হ্যাঁ, তাই। এখনই তার যাত্রা শুরু।
আয়শা টেবিলের মাঝখান থেকে চিঠি আর ছোট খাতা উঠিয়ে নিয়ে বলেন, লেখার কাজ কি এখনই গোছাবে? এখনই গোছাতে শুরু করো। সময় নষ্ট করা উচিত নয়। আমরা নিজেরাই বা কয়দিন বাঁচব।
ইতিহাস অনেক কঠিন, আয়শা। এখনই ধরব না। এখন আমি তোমাকে বুকে জড়িয়ে রেখে এই গানটি আবার শুনব। শেষ দুই লাইন তোমার সঙ্গে আমি গাইব।
আয়শা খাতুন একসঙ্গে হাত ধরে শোবার ঘরে ঢুকতে ঢুকতে গাইতে শুরু করেন শেষ থেকে–
দিন-অন্তে অপরাজিত চিত্তে
মৃত্যুতরণ তীর্থে কর স্নান॥
আকমল হোসেন সুরের কথা মনে রাখেন না। আয়শার সঙ্গে গাইতে থাকেন। তিনি জানেন, তিনি গায়ক নন। তিনি ওস্তাদের কাছে গান শেখেননি। কিন্তু তাঁর কাছে এক অলৌকিক আবেগ। এই একই আবেগ দিয়ে তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র শোনেন। বেতার কেন্দ্র থেকে ভেসে আসা যুদ্ধের খবর সুরের মতো পূর্ণ করে তার ভেতরের সবটুকু। একসময় তিনি টের পান, আয়শা থেমে গেছেন। গাইছেন তিনি একা। তার বুকের ভেতর মুখ গুঁজে রাখা আয়শার মাথার ওপর নিজের থুতনি ঠেকিয়ে তার বুকের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে শব্দরাজি–
নিষ্ঠুর সংকট দিক সম্মান।
দুঃখই হোক তব বিত্ত মহান…কর অমৃতলোকপথ অনুসন্ধান…
মৃত্যুতরণ তীর্থে কর স্নান॥
আকমল হোসেনের গান থামলে আয়শা মৃদুস্বরে বলেন, আমাদেরই বুকের ভেতরের গান। আমাদের সময়। আমাদের জীবন। আমি চিৎকার করে বলতে চাই, এই গান রবীন্দ্রনাথ লেখেননি। হাজার বছর ধরে এই গান আমাদের বুকের ভেতরেই ছিল। এখন সময় হয়েছে বুক উজাড় করে গাইবার।
আকমল হোসেন দুহাতে আয়শাকে জড়িয়ে ধরে বলেন, এই গানে শহীদদের স্মরণ করলে। তোমাকে আমার বুকভরা ভালোবাসা। আমরা চিরকাল আমাদের শহীদদের স্মরণ করব।
আয়শা কথা বলতে পারেন না। চোখের জল মোছেন না। গাল বেয়ে গড়াতে দেন। সেই জল মুছে যায় আকমল হোসেনের গায়ের জামায়। তারপর সেটা ঢুকে যায় বুকের ভেতরে। দুজনেই অনুভব করে যে বড় কঠিন এই বেঁচে থাকা। আর কতটা পথ একসঙ্গে যাবেন, কেউ তা বলতে পারে না।
টানা বৃষ্টিতে বাড়ির সামনে পানি জমে গেছে। ভোর থেকে একটানা ঝরছে। এমন বৃষ্টি কখন শুরু হয়েছে, তা টের পাননি আকমল হোসেন। আয়শা খাতুনও। বোঝা যায়, শেষ রাতের দিকে দুজনেরই গাঢ় ঘুম হয়েছিল।
এখন তাঁরা বারান্দায় বসে বৃষ্টি দেখছেন। দুজনই প্রবল বৃষ্টি উপভোগ করেন। আকমল হোসেন বলেন, এ বছরের বৃষ্টি আমাদের পক্ষে। আজ যে বৃষ্টি দেখছি, এটা শুধু বৃষ্টি দেখার আনন্দ না, যুদ্ধে জেতার আনন্দও। পাকিস্তানি সৈনিকেরা পাহাড় আর শুকনো মাটির দেশের লোক। ওদের মরুভূমিও আছে। বৃষ্টি ওদের আতঙ্ক, আয়শা। আমাদের মতো বৃষ্টিপাগল লোক না ওরা।
