কাজ? হ্যাঁ, অনেক কাজ। প্রথম কাজ শহীদদের জন্য মিলাদ করতে হবে। ফকির খাওয়াতে হবে। কাল একটি কুলখানির আয়োজন হবে এই বাড়িতে। আমাকে নিয়ে তোমার ভয় নেই, আশা। আমি ঠিকই আছি। চলো, ঘরে চলো।
তিনি আয়শা ও মেরিনার হাত ধরে সিঁড়িতে পা রেখে পেছনে তাকান। দেখতে পান আলতাফের হাতের দুটো বাজারের ব্যাগের একটি মন্টুর মা নিয়েছে। ওরা ঠিক তার পেছনেই আছে।
আয়শা খাতুন হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলেন, আমি রান্নাঘরে যাচ্ছি। তোমরা ড্রয়িংরুমে বসো।
আকমল হোসেন বারান্দায় দাঁড়িয়ে আলতাফকে বলেন, পুরো বাড়ির বাতিগুলো জ্বালিয়ে দে তো রে। ঘরের কোথাও কোনো অন্ধকার যেন না থাকে।
মেরিনা হেসে বলে, তাহলে মোমবাতি জ্বালাতে হবে, আব্বা। ঘরের কোনা-ঘুপচিতে মোমবাতি দিতে হবে।
হ্যাঁ, দিতে হবে। হাজার হাজার মোমবাতি–
বলতে বলতে আকমল হোসেন ড্রয়িংরুমে ঢোকেন। ফোন বাজে। তিনি দ্রুত হেঁটে গিয়ে ফোন ধরেন। মারুফের ফোন।
আব্বা, আমি কিছুক্ষণ আগে ঢাকায় এসেছি। সামনে একটি অপারেশন আছে। ধানমন্ডির ২৮ নম্বরে আছি। আগামীকাল বাড়িতে আসব। আম্মাকে সালাম দেবেন।
মেরিনা কাছে এসে দাঁড়ায়।
ভাইয়ার ফোন?
হ্যাঁ রে। ও ঢাকায় এসেছে। সামনে ওর অপারেশন আছে।
এবারও কি বাড়িতে আসবে না?
কাল আসবে বলেছে। বলেছে তো, শেষ পর্যন্ত আসতে পারবে কি না কে জানে!
ভাইয়াকে মাত্র দেড় মাস দেখিনি। অথচ মনে হয়, ভাইয়া গত দশ বছর ধরে বাড়িতে নেই।
তোর মা কী করছে? এখন তো বেশি রান্নার দরকার নেই। টেবিলে একটা কিছু দিলেই হয়। ডাল-ভাতেও আমার আপত্তি নেই।
দেখি, মা কী করছেন। রান্নাঘর নিয়ে মায়ের নানা চিন্তা থাকে।
মেরিনা চলে গেলে আকমল হোসেন সোফায় বসেন। আবার পরদেশী তাঁর মাথায় ঢোকে। পুলিশ লাইনের সুইপারদের একজন সরাসরি বলেনি, কিন্তু জানিয়ে গেল, শহীদদের তালিকা করতে হবে। স্বাধীনতার জন্য প্রাণদানকারী মেয়েরা—ওদের ইতিহাস লিখতে হবে। ওদের নামের তালিকা সংরক্ষণ করতে হবে। পরদেশী ইতিহাসের উপাদান নিয়ে এসেছে তার কাছে। স্বাধীনতার পর লিখতে হবে এই সব মেয়ের আত্মত্যাগের কথা। আকমল হোসেনের বুক চেপে আসে। তিনি সেন্টার টেবিলের ওপর যত্ন করে কাগজগুলো রাখেন। এই ঘরে সবাই এলে মেরিনাকে বলবেন জেনিফারের চিঠিটা পড়তে।
একটু পর আয়শা খাতুন সবাইকে নিয়ে প্রজ্বলিত মোম হাতে ঘরে আসেন। পুরো বাড়ির বিভিন্ন জায়গা খুঁজে পঁচিশটি মোম পাওয়া গেছে। আলতাফ দোকান থেকে নতুন মোম আনতে চেয়েছিল। আয়শা রাজি হননি। বলেছেন, আজকে ঘরের সবটুকু থেকে। এরপর ওদের স্মরণে আবার এই বাড়িতে মোম জ্বলবে। সবাই এসো আমার সঙ্গে। আজ ঘরের মোমবাতি দিয়ে স্মরণসভা।
