পরদেশী দুহাতে চোখ মোছে। তার কাঁচা-পাকা চুল কপালের ওপর এসে পড়ে। মেরিনা কাছে গিয়ে ওর হাত ধরে বলে, পরদেশী দাদা, আপনি একটু বসেন। এক গ্লাস জল খান।
হ্যাঁ, জল খাব, দিদিমণি। বুকে বড় জ্বালা। জ্বালা সইতে পারি না।
পরদেশী সিঁড়ির কাছে রাখা মোড়ার ওপর বসে। দুহাত কোলের ওপর জড়ো করে রাখে। মেরিনা নিজেই এক গ্লাস পানি আর দুটো সন্দেশ নিয়ে আসে ওর জন্য। পরদেশী হাত বাড়িয়ে পিরিচটা নেয়। আগ্রহ করে খায়। মেরিনা বুঝতে পারে, খেতে ওর ভালো লেগেছে। ওর হাত থেকে পিরিচটা নিয়ে পানির গ্লাসটা ওকে দেয়। ও গ্লাস শেষ করে বলে, আরও এক গ্লাস।
আয়শা খাতুন পেছন থেকে বলেন, তুই দাঁড়া, মেরিনা। আমি জগ ভরে পানি আনছি। ওর যে কয় গ্লাস ইচ্ছা, সে কয় গ্লাস খাবে। বুঝতে পারছি, অনেকটা পথ ও বোধ হয় হেঁটে এসেছে।
হ্যাঁ মাইজি, ঠিক। বাসে উঠতেও ভয় পেয়েছি। ভেবেছি, যদি ভিড়ের মধ্যে চিঠিটা হারিয়ে যায়। কেউ যদি বলে, তোর বুকের মধ্যে কী লুকিয়ে রেখেছিস। বের কর। তাহলে আমি মা-ঠাকরুনদের কাছে কী জবাব দেব?
আয়শা খাতুন একমুহূর্ত পরদেশীকে দেখেন। তাঁকে পানি আনতে যেতে হয় না। মন্টুর মা ততক্ষণে এক গ্লাস পানি এনে পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি গ্লাসটা নিয়ে পরদেশীকে দেন। পরদেশী মাথা নুইয়ে গ্লাস নেয়। মাথা নিচু করে গ্লাসের পানি শেষ করে।
যাই, মাইজি।
আপনি কি যুদ্ধে যাবেন, পরদেশী দাদা?
না। পরদেশী মোড়া থেকে উঠে দাঁড়িয়ে মেরিনার প্রশ্নের উত্তর দেয়। তারপর পা বাড়াতে গিয়েও ফিরে দাঁড়িয়ে বলে, পুলিশ লাইনের ব্যারাকের ঘরে ঘরে আটকে রাখা মেয়েদের সুইপার আর ডোমরাই তো দেখছে। ওদের তো দেখার আর কেউ নেই। আমরা না থাকলে যেটুকু ছায়া আছে, তা-ও থাকবে না।
ও চোখ মোছে। ওর কাঁচা-পাকা চুলের ওপর এসে বসে পোকা। আয়শার মনে হয়, ওর কথা শুনে পোকাটি এসে ওর সহমর্মী হয়েছে। যখন কারও জন্য কেউ থাকে না, তখন তার সঙ্গে মানুষ আর পোকা এক জায়গায় জড়ো হয়। এটাই বোধ হয় যুদ্ধের নিয়তি।
পরদেশী চুলের ভেতর হাত ঢুকিয়ে এলোমেলো করে দিয়ে বলে, যাই দিদিমণি।
সেলাম, মাইজি।
তুমি বেঁচে থাকো, পরদেশী, এই আশীর্বাদ করি।
এতক্ষণ আকমল হোসেন কোনো কথা বলেননি। পরদেশীকে দেখেছেন, সময়ের সঙ্গে বোঝাপড়া করেছেন, সামনে কী কাজ করবেন, তা ভেবেছেন। ঘুরেফিরে পরদেশী তার সবটুকু বোধ নিয়ে তাঁর সামনে একজন বড় মানুষের অবয়বে দাঁড়িয়ে ছিল এতক্ষণ। যাবার সময় আকমল হোসেন ওর ঘাড়ে হাত রাখেন।
সাবধানে থেকো। বিপদ যেন তোমাকে ছুঁতে না পারে। রাবেয়াকে বলল, এখন থেকে ওকে আমরা জয় বাংলা ডাকব।
আমি আবার আসব, হুজুর। আপনাদের এখানে এলে অনেক শান্তি পাই। আজ ভেবেছিলাম, এই বাড়িতে দাঁড়াতেই পারব না। দেখলাম, কেমন করে যেন আমার থাকা কেমন হয়ে গেল। যাই, হুজুর।
