দেখা যাক। মনে রেখো, এই শয়তানগুলো স্বাধীন দেশে থাকবে। ওদের বসরা যখন দেশ ছেড়ে পালাবে, তখন এদের দিকে ফিরেও তাকাবে না।
ছেলেরা এই কথা শুনে চুপ করে থাকে। একজন বলে, তাহলে এদের বোঝা কি আমাদের টানতে হবে? ওরা কি দেশটার বিরুদ্ধে আরও ষড়যন্ত্র করবে? নাকি লেজ গুটিয়ে গর্তে ঢুকে থাকবে?
দ্রুত এদের বিচার না হলে কী হয়, বলা যায় না।
আকমল হোসেন গম্ভীর কণ্ঠে আরও বলেন, তবে আমি বিশ্বাস করি, স্বাধীন দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার না হলে দেশ কলঙ্কমুক্ত হয় না।
ঠিক আঙ্কেল। স্বাধীন দেশে এই বিষয়ে আমাদের খুব সতর্ক থাকতে হবে।
আজ আমরা উঠি। কাল বিকেলে এখান থেকে অস্ত্র নিয়ে বেরিয়ে যাব আমরা।
ওরা চলে গেলে আকমল হোসেন বাথরুমে ঢোকেন। শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে তাঁর মনে হয়, বিলের পানির নিচে তিনি ড়ুবে আছেন। মাথার ওপর সাদা শাপলা। হাজার হাজার সাদা শাপলায় ভরে আছে বিল। ওপর থেকে পানি দেখা যায় না। তিনি যখন মাথা তুলবেন, তাঁর মাথার ওপরও সাদা শাপলা পতাকার মতো উড়বে।
৭. পরদিন উলনের দল বেরিয়ে যায়
পরদিন উলনের দল বেরিয়ে যায় গাজীর নেতৃত্বে। ওরা যখন বেরিয়ে যায় তখন শুনতে পায়, আয়শা খাতুন ডাইনিং স্পেসে দাঁড়িয়ে গুনগুন করছেন, যুক্ত করো হে সবার সঙ্গে। মুক্ত করো হে ভয়…।
ছেলেরা সেই ধ্বনি বুকে নিয়ে বের হয়। কেউ পেছন ফেরে না। ওরা কোথাও থেকে গাড়ি জোগাড় করেছে। আকমল হোসেনের তা আর জিজ্ঞেস করা হয় না। তিনি বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকেন। মেরিনা নিজের ঘরে। আলতাফ গেট খুলে দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে আবার বন্ধ করে দেয়।
আজ ওরা ট্রান্সফরমার ওড়াবে। সঙ্গে নিয়েছে কুড়ি পাউন্ড পিকে ও পনেরো ফুট প্রাইমা কর্ড, প্রায় তিন মিনিট-মেয়াদি সেফটি ফিউজওয়্যার আর ডেটোনেটর।
গাজী যেতে যেতে বলে, আমাদের পরিকল্পনার কথা সবার তো মনে আছে?
অন্যরা সাড়া দেয়, আছে।
গাজী তার পরও পুনরাবৃত্তি করার জন্য বলে, আমরা ঠিক করেছি, ১০ পাউন্ড করে পিকের দুটি চার্জ প্রাইমা কর্ড দিয়ে লাগিয়ে ট্রান্সফরমারের দুই পাশে ফিট করা হবে। ঠিক?
হ্যাঁ, ঠিক। সবকিছু আমাদের মনে আছে। তার পরও তোমার কথা শুনতে আমাদের ভালো লাগছে। কারণ, কথাগুলো খালাম্মার গুনগুন স্বরের গানের মতো। ওই গানের বাকিটুকু আমাদের কানে আসবে অপারেশন শেষ করে ফেরার পথে।
কথাগুলো হাফিজ একটানে বলে। সবাই কান পেতে শোনে। সবারই শুনতে ভালো লাগছিল।
ও থামলে গাজী নিজের নাম উচ্চারণ করে বলে, অপারেশনের অগ্রগামী দলে থাকবে গাজী আর মারুফ। ওদের কাছে থাকবে স্টেনগান।
ঠিক। আমরা মনে রেখেছি!
হাফিজ ট্রান্সফরমারের গায়ে চার্জ বসাবে।
জিন্নাহ একটি রিভলবার নিয়ে গেটের পাহারায় থাকবে।
