আকমল হোসেন নিজের ঘরের টেবিলে কাজ করছেন। পরদেশীর দিয়ে যাওয়া খাতা থেকে নিজের ডায়েরিতে মেয়েদের নামের তালিকা লিখে রাখছেন। বেশ সময় নিয়ে নামগুলো লেখেন তিনি। একটি নাম লিখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকেন নামটির দিকে। তারপর আরেকটি লেখেন। এভাবে অনেকটা সময় কেটে যায় তার। নিজের সময়ের পেছন দিকে তাকান, পরমুহূর্তে সামনের দিকে। হিসাব মেলান। দেখতে পান সময়ের যোগফল মিলে যাচ্ছে। দুয়ে-দুয়ে চার হচ্ছে। একসময় শেষ হয় নাম লেখা। তিনি জেনিফারের চিঠিটা ডায়েরির এক পৃষ্ঠায় পিন দিয়ে গেঁথে রাখেন। কিন্তু চিঠিটা দ্বিতীয়বার পড়ার সাহস হয় না তার। কেমন করে পড়বেন? তছনছ হয়ে যাওয়া ঘরে দুটো শিশুসহ দুজন মানুষের লাশ তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। সেটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে প্রথম একটি রক্তাক্ত দুর্গবাড়ি দেখার অভিজ্ঞতা। আকমল হোসেন চেয়ারে মাথা হেলিয়ে কিছুক্ষণ চোখ বুজে থাকেন।
তারপর নতুন একটা কাগজ টেনে উলন-বাড্ডা আর গুলবাগের ম্যাপ আঁকেন। যুদ্ধের পর থেকে এলাকার মানচিত্র আঁকা তার প্রিয় অভ্যাস হয়ে উঠেছে। ঢাকা শহরে তাঁর জন্ম। এই শহরে বেড়ে ওঠা। শহরটা দেখতে দেখতে বড় হয়েছেন। তিনি বলেন, এই শহরের হেন এলাকা নেই, যেখানে আমি যাইনি। শহরটা যতটুকু তার সবটুকুতে আমার পায়ের চিহ্ন আছে। ছোটবেলায় যেতেন বাবার সঙ্গে। বড় হয়ে খুঁজে দেখেছেন ছোট ছোট এলাকা। যেখানে অনেকেই যেত না। তিনি কখনো গেছেন বন্ধুদের নিয়ে, কখনো ঘুরেছেন একা একা। ফুল, পাখি, পোকামাকড়, গাছগাছালিও দেখেছেন অনেক। নাম জানতেন না। দেখাটাই আনন্দ ছিল। এখন দেখাটা প্রয়োজন। জীবনযুদ্ধের পথচলার জন্য চারপাশ দেখা। গতকাল ইঞ্জিনিয়ার নজরুল এসেছিল। ভগবতী চ্যাটার্জি লেনে থাকে। এবাড়ি-ওবাড়ি পায়ে হাঁটার দূরত্ব। নজরুল বলেছে, পরবর্তী অপারেশন পাওয়ার স্টেশন। ক্র্যাক প্লাটুনের সদস্যরা দুই ভাগে ভাগ হয়ে আক্রমণ চালাবে। একই সঙ্গে। তিনি রাস্তা, গাছ, ব্রিজ ইত্যাদির মধ্যে পাওয়ার স্টেশন দুটোর অবস্থান তৈরি করেন। উলন-বাজ্ঞার কাছাকাছি রামপুরা টেলিভিশন সেন্টার। ওখানে বড় রকমের পুলিশি পাহারা আছে। এই জায়গাটা ছেলেদের জন্য খানিকটা ঝুঁকিপূর্ণ। তবে সে রকম বিপদ দেখলে ওরা বিল সাঁতরে নিজেদের দূরে সরিয়ে নিতে পারবে। এটাই বড় ধরনের ভরসার জায়গা। অনায়াসে সরে যাওয়ার পথ। তিনি বেশ স্বস্তি বোধ করেন। পুরো লোকেশন এঁকে আকমল হোসেন খুশি হয়ে যান। গেরিলারা ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে বিস্ফোরণ ঘটানোর পরে বিদেশি পত্রিকায় এ ঘটনার খবর ছাপা হয়েছিল। ওরা লিখেছিল, ইট শোজ দ্যাট দ্য গেরিলাস ক্যান মুভ অ্যাট ঢাকা সিটি অ্যাট দেয়ার উইল।
