মেরিনা হইচই করে কথা বলে, বাড়িতে এসে সবাইকে কষ্ট দিয়েছ। নাক ডেকে ঘুমিয়েছ। আবার হাসছ? নাহ্, তোমার এই আচরণের সঙ্গে গেরিলাযোদ্ধার আচরণ মেলাতে পারছি না। তুমি আমার অলস ভাইয়া। কী, ঠিক বলেছি?
একদম ঠিক। এক শ ভাগ ঠিক। তোর সঙ্গে আমি কথার যুদ্ধ চালাতে চাই। আম্মা কী করছে রে?
ডাইনিং টেবিলে বসে তোমার নাশতা পাহারা দিচ্ছেন। আর একমাত্র ছেলেটিকে নিয়ে ব্যাকুল হয়ে ভাবছেন। আকাশ-পাতাল ভাবনা যাকে বলে, তা-ই।
আহা রে, আমার সোনার মা—
মারুফ এক লাফে বাথরুমে যায়। দরজা বন্ধ করতে করতে বলে, তুই আম্মার কাছে যা। আমি আসছি। আব্বাকেও ডাকিস।
দেরি করবি না কিন্তু। মুখ ধুবি আর বের হবি।
নাশতার টেবিলে বসে সবার মুখের দিকে তাকিয়ে অপরাধীর ভঙ্গিতে হাসে মারুফ। একটু করে পরোটা আর ডিম মুখে পুরতে পুরতে বলে, কাল আমাদের উলন আর গুলবাগের পাওয়ার স্টেশন রেকি করার সময় প্রচুর ঘোরাঘুরি করতে হয়েছে। রোদে-গরমে টায়ার্ড হয়ে গিয়েছিলাম। কাল তো এমন বৃষ্টি ছিল না। শহরজুড়ে ভাপসা গরম ছিল। রোদের তাপও খুব বেশি ছিল।
আকমল হোসেন মৃদু হেসে বলেন, তুই কাকে কৈফিয়ত দিচ্ছিস? আমরা কি তোকে জিজ্ঞেস করেছি? নাকি তোর কৈফিয়তের অপেক্ষায় আছি। তুই বাড়িতে এসেছিস, এতেই আমরা খুশি।
অপরাধ নিজের মনের মধ্যে, আব্বা। মারুফ মুখ নিচু করে বলে, কাল আসলে আমি ঠিক আচরণ করিনি। আমার আরেকটু ধৈর্য দেখানো দরকার ছিল। বিশেষ করে মেরিনার সঙ্গে তো বটেই।
তারপর ঘাড় নিচু করে গ্লাসের জুস শেষ করে। মৃদু স্বরে বলে, বাড়ির যত্নে আমার শুধু ঘুম পায়।
হাসির রোল ওঠে টেবিলে। আয়শা খাতুন হাসতে হাসতে বলেন, আমরা কি তোকে আদর দিয়ে বোকা বানিয়ে ফেলেছি? তুই আজ কেমন করে যেন কথা বলছিস, তা আমি বুঝতে পারছি না রে।
মেরিনা হাসতে হাসতে বলে, বোকা না, আম্মা, আদুরে বানিয়েছেন। বেশ কিছুদিন পরে বাড়ি ফিরে ও ঢংঢং করছে, যেন একটা বাচ্চা শালিক পাখি। ভাবখানা এমন, যেন কতকাল মায়ের আদর পায়নি।
মারুফ থমকে গিয়ে সবার মুখের দিকে তাকায়। সবার দৃষ্টি ওর মুখের ওপর। ও গম্ভীর স্বরে বলে, কাল যখন বাড়ির গেটে এসে দাঁড়ালাম, আমার মনে হচ্ছিল, কোথায় যেন কী ভেঙে পড়েছে। অথচ কোনো কিছু দেখতে পাচ্ছি না আমি। ভয়ে-আতঙ্কে আমি চারদিকে তাকাই। অনুভব করি, সেই ধ্বংসস্থূপে আটকা পড়েছি আমি। আমার ভীষণ খারাপ লাগতে শুরু করে। আমার শরীর ভেঙে আসে। অন্য সময় সারা দিন কত কাজ করেও আমার এমন খারাপ লাগেনি। আমি বলতে পারব না, আমার কী হয়েছিল। আমার মনে হয়েছিল, আমার আশ্রয় দরকার। ঘুম আমার সেই আশ্রয় ছিল। কখন ঘুম ভাঙল, আমি টেরও পাইনি। কেবলই মনে হচ্ছিল, সকাল হয় না কেন। সময় এমন আটকে আছে কেন!