আকমল হোসেন ওদের দেখে দাঁড়িয়ে পড়েন। আয়শা খাতুন এমনই। রান্নার জন্য নয়, মোম জ্বালানোর জন্য রান্নাঘরে গিয়েছিলেন। কতকাল ধরে দুজনে সংসার করছেন। এভাবে আয়শা খাতুন প্রায়শ নতুন করে তোলেন সময়ের পরিধি। যে পরিধি স্মৃতির কোঠায় সঞ্চিত হয়।
তিনি মেরিনার হাত থেকে তিন-চারটে মোম নিয়ে সেন্টার টেবিলে রাখেন। সবাই তার চারপাশে গোল হয়ে বসে। মাঝখানে পরদেশীর দিয়ে যাওয়া চিঠি ও রাবেয়ার দেওয়া ছোট খাতা মোমের আলোয় উজ্জ্বল হয়ে থাকে।
কিছুক্ষণ পর জেনিফারের চিঠিটা মেরিনাকে পড়তে বলেন আকমল হোসেন। ও থেমে থেমে চিঠিটা পড়ে। পড়া শেষ হলে আকমল হোসেন বলেন, আবার পড়।
মেরিনার কণ্ঠস্বর থমথম করে। কখনো ওর গলা আটকে যায়। আয়শা খাতুন গুনগুন ধ্বনিতে ভরাতে থাকেন ঘর–
শুভ কর্মপথে ধর নির্ভয় গান
সব দুর্বল সংশয় হোক অবসান
আকমল হোসেন চমকে আয়শার দিকে তাকান। বলতে চান, তুমি কি মৃত্যুর পথকে শুভ কর্মপথ বলছ? কিন্তু জিজ্ঞেস করা হয় না। সুর ও বাণী এক হয়ে তীব্র হয়ে ওঠে–
চির-শক্তির নিঝর নিত্য ঝরে
লহ সে অভিষেক ললাট পরে।
তব জাগ্রত নির্মল নূতন প্রাণ
ত্যাগব্রতে নিক দীক্ষা,
বিঘ্ন হতে নিক শিক্ষা–
নিষ্ঠুর সংকট দিক সম্মান।
দুঃখই হোক তব বিত্ত মহান।“
চল যাত্রী, চল দিনরাত্রি–
কর অমৃতলোকপথ অনুসন্ধান।
জড়তাতামস হও উত্তীর্ণ,
ক্লান্তিজাল কর দীৰ্ণ বিদীর্ণ–
দিন-অন্তে অপরাজিত চিত্তে
মৃত্যুতরণ তীর্থে কর স্নান॥
মেরিনার চিঠি আর শেষ করা হয় না। ও কান পেতে গানের বাণী শোনে। আয়শা খাতুন শেষের দুটো লাইন বারবার গাইতে থাকেন–
দিন-অন্তে অপরাজিত চিত্তে
মৃত্যুতরণ তীর্থে কর স্নান॥
একসময় গুনগুন ধ্বনি থামে। আয়শা সোফায় চোখ বুজে মাথা হেলিয়ে রাখেন। মেরিনা কাছে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে বলে, আম্মা, চিঠির শেষ আপনি এভাবে বড় করে দিলেন যে, আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারছি না। আমার কাছে জেনিফারদের মৃত্যু নাই।
মেরিনা কেঁদেকেটে নিজের ঘরে চলে যায়। ও চলে গেলেও আকমল হোসেন ও আয়শা খাতুনের মনে হয়, ঘর খালি হয়নি। মেরিনা জেনিফারদের মৃত্যু নেই বলার পরপরই ঘরে একজন ঢুকছে ও বেরিয়ে যাচ্ছে। ঘরের যেদিকে তাকায় তাদের মনে হয় সব জায়গায় কেউ না কেউ দাঁড়িয়ে আছে। কোথাও কোনো শূন্যতা নেই।
আকমল হোসেন আয়শার হাত ধরে বলেন, এসো। নিজেদের ঘরে যাই।
চলো। আয়শা আকমল হোসেনের হাত ধরেন। ধরেই থাকেন। ছাড়েন না। যেন গভীর উষ্ণতা ছড়িয়ে দিতে চান আকমল হোসেনের শরীরের সর্বত্র। যৌবনের উষ্ণতা নয়। এক অন্য রকম উষ্ণতা এই পঞ্চাশোর্ধ্ব জীবনের, যে উষ্ণতার তল খুঁজে পাওয়া কঠিন। আকমল হোসেন সেই উষ্ণতায় অভিভূত হয়ে নিজের হাতটি তার ডান হাতের ওপর রাখেন, যে হাত আয়শা ধরে আছেন। গভীর কণ্ঠস্বরে বলেন, আয়শা, আমাদের শেষ জীবনটুকু এভাবেই পার হবে। পরস্পরের এমন নিবিড় মগ্নতায়।
