মেরিনা তাগাদা দিয়ে বলে, হাঁ করে আছ কেন? তোমাদের দুর্গের কথা বলো।
বাড়িটি বেশ বড়। সামনে একটা বাগান আছে। বাগানের গাছগুলো বেশ বড় বলে একতলা বাড়িটা খুব ছায়াচ্ছন্ন। বলা যায়, বাড়িটার একটা স্নিগ্ধ জলে ভাব আছে। গেরিলারা অনবরত এই বাড়িতে যাতায়াত করে বলে ওই গাছের আড়াল বেশ সুবিধাজনক। তা ছাড়া বাড়িটার আরেকটা দিক হলো, গাড়ি নিয়ে চট করে ঢোকা যায়, চট করে বের হওয়া যায়। সবচেয়ে বড় দিক হলো, বাড়িটার মেঝে মাটি থেকে এক ফুট উঁচুতে। সে জন্য অস্ত্র লুকিয়ে রাখা খুব সুবিধাজনক। যে কেউ অনায়াসে বুঝতে পারবে না যে এই মেঝের নিচে অস্ত্র লুকিয়ে রাখা আছে।
শাকেরের সঙ্গে তোর কি আগরতলা বা মেলাঘরে দেখা হয়েছে?
একদিন দেখা হয়েছিল, আব্বা। ও সরাসরি যুদ্ধ করার জন্য ৩ নম্বর সেক্টরে যোগ দিয়েছিল। ও ত্রিপুরার উষাবাজার শরণার্থী ক্যাম্পে প্রথমে ছিল। পরে শিমলাতে যায়। শিমলা ৩ নম্বর সেক্টরের হেডকোয়ার্টার। এর পরে ওর সঙ্গে আমার আর দেখা হয়নি। আপনার ওর কথা মনে হলো কেন, আব্বা?
খুব সাহসী ছেলে ছিল। কোনো কারণ নেই। এমনিই মনে হয়েছে।
বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে মারুফের মনে হয়, আবার একটা মিসিং লিংক ও অনুভব করছে। এবার বাড়িতে আসার পর এমনই মনে হচ্ছে বারবার। আগে কখনো এমন হয়নি। তাহলে কি ওর অবর্তমানে এ বাড়িতে একটা কিছু ঘটেছে, যার সূত্র ওর সামনে কেউ বলতে চাইছে না। ও বিষয়টা নিয়ে নিশ্চিত হয়ে যায়।
ও ড্রয়িংরুমে যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়িয়েও যায় না। টেবিলের কোনায় হাত রেখে বলে, আব্বা, শাকেরের বাড়িতে সেদিন আমরা ওর বাবা-মা ও ভাইদের লাশ দেখেছিলাম। জেনিফারের লাশ দেখিনি। তাহলে কি আর্মি জেনিফারকে নিয়ে গিয়েছিল?
এসব আমরা অনুমান করতে পারি, কিন্তু নিশ্চিত হতে পারি না।
তা ঠিক। তবে জেনিফার হয়তো শাকেরের সঙ্গে অন্য কোথাও সরে যেতে পারে। সন্ধ্যারাতেই।
আকমল হোসেন কথা বলেন না। আয়শা আগেই রান্নাঘরে গিয়েছিলেন। কী রান্না হবে, খোঁজখবর করছেন। মেরিনা কোনো কথা না বলে নিজের ঘরে যায়। একটু পর মারুফ ওর ঘরে গিয়ে ঢোকে।
সরাসরি মেরিনাকে জিজ্ঞেস করে, যখন আমি ছিলাম না, তখন কি বাড়িতে কিছু ঘটেছিল, মেরিনা?
কী ঘটতে পারে, সেটা তুমি আমাকে জিজ্ঞেস করো। অন্য কিছু না?
বাব্বা, দারোগাগিরি দেখাচ্ছিস নাকি? তোকে দেখে মনে হচ্ছে তোর বয়স বেড়েছে। গম্ভীর হয়ে গেছিস।
তখন আলতাফ এসে খবর দেয় যে ফয়সল আর মানিক এসেছে।
চলো, ভাইয়া। ওরা নিশ্চয় পত্রিকাটা এনেছে। পত্রিকা?