ঠিক বলেছ। পাকিস্তানি সেনারা তো বৃষ্টির মেজাজ বোঝে না। বৃষ্টিকে আপন করতেও জানে না। বৃষ্টি ওদের জন্য বাধা। আমাদের জন্য সহায়ক। এই বৃষ্টির সহায়তায় আমরা এগিয়ে যেতে পারব।
দুজন হঠাৎ করেই চুপ করে যায়। ঘুম ভাঙার পর থেকেই দুজন বারান্দায়। বাড়িটা এ মুহূর্তে সুনসান।
এ বাড়ির আরও চারজন বাসিন্দা এখনো ঘুম থেকে ওঠেনি। গত রাতে মারুফ বাড়িতে এসেছে। ঢাকায় ঢুকেছে এক দিন আগে। বিভিন্ন হাইডে ছিল। এটি গেরিলাযুদ্ধের কৌশল। এভাবে যুদ্ধের সময়কে মানতে হয়। নিয়মমাফিক যেটুকু ঘটবে, সেটুকুকেই মানতে হবে। বাড়াবাড়ি চলবে না। কম করাও চলবে না।
আয়শা খাতুন উঠতে উঠতে বলেন, দেখি, ছেলেটা ঘুম থেকে উঠল কি। ও তো এক দিনের বেশি থাকবে না।
আকমল হোসেন আয়শা খাতুনকে বাধা দিয়ে বলেন, ওকে ঘুমাতে দাও। এই বৃষ্টিভেজা সকালে ঘুমের আলাদা মজা আছে।
ঘুমের মধ্যে কি মজা উপভোগ হয়?
হয়, আশা। ঘুম ভাঙলে ও গাঢ় ঘুমের আনন্দ টের পাবে। তা ছাড়া ওর বোধ হয় ঘুম দরকার ছিল। দেখলে না, কালকে বাড়িতে এসেই ঘুমোতে চাইল। আমাদের সঙ্গে খুব একটা কথা না বলে সোজা চলে গেল নিজের ঘরে। কোনো কারণে ও হয়তো টায়ার্ড ছিল।
আয়শা শ্বাস ফেলে বললেন, হ্যাঁ, কত দিন পরে ফিরল, কিন্তু আমাদের সঙ্গে ঠিকমতো কথাও বলল না।
তুমি মন খারাপ করেছ?
একটু তো মন খারাপ হয়েছেই।
ছেলেমানুষি। ভুলে যাও কেন যে আমরা যুদ্ধের সময়ে আছি! তুমি মন খারাপ করতে পারো না, আশা। তুমি মন খারাপ করলে আমারও মন খারাপ হবে।
বৃষ্টির সঙ্গে বাতাসের বড় ঝাপটা আসে। দুজনের গায়েই বৃষ্টি লাগে। আয়শা খাতুন হাত উঠিয়ে মুখ মোছেন। আর আকমল হোসেন মাথা ঘুরিয়ে ঘাড়ের কাছে জামার কলারে মুখ ঘষে নেন।
গত রাত ১০টার দিকে বাড়ি ফিরে মারুফ সোজাসুজি আকমল হোসেনের সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিল, আব্বা, কাল সকালে কথা বলব। মাকে বলল, আমি ঘুমাব, আম্মা। কেউ ডাকবে না আমাকে।
খাবি না? খিদে পায়নি? এক গ্লাস পানি তো খাবি?
না আম্মা, এখন কিছু খাব না। পানিও না। পেটে যা আছে, তাতে রাত চলে যাবে।
আয়শা খাতুন ছেলের কথা আর না ভাবার জন্য আকমল হোসেনকে বললেন, তুমি চা খাবে?
না। দরকার নেই। একবারে নাশতা খাব। তোমার সঙ্গে একটা বিষয় আমার আলাপ করা দরকার, আশা। কাল আমি বিষয়টি তোমাদের বলিনি। আমার খুব মন খারাপ ছিল।
কী ব্যাপার, বলো তো?
আয়শা খাতুন ভুরু কুঁচকে তাকান। পঁচিশের রাতের পর থেকে আকমল হোসেন নিজে নিজে মনে রেখেছেন এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। সব ঘটনাই তো দুজনের জানা আছে। এখন কী হলো? নতুন কিছু? তাই হবে হয়তো।