আমি জানি, তুমি বারবার আসবে। তুমি আমাদের কাছে শহীদের তালিকা নিয়ে আসবে।
ও প্রবলভাবে ঘাড় নাড়ায়। তারপর নত হয়ে বলে, সেলাম, হুজুর।
আকমল হোসেন ওকে গেট খুলে দেন। ও যতক্ষণ ফুটপাত ধরে হেঁটে যায় তাকিয়ে থাকেন তিনি। দেখেন, ওর পায়ের গতিতে তীব্রতা আছে। ও একমুহূর্তে দৌড়ে আসতে পারে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া। সারা দেশে যুদ্ধ।
গেট বন্ধ করে প্রাঙ্গণে দাঁড়ালে বুঝতে পারেন বাড়িটা মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেছে। তিনিও ঘরে যেতে পারছেন না। দাঁড়িয়ে থাকেন। বারান্দার ওপরে দাঁড়িয়ে আছেন আয়শা খাতুন। সিঁড়ির রেলিংয়ের মাথায় বসে আছে মেরিনা। মন্টুর মা নিচে নেমে এসেছে। আলতাফের ঘরের কাছাকাছি আতাগাছটার নিচে দাঁড়িয়ে আছে। আলতাফ বাড়ির বাইরে। এক্ষুনি চলে আসবে।
কারও মুখে কথা নেই। কথা আসে না। পরদেশী এখনো এ বাড়িতে দাঁড়িয়ে আছে যেন, আর তারা বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে দেখছে এ বাড়ির গেরিলাযোদ্ধাদের মতো আরেকজন যোদ্ধাকে। তার উচ্চারণ স্পষ্ট। তার কাজের ক্ষেত্র নির্বাচন একরৈখিক। বুঝে গেছে, স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধের কত মাত্রা তৈরি হয়। কীভাবে সেখানে নিজেকে সংযুক্ত করতে হয়। কোনটা করলে যুদ্ধের সময়কে মূল্যায়ন করা হবে। সময়কে ঠিকমতো ধরা হবে এবং সময়ের অগ্রগতিতে নিজের হাত মেলানো হবে।
স্তব্ধতা ভাঙে মেরিনা।
ও সিঁড়ির শেষ ধাপের মাথায় বসে ছিল। উঠে আকমল হোসেনের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়।
আব্বা। আব্বা–
মেয়ের ডাকে চমকে তাকান তিনি। তাকিয়েই থাকেন। ভাবেন, বন্দী করে রাখা কোনো মেয়ে তাকে খুঁজে ফিরছে। শয়তানগুলো যখন তাকে তুলে নিয়ে যায়, তখন তো বাবার কাছ থেকে বিদায় নেওয়া হয়নি। ও এখন বাবাকে ডাকছে। বাবার কাছ থেকে বিদায় না নিয়ে তো যাওয়া যায় না।
কিছু বলবি, মা? মন খারাপ লাগছে?
ঘরে চলেন। বাইরে আর দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না।
সন্ধ্যা হোক। বাইরের আলোটা খুব ভালো লাগছে রে।
আলো? আললা কোথায়, আব্বা? সন্ধ্যা হয়ে গেছে।
আলোই তো দেখছি আমি। পরদেশী যে আলো রেখে গেল আমাদের জন্য, সে আলোর কথা বলছি।
আয়শা খাতুন নিচে নেমে আসেন। গেট খুলে আলতাফ ঢোকে। মন্টুর মা দুপা এগিয়ে এলে ঘরের মানুষদের একটি দল হয়ে যায়। আকমল হোসেন আবার বলেন, পরদেশী এখনো আমাদেরকে ছেড়ে যায়নি, মা। আমি যেদিকে তাকাচ্ছি, সেদিকেই ওকে দেখতে পাচ্ছি।
আয়শা খাতুনের মনে হয়, আকমল হোসেন এখনো ঘোরের মধ্যে আছেন। তিনি দ্রুত কণ্ঠে বলেন, শোনো, পরদেশী ঠিকই চলে গেছে। এখন আমাদের অনেক কাজ।