গেরিলা নামে ওরা একটা পত্রিকা সাইক্লোস্টাইল করে বের করছে। চলো দেখি।
দুজনে ড্রয়িংরুমে আসে। আকমল হোসেন ওদের সঙ্গে কথা বলছেন।
বাহ্, সুন্দর হয়েছে। কাজে লাগবে। জায়গামতো ডিস্ট্রিবিউট করতে হবে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায়।
মেরিনা আপার জন্য পঁচিশ কপি এনেছি।
মারুফ পত্রিকা হাতে নিয়ে পাতা উল্টে দেখে বলে, এটার খুব দরকার ছিল। আমি কয়েকটা কপি নিয়ে যাব। আগরতলায় বিলি করব।
মেরিনা খুশি হয়ে বলে, পত্রিকা বিলির কাজটা পেয়ে আমার ভালো লাগছে। পঁচিশ কপি বিলি করতে আমার তিন দিন লাগবে।
কাগজ বিলি করার সময় রেশমাকে তোর সঙ্গে নিস। ও বেশ চটপটে মেয়ে। কাজও করতে চায়।
তা নিতে পারি। ও বলেছে, যেকোনো কাজ পেলে করবে। ওকে যেন আমি সঙ্গে রাখি। আমি আজই ওদের বাড়িতে যাব।
আয়শা খাতুন ছেলেদের জন্য চা-পুডিং পাঠান। বাড়িতে কোনো যোদ্ধা ছেলে এলেই তার যত্ন থেকে কেউ বাদ পড়ে না। বলেন, ওদের কিছু না খাওয়ালে আমি শান্তি পাই না। ওরা মাথার ওপর মৃত্যু নিয়ে ঘোরে।
আকমল হোসেন ওদের চা-খাওয়ার কথা বলেন। ওদের বসিয়ে রেখে নিজে বের হন। যাবেন রামপুরা, গুলবাগ, উলন এলাকায়। যুদ্ধের আগে তিনি রামপুরা-উলন এলাকায় যেতেন। ব্রিজের কাছে গাড়ি রেখে নৌকা নিয়ে ঘুরতে যেতেন বিলে। বিলের লতাগুল্ম, সাদা-গোলাপি রঙের শাপলা, স্বচ্ছ পানিতে মাছেদের ঘোরাফেরা, নির্মল বাতাস, দূরের গাছপালা-ঘরবাড়ি ইত্যাদির স্মৃতি এখন মৃত্যু এবং বারুদের মাখামাখিতে পূর্ণ। আজ তিনি যাচ্ছেন ভিন্ন অবলোকনে। দেখবেন যুদ্ধ কতটা পূর্ণ হবে এই প্রাকৃতিক পরিবেশে। একজন ইঞ্জিনিয়ার এই অপারেশনের পরিকল্পনা করেছেন। যোদ্ধাদের মনে হয়েছে, কাজটি করা দরকার। যদি একটি পাওয়ার স্টেশন উড়ে যায়, শহরের মানুষ ঘুরে তাকাবে। বলবে, আমাদের ধমনিতে পরাধীনতার গ্লানি নেই। আমরা নিজেদের অবস্থান ঘোষণা করছি।
এই ঘোষণার কথা স্বীকার করছে যুদ্ধের বিরোধিতা যারা করছে তারা। তবে সরাসরি নয়, খানিকটা ঘুরিয়ে। তাতে অবশ্য সত্য আড়াল থাকে না। পূর্ব পাকিস্তানের দুষ্কৃতিকারীদের শায়েস্তা করার জন্য জামায়াত নেতা গোলাম আযম ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে দেখা করেছেন। বলেছেন, দুষ্কৃতিকারীরা পাকিস্তানের অখণ্ডতা ধ্বংস করার চেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে। তারা যে ধরনের কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছে, তা এ মুহূর্তে দমন করা দরকার। সে জন্য আলাদা বাহিনী গড়ে তাদের হাতে অস্ত্র তুলে দিতে হবে। তিনি এ ব্যাপারে অটল। দৃঢ় সংকল্প নিয়ে পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
পত্রিকার পৃষ্ঠায় এমনই খবর ছাপা হয়। আকমল হোসেন খুঁটিয়ে পড়েন সেই খবর। শত্রুপক্ষের প্রতিটি বিষয় নখদর্পণে রাখা জরুরি। প্রয়োজনে নোট করেন, পাছে যদি ভুলে যান কিছু। বয়স তো হয়েছে!