ও আবার মুখ নিচু করে বাটির ফিরনি খায়। একটানে খেয়ে সবটুকু ফিরনি শেষ করে।
আকমল হোসেন অন্যদের সঙ্গে চোখাচোখি করেন। মেরিনা বুঝতে পারে, ওর গলার কাছে কিছু একটা আটকে গেল। ও জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়। আয়শা খাতুন নিজেকে সামলে নিয়ে বলেন, ঠিকমতো ঘুমোতে পেরেছিলি তো?
হ্যাঁ, আম্মা। বিছানায় শোয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি ঘুমে তলিয়ে গেলাম। আর কিছু বলতে পারব না। কোনো স্বপ্নও দেখিনি। ঘুম থেকে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে আপনার কথা মনে হয়েছিল। ভেবেছিলাম, মায়ের দোয়ায় আমি একটা বিপদ কাটিয়েছি। কী ধরনের বিপদে পড়তে যাচ্ছিলাম, তা আমি জানি না। ঘুম ভাঙার পরে নিজে নিজেই খুব আশ্চর্য হয়েছি।
ঠিক আছে, এসব কথা থাক। ঢাকায় এসে কোথায় ছিলি, বল তো? দুৰ্গটা তো আমার চিনতে হবে। দরকারমতো যাওয়া-আসা করতে হবে। খোঁজখবর রাখতে হবে।
আমরা একটু পরে বের হয়ে এলাকাটা ঘুরে আসতে পারি, আব্বা?
না, আমি বের হয়ে উলন-গুলবাগ ওই দিকে যাব। আলতাফ যাবে আমার সঙ্গে। ইঞ্জিনিয়ার নজরুল আসবে। তুই ওর সঙ্গে কথা বলবি। এখন বল, তোর দুর্গের কথা। আমি নিজে নিজেই এলাকাটা ঘুরে আসব।
দুদিন আমি ছিলাম ধানমন্ডি ২৮ নম্বরে। ওটা বেশ বড় একটা বাড়ি। আপাতত খালি পড়ে আছে। দুজন দারোয়ান আছে বাড়ির পাহারায়।
আকমল হোসেন ভুরু কুঁচকে বলেন, মনে হচ্ছে, বাড়িটা আমি চিনি। তোরা যখন সাংকেতিক ভাষায় বলিস আটাশে, সেটা শুনে আমি গিয়েছিলাম রাস্তা দেখতে। খোঁজ নিয়ে জেনেছিলাম, বাড়িটা খালি আছে। আটাশে ঢুকে হাতের ডানের ৩ নম্বর বাড়িটা তো?
হ্যাঁ, আব্বা। ওই বাড়িটাই। ওটা একটা ওষুধ কোম্পানির কাছে ভাড়া দেওয়া ছিল। কোম্পানির ফিল্ড ম্যানেজার আমাদের গেরিলা বন্ধু। ওই বড় বাড়িটাকে গেরিলাদের আশ্রয়স্থল বানানো হয়। অবশ্য বাড়িটার চেহারা আড়াল করার জন্য ওই ওষুধ কোম্পানির একটা সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে।
বেশ করেছিস তোরা। আকমল হোসেন ঘন ঘন মাথা নাড়েন। আয়শা ভুরু কুঁচকে বলেন, ওই বাড়িতে খাওয়াদাওয়া নেই, বুঝতে পারছি। তুই যে খেলি না রাতে?
আমার খাওয়ার কথা মনে ছিল না, আম্মা। এই বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আমি সবকিছু ভুলে যাচ্ছিলাম।
আচ্ছা, আচ্ছা, ঠিক আছে। তুই আটাশের কথা বল।
আকমল হোসেন প্রসঙ্গ ঘোরানোর চেষ্টা করেন। মারুফ বাবার দিকে একমুহূর্ত তাকায়। হঠাৎ মনে হয়, এই বাড়ির সঙ্গে আজ থেকে বোধ হয় একটি মিসিং লিংক তৈরি হয়েছে। ও যা ধরতে পারছে না, তার সূত্র এই পরিবারের সবার কাছে একটি গোপন কৌটায় আছে। কেউ তা প্রকাশ করছে না।
