তিনি সামনে তাকিয়ে বললেন, পরদেশী যে মেয়েটির চিঠি দিয়ে গেছে, ওকে আমি দেখিনি। কিন্তু ওর ভাই শাকেরকে মারুফ চেনে! এমন একটি সূত্র আমার মনে হচ্ছে। চিঠির বর্ণনা থেকে এটা আমার মনে হয়েছে।
মারুফের বন্ধু? তুমি কি ওকে দেখেছ?
না, আমি ওকে দেখিনি। ও মারুফের ঠিক বন্ধু নয়, ওর পরিচিত। একসঙ্গে রাজপথে ছিল। মিছিলে ছিল। ২৭ তারিখে কারফিউ ভাঙলে আমি আর মারুফ ওই বাসায় গিয়েছিলাম। মারুফ বলেছিল, শাকেরের কাছে ওর কী একটা দরকার আছে। গিয়ে যা দেখেছিলাম, তা তোমাকে বলেছিলাম, আশা। তোমার বোধ হয় মনে আছে, আশা। জেনিফারের চিঠিটা পড়ে আমি বুঝতে পারছি, ও ওই পরিবারের মেয়ে হতে পারে। বর্ণনায় তেমন আভাস পাচ্ছি। মারুফকে জিজ্ঞেস করলে ও বলতে পারবে। মেয়েটিও মিছিলমিটিংয়ে যেত। নিশ্চয় মারুফের সঙ্গে দেখা হয়েছে। এই খবরটি কি মারুফকে দেওয়া ঠিক হবে?
না, এই মুহূর্তে একদমই না। সামনে ওরা অপারেশন করবে। ওদের এখন পিসফুল থাকা খুব দরকার।
আমিও ভাবছি যে জেবুন্নেসার চিঠিও ওকে এখন দেওয়ার দরকার নেই।
না, দরকার নেই। সময় বুঝে বিষয়টি ওকে জানাতে হবে।
দুজন হঠাৎ করে চুপ করে যান। মনে হয়, এখন আর তাঁদের জন্য কোনো কথা নেই। থেমে গেছে কোলাহল। জেনিফার নতুন করে উঠে এসেছে ওদের সামনে। বুকের ভেতর তোলপাড় হচ্ছে। জেনিফার আর ইহজগতের কথার মধ্যে নেই। ওকে অনুভব করার জন্য এখন নীরবতাই শ্রেষ্ঠ সময়।
বৃষ্টি ধরে এসেছে।
আলতাফ উঠেছে। টিপটিপ বৃষ্টির মধ্যে ছাতা নিয়ে জমে থাকা পানির মধ্যে হাঁটাহাঁটি করছে। বাতাসে উড়ে আসা পাতা কুড়িয়ে জড়ো করছে। বৃষ্টি ও জমে থাকা পানির মধ্যে কাজ করছে এমন একটি লোককে দেখে চোখ জুড়িয়ে যায় আকমল হোসেনের। ভাবে, ও বুঝি জেনিফারের অন্য আদল। নিঃশব্দ কর্মরত মানুষেরা এখন জেনিফারের অনুভবে ভাসিয়ে দেবে প্রান্তর। শহীদের আত্মা মুক্তিযুদ্ধের সময় যোদ্ধাদের কাছেই থাকবে। যেকোনো আদলে হোক না কেন, হবেই। একের মধ্যে বহুর প্রবেশ ঘটতে থাকবে অনবরত। একই রকম কাছাকাছি ভাবনা আয়শার ভেতরও ঘুরপাক খায়। মন্টুর মা উঠেছে। সামনে এসে একবার দেখা দিয়ে চলে গেছে। রান্নাঘরে রুটি বানানোর তোড়জোড় করছে। একসময় মেরিনা পেছনে দাঁড়িয়ে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে।
আপনারা বুঝি অনেকক্ষণ ধরে বৃষ্টি দেখছেন, আম্মা? আমাকে ডাকলেন না কেন? আমি এমন সুন্দর বৃষ্টি মিস করলাম।
আবার দেখতে পাবি। মনে হচ্ছে, এবারের বর্ষা আমাদের ঢেলে বৃষ্টি দেবে।
ঠিক আছে, বৃষ্টি পাইনি, কিন্তু বৃষ্টির জমানো পানি তো পেলাম। যাই, হেঁটে আসি।
মেরিনা স্যান্ডেল খুলে রেখে প্রাঙ্গণে নেমে যায়। দুই পায়ে পানি ছিটায়। ছোটাছুটি করে। কাপড় ভেজে, চোখমুখ চুল ভেজে কিন্তু ভ্রুক্ষেপ করে না। ওকে এই অবস্থায় দেখে আকমল হোসেন এবং আয়শা খাতুন একসঙ্গে ভেতরে ভেতরে চমকে ওঠেন। ভাবেন, মেরিনা নয়, ওখানে জেনিফার দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু পরস্পর কাউকে কিছু বলে না। ভাবে, বুকের ভেতরের কথা ভেতরেই থাক। ওখান থেকে চেঁচিয়ে মেরিনা জিজ্ঞেস করে, আম্মা, ভাইয়া উঠেছে?
