বয়স! শব্দটা উচ্চারণ করে হাসলেন নিজের মনে।
আকমল হোসেন গাড়ি স্টার্ট দিয়েছেন। তাঁর গাড়ি এখন কাকরাইলে। তিনি সিদ্ধেশ্বরী হয়ে মালিবাগের মোড়ে বের হবেন। প্রথমে গুলবাগের দিকে যাবেন। উলন-বাজ্ঞা।
আবারও ভাবলেন, বয়স! বয়স থাকলে তিনি তো ওদের মতো অপারেশনে যেতেন। অন্তত সিটি টেররাইজিং অপারেশন করতে পারতেন। বয়স এখন বাধা। বয়স কখনো এমনই আচরণ করে। তার বুকের ভেতর এখন বয়স বেড়ে যাওয়ার অনুতাপ! নিজের জন্য তাঁর ভীষণ মায়া হয়।
তিনি ভেবে দেখলেন, গত মাসে রাজাকার অর্ডিন্যান্স জারি হয়েছে। গভর্নর টিক্কা খান এই অর্ডিন্যান্স জারি করেন। পূর্ব পাকিস্তান রাজাকার অর্ডিন্যান্স ১৯৭১। এই অর্ডিন্যান্সের বলে ১৯৫৮ সালের আনসার অ্যাক্ট বাতিল ঘোষিত হয়।
যেদিন এই অর্ডিন্যান্স জারি হয়, সেদিন তিনি আয়শাকে পড়ে শুনিয়েছিলেন খবরটি।
আয়শা বলেছিলেন, বাঙালির বিরুদ্ধে বাঙালিদের মুখোমুখি করানো হলো।
তিনি খবরের শেষটুকু না পড়েই বলেছিলেন, গোলাম আযমের মতো লোকেরা আছে না! তারা নিজেরাই দাঁড়িয়েছে। তাদের কেউ দাঁড় করায়নি, আশা। এখন অনেকেই পরিস্থিতির শিকার হবে।
আয়শা মাথা নাড়েন। বলেন, আমাদের দুর্ভাগ্য।
দেখো, এই অ্যাক্টে আনসার বাহিনীর যাবতীয় স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির মূলধন ও দায় এবং রেকর্ডপত্র রাজাকার বাহিনীর কাছে অর্পিত হবে।
আমরা তো শুনেছি, দেশের আনসার বাহিনীর অনেক সদস্য মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিয়েছে। বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে সীমান্ত পার হয়েছে। আমাদের গেরিলাদের সঙ্গে ওদের দেখা হয়েছে।
সবই ঠিক আছে, এটুকু আমাদের পক্ষে গেছে, কিন্তু যারা যেতে পারেনি, তাদের কী হলো? এই দেখো, লিখেছে আনসার অ্যাডজুট্যান্টদের রাজাকার অ্যাডজুট্যান্ট হিসেবে নিযুক্ত করা হয়েছে।
আয়শা খাতুন চুপ করে থাকেন। ভাবেন, শত্রুপক্ষ এভাবেই নিজেদের অলিগলি তৈরি করে। সেই সব পথ ধরে এগোতে চায়। কিন্তু প্রতিরোধের মুখে এগোতে পারে না। এটা ইতিহাসের সত্য। এই সব রাজাকারের দেশের মাটিতে বিচার হবে। হতেই হবে।
দুহাত মুষ্টিবদ্ধ হয় আয়শা খাতুনের।
আকমল হোসেন আবার বলেন, এই অর্ডিন্যান্সে বলা হয়, প্রাদেশিক সরকারের সিদ্ধান্ত অনুসারে দেশের সব মানুষকে রাজাকার বাহিনীতে ভর্তি করা হবে। তাদের ট্রেনিং দিয়ে অস্ত্র দেওয়া হবে। তারা নির্ধারিত ক্ষমতাবলে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করবে।
সবই বুঝলাম। ক্ষমতার অপব্যবহারেরও হুকুম দেওয়া থাকবে। অপব্যবহারের জন্যই তো অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া।
সেদিন আকমল হোসেন কাগজ হাতে নিয়ে চুপ করে বসে ছিলেন। ভাবছিলেন, যুদ্ধ এখন নানামুখী হবে। রাজাকাররা ছদ্মবেশে প্রতিবেশী হয়ে থাকবে। মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারেও রাজাকাররা ঢুকবে কি না, কে জানে! সুযোগের সন্ধানে ঘুরবে লোভী মানুষেরা। তারা স্বাধীনতা বোঝে না। বোঝে নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থ। এই সব মানুষকে চোখে চোখে রাখা যুদ্ধ সময়ের আরেকটি কাজ।
আকমল হোসেনের গাড়ি এখন মালিবাগ হয়ে গুলবাগের রাস্তায় ঢুকেছে। পেছন থেকে আলতাফ ডাকে, স্যার।
কিছু বলবে? ডাকছ কেন?