তিনি চেয়ারে মাথা হেলিয়ে আবার চোখ বোজেন। এই ভঙ্গিতে তিনি শুধু নিজেকে শান্তই করেন না, ভবিষ্যতের চিন্তাও করতে পারেন। মাথা হেলিয়ে দিলে মাথার মধ্যে নানা ভাবনা কাজ করে। দেখতে পান, সময় কত দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। পঁচিশের রাতে গণহত্যা শুরুর পরে ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে লুকিয়ে থাকা সাংবাদিক সাইমন ড্রিং তার রিপোর্টে লিখেছিলেন, ভোরের কিছু আগে গুলিবর্ষণ থেমে গেল এবং সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে এক ভীতিজনক নিঃশব্দতা শহরের ওপর চেপে বসল। ফিরে আসা দু-তিনটি ট্যাঙ্কের শব্দ, মাঝেমধ্যে কনভয়ের শব্দ ও কাকের চিৎকার ছাড়া সম্পূর্ণ শহর মনে হচ্ছিল পরিত্যক্ত এবং মৃত।
আকমল হোসেন শব্দ করে হাসলেন। নিজেকেই বললেন, এখন এই শহর কোলাহলে মুখর। গেরিলাদের পদচারণে জীবন পূর্ণ। এই শহরের অনেক বাড়ি দুর্গের ভূমিকা পালন করছে। যার যা আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করছে মানুষ। মানুষের হাতে অস্ত্র উঠেছে, পাশাপাশি মানুষের সাহস আছে, শরীর আছে, ত্যাগের মনোবল আছে। এ শহরে এখন কোনো কিছুরই অভাব নেই। শহর তার নতুন জীবন নিয়ে পূর্ণ শক্তিতে জেগে উঠেছে। একদিন এই শহরের বুনো ঝোপে লজ্জাবতী লতা পায়ে লেগে ফুলগুলো বুজে গেলে তিনি অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। কৈশোরের সেই দিনে বুনো ঝোপের সামনে বসে থেকে তিনি অপেক্ষা করেছিলেন ফুলের জেগে ওঠা দেখার জন্য। দুঃখ হয়েছিল এই ভেবে যে কেন তাঁর পা ওখানে গিয়ে লাগল। কিন্তু সেদিন ওখানে অনেকক্ষণ বসে থাকার পরও ফুলের জেগে ওঠা দেখতে পাননি। মন খারাপ করে ফিরে এসেছিলেন। মাকে ঘটনাটা বলার পর মা বলেছিলেন, বোকা ছেলে, মন খারাপ করবি না। এভাবে শিখতে হয়। শিখতে শিখতে বড় হতে হয়। যা, পুকুরে সাঁতার দিয়ে গোসল করে আয়। দেখবি সবকিছু ভালো লাগছে।
কৈশোরের পর পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় পার হয়ে গেছে। মায়ের কথা মনে হয়, দেখতে দেখতে শিখবি। হ্যাঁ, এখনো তার শেখার বয়স পার হয়নি। এখনো তিনি শিখছেন। এখন তাকে শেখাচ্ছে তরুণ প্রজন্ম। কেমন করে ছেলেরা মেয়েরা এক হয়ে লড়ছে।
তখন মারুফ ও মেরিনার কণ্ঠস্বর শুনতে পান তিনি। বুঝতে পারেন, মারুফের ঘুম ভেঙেছে। মেরিনা ঠিকই ভাইয়ের ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে কথা বলছে। ভাবলেন, মেরিনা যতই রাগ ঝাড়ুক, ভাইবোনের এই মধুর সম্পর্ক থেকে কেউ কাউকে আড়ালে রাখতে পারবে না। তিনি আবার নিজের কাজে মনোযোগী হলেন।
তখন মারুফের ঘরে দরজায় দাঁড়িয়ে মেরিনা দেখতে পায়, মারুফ বিছানায় বসে আড়মোড়া ভাঙছে। ওকে দেখে বলে, আয়।