ওঠেনি। জেগে শুয়ে আছে কি না, তা তো জানি না।
কাল রাতে ভাইয়া আমার সঙ্গে কথা বলেনি। ভাবখানা এমন করেছে, যেন আমার সঙ্গে আড়ি আছে। এমন ব্যবহার করলে আমিও নিজের ঘরের দরজা আটকে বসে থাকব। কেউ কারও চেহারা দেখব না।
বারান্দা থেকে ওর এ কথায় মা-বাবা কেউই সাড়া দেয় না। মেরিনা আবার বলে, আমি বুঝলাম না যে ভাইয়ার কী হয়েছে। বাড়িতে এসেই নিজের ঘরে ঢুকতে চাইল কেন। জেবুন্নেসার কোনো খবর ওর কানে পৌঁছায়নি তো? কে জানে! মেরিনা হাত উল্টে আবার পানি ছিটাতে শুরু করে। কিছুক্ষণ পানিতে খেলে বারান্দায় উঠে আকমল হোসেনকে জিজ্ঞেস করে, আব্বা, জেবুন্নেসার কথা কি ভাইয়াকে বলব?
না, মা। ওকে এখন মানসিকভাবে ডিস্টার্ব করা ঠিক হবে না। আমিও তা-ই ভাবছি। ঠিক আছে, পরের বার এলে কথাটা বলা যায় কি না, তা-ও আমাদের ভেবে দেখতে হবে।
আমি দেখি তো ছেলেটি উঠল কি না। আয়শা খাতুন বারান্দা ছেড়ে করিডর পার হয়ে নিঃশব্দে মারুফের ঘরে ঢুকলেন। দেখলেন, মারুফ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। মায়ের পায়ের শব্দ ওর ঘুম ভাঙাতে পারেনি। সে জন্য তিনি আর ওকে ডাকলেন না। বেরিয়ে এসে মেরিনাকে বললেন, ও গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। আমি ডাকিনি।
আকমল হোসেন মেরিনার দিকে তাকিয়ে বললেন, না ডেকে ভালোই করেছে রে তোর মা। তুই ভিজে আছিস। কাপড় বদলে ফেল। ঠান্ডা লেগে যেতে পারে।
ঘড়ির কাঁটা এগারোটা ছুঁই-ছুঁই। মারুফ এখনো ডাইনিং টেবিলে আসেনি। হয়তো গোসল করছে কিংবা ঘুমিয়েই আছে। কে জানে!
আয়শা খাতুন নাশতার টেবিলে গালে হাত দিয়ে বসে থাকেন! ফ্রিজ থেকে নানা খাবার বের করে টেবিলে দিয়েছেন। শুধু পরোটা বানিয়ে রাখা হয়েছে। তিনি ভাঁজতে নিষেধ করেছেন। এখন ছেলের জন্য অপেক্ষার পালা। ভালোই লাগছে অপেক্ষা করতে। যেমন অপেক্ষা করেছিলেন ওর জন্মের। গর্ভের নয় মাস অপেক্ষার প্রহর গোনা। এখন একটি নতুন জন্মের অপেক্ষা তাঁর সামনে। স্বাধীন দেশ। সেই ছেলেটি সেই মেয়েটি একই জন্মের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করেছে। জীবন বাজি রেখে যুক্ত করা। আহ্, কী আনন্দ! আয়শা খাতুন শুনতে পান বুকের ভেতর গুনগুন ধ্বনি। তবে সেটা এই মুহূর্তে মুখে আসে না।