আমাকে দুই দিনের ছুটি দেবেন। গ্রামে যাব। জরুরি দরকার আছে, স্যার। আমাদের বাড়িতে সর্বনাশ হয়েছে।
কীভাবে জানলে? কে খবর দিল? হঠাৎ গ্রামে যাওয়ার তাড়া হলো কেন?
কালকে বাজারে গায়ের একজনের সঙ্গে দেখা হয়েছে। ও বলেছে, আমার ছোট ভাই মোসলেম রাজাকার বাহিনীতে ঢুকেছে। আব্বা-আম্মার কথা শুনছে না। উল্টা আমার আব্বাকে শাসায়।
তুমি গিয়ে কী করবে? যে ছেলে বাবাকে মানতে চায় না, সে কি ভাইকে মানবে?
আমি প্রথমে ওকে বোঝাব। তারপর মাইর দেব। এর পরও কথা না শুনলে আব্বাকে বলব, ওকে ত্যাজ্যপুত্র করতে।
ঠিক বলেছ। লড়াইটা শুরু হয়ে যাওয়াই ভালো। আমাদের জন্য নতুন উৎপাত শুরু হলো। অপেক্ষা করলে সময় নষ্ট হবে।
কবে যাব, স্যার?
তুমি যেদিন যেতে চাও, সেদিন।
ভাইয়াদের অপারেশন হয়ে যাক, তার পরে। অপারেশনের দিন তো আমাকে অস্ত্র বের করতে হবে।
তা তো হবেই। তুমি আমার সহযোদ্ধা। আমার বয়স হয়েছে না। তোমার মতো কঠিন কাজ তো করতে পারি না।
আপনি যা করছেন, তা এ দেশের শত লোকও পারে না।
তুমি আমাকে অনেক ভালোবাসো, আলতাফ।
গাড়ি পাওয়ার স্টেশনের খানিকটুকু দূরে থামান আকমল হোসেন। তারপর রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ডাব কেনেন। দুজনে ডাব খান। পাওয়ার স্টেশনের সামনের রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করেন। পাশের বাড়ি দেখেন। অকারণে মানুষ গোনেন, রাস্তায় হেঁটে যাওয়া এবং আশপাশের মানুষ। এলাকা মোটামুটি নিরিবিলি। সন্ধ্যার পর আরও ফাঁকা হয়ে যাবে। কাজ শেষে ওদের বেরিয়ে যেতে অসুবিধা হবে না।
আকমল হোসেন বেশ নিরুদ্বিগ্ন চিত্তে গাড়িতে ওঠেন। আলতাফও খুশি। বলে, স্যার, গেরিলা ভাইদের খুব ঝামেলা হবে, না?
চুপ থাক। আর কথা না। কোন কথা কার কানে যাবে কে জানে!
তিনি গাড়ি স্টার্ট দেন। রামপুরার রাস্তায় উঠে গাড়ি উলন-বাচ্ছার দিকে ছুটতে থাকে। পেরিয়ে যায় রেললাইন। বস্তি। আশপাশের বাড়িঘর। কাঁচা বাজার। সামনে টেলিভিশন সেন্টার। টেলিভিশনের টাওয়ার। আকাশসমান উঁচু হয়ে আছে। আলতাফ টাওয়ারের মাথার দিকে তাকিয়ে থাকে। পার হয়ে যায় গাড়ি। ব্রিজের কাছে এসে থামে। দুজনে বিলের ধারে দাঁড়ান। দূরত্ব হিসাব করেন। যদি এই পথে যেতে হয় ওদের? কতগুলো দোকান আছে, কয়টা বাড়ি আছে, তা হিসাব করেন। কোন বাড়ির সামনেটা রাস্তার দিকে, কোনটা উল্টো দিকে, তা-ও দেখেন। দোকানিদের চেহারা দেখেন। বিভিন্ন দোকানে দাঁড়িয়ে এটা-ওটা কেনেন। সবকিছুই ওদের জানিয়ে দেবেন। তারপর আবার গাড়িতে ওঠেন। উলন পাওয়ার স্টেশন পার হয়ে গাড়ি থামান। পুলিশ ও দারোয়ান গেটের পাহারায় আছে। তিনি বেশিক্ষণ ঘোরাঘুরি না করে ফিরে আসতে থাকেন বাড়ির দিকে। বেশিক্ষণ ঘোরাঘুরি করলে ওরা তাকে সন্দেহ করতে পারে। গাড়িতে স্টার্ট দেন। পরক্ষণে ভাবলেন, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ঘুরে যাবেন।
