জড়ো হয়ে থাকা মেয়েরা আলাদা হয়। ঘরের মধ্যে ছড়িয়ে যায়। রাবেয়ার মুখখামুখি হয়ে তিন-চারজন একসঙ্গে ডাকে, খালা।
ও কারও দিকে না তাকিয়ে বলে, বল। তোদের মনে যত কথা আছে তার সব বলে ফেল।
আমরাও মরণ চাই। বিষ দাও। সবাই একসঙ্গে চেঁচিয়ে বলে, আমরা বিষ খাব।
রাবেয়া চোখ গরম করে বলে, বিষ! তোদের জন্য তো আমি ছুরি এনে রেখেছি। প্রথমে ওদের পেটে ঢুকাবি। পরে নিজের পেটে। পারবি না?
পারব তো। তুমি তো ছুরি দাও না। এনে রেখেছ বলছ। কিন্তু আমাদেরকে দাও না।
পরদেশীকে দিয়ে ছুরি আনিয়েছি। ওটা ড্রেনের ভেতরে মাটিতে গেঁথে রেখেছি। তোরা একটি ছুরি দিয়ে একজনকে মারবি। ওরা ব্রাশফায়ার করে মারবে দুই শ জনকে। সুইপার-ডোমদেরও ছাড়বে না। বল, আমি কী করব?
আমাদেরকে ছুরি দাও। তোমাকে আমাদের একটাই কথা। ছুরি দাও। শুধু শুধু মরব কেন? মেরে মরব। জীবনের দাম অনেক। সেই জীবন বৃথা যাবে না।
ঘরের সব মেয়ে একসঙ্গে চেঁচিয়ে ওঠে। ঘন হয়ে বসে। পরস্পর হাত ধরে। কেউ কেউ রাবেয়ার গা ঘেঁষে বসে। রাবেয়া ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে। কাঁদতে কাঁদতে বলে, তোরা এভাবে মরতে চাস?
চাই। এক শ বার চাই। হাজার বার চাই।
আমরা তো ইচ্ছা করে এখানে আসিনি। আমাদেরকে জোর করে আনা হয়েছে। জোর করে আনার প্রতিশোধ আমরা নেব।
আমাদের স্বাধীনতা চাওয়ার জন্য এটা আমাদের শাস্তি।
ওদের নির্যাতন সহ্য না করে আমরা স্বাধীনতার জন্য মরতে চাই।
মৃত্যুই যদি শেষ কথা হয়, তাহলে মরব না কেন?
তখন ব্যারাকের সামনে সশব্দে গাড়ি থামে। সিঁড়িতে বুটের দুপদাপ শব্দ শোনা যায়। সঙ্গে মেয়েদের আর্তচিৎকার। দশ-বারো জন মেয়েকে টেনেহিচড়ে হেডকোয়ার্টারের দোতলায় ওঠানো হচ্ছে। ওরা হাত-পা ছুড়ছে, চিষ্কার করছে। রাবেয়া বারান্দায় এসে দাঁড়ালে দেখতে পায়, ওদেরকে পশ্চিম দিকের একটি ঘরে ঢোকানো হচ্ছে। ধাক্কা মেরে ঢুকিয়ে দিয়ে তালা দেওয়া হয় ঘরে।
তারপর ইশারায় রাবেয়াকে খেয়াল রাখার কথা বলে নেমে যায় ওরা। ও বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখতে পায়, দূরে দাঁড়িয়ে আছে পরদেশী। অন্য একদিকে লালু ডোম। দূরে দূরে দাঁড়িয়ে আছে অন্যরা। তারা আবার অল্পক্ষণে সরে যায়। জানে, দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে পিটুনি খাবে। রাবেয়াও থামের আড়ালে নিজেকে সরিয়ে রাখে। মাথা ঠেকিয়ে রাখে থামের গায়ে। দুহাত পেছনে মুষ্ঠিবদ্ধ করে রাখে।
বিকেলে পরদেশী রাবেয়াকে বলে, আমি ঠিক করেছি, জেনিফারের চিঠিটা আমি হাটখোলার বাড়িতে পৌঁছে দেব। জেবুন্নেসার চিঠিটা যে বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছিলাম, সেই বাড়িতে।
ওখানে কেন দিবি?
ভেবে দেখলাম, ওদের খবরগুলো এক জায়গায় একটা বাড়িতে জমা থাকুক।
ঠিক বলেছিস। তাহলে কালকে যা।
কাল কেন? আজই যাব।
কতজন এই পুলিশ লাইনে মারা গেছে, কতজনকে ধরে আনা হয়েছে, তার একটা খাতা আমার কাছে আছে না? আমি সেই খাতাও ওদের কাছে দিতে চাই। একদিন এসব কথা বলতে হবে না, পরদেশী?
দেশ স্বাধীন হলে তো বলতেই হবে। আমরা তো এই যুদ্ধের সাক্ষী। জেনিফারের চিঠিটা কই?
এইখানে। রাবেয়া হাত দিয়ে কোমরে গুঁজে রাখা চিঠির জায়গা দেখায়।
নিমেষে চমকে ওঠে দুজনেই। নতুন ধরে আনা মেয়েদের আর্তচিৎকার ছড়াতে থাকে চারদিকে। তখনো রোদ ফুরোয়নি। দিন শেষ হয়নি। আঁধার ঘনায়নি। তার পরও কেন মানুষের জীবনে অন্ধকার? কারণ, চারদিকে যুদ্ধ।
০৬. পরদিন হাটখোলার বাড়িটির সামনে
পরদিন হাটখোলার বাড়িটির সামনে পরদেশী এসে দাঁড়ালে আকমল হোসেনই ওকে প্রথমে দেখতে পান। প্রথমে চমকে ওঠেন তিনি। ভাবেন, নিশ্চয় কোনো খবর নিয়ে এসেছে পরদেশী। নাকি যুদ্ধে যাবে বলে ঠিক করেছে? তিনি দ্বিধায় পড়ে যান। গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। গেটটা অর্ধেক ফাঁক করে আলতাফ বেরিয়ে গেছে। ও বাজারে গেছে। ওর দেরি হচ্ছে কেন চিন্তা করে তিনি এখানে এসে দাঁড়িয়েছেন মাত্র। ইদানীং আলতাফকে তার ভয় হয়। মনে হয়, যেকোনো সময় বাড়ি থেকে পালিয়ে চলে যাবে। ওর মতিগতি তেমনই লাগে। আলতাফকে হারানোর কথা মনে হলেই তিনি অস্থির হয়ে যান। তাকে ছাড়া তাঁর পক্ষে একা এই অস্ত্রাগার পাহারা দেওয়া কঠিন। অস্ত্র রক্ষণাবেক্ষণও সহজ হবে না।
পরদেশী কাছে এসে বলে, সেলাম হুজুর। কেমন আছেন, হুজুর? আমি আপনার কাছে আবার এসেছি।
আকমল হোসেন গেট ফাঁক করে বলেন, ভেতরে চলে এসো, পরদেশী। তুমি কেমন আছ?
আমরা ভালোই আছি। যুদ্ধ করছি। যুদ্ধ করা সহজ কাজ না। খুবই কঠিন। এই আপনি যেমন যুদ্ধ করছেন তেমন। আপনার স্বাস্থ্য খারাপ হয়েছে। চুল সাদা হয়ে গেছে অনেক।
পরদেশী গেটের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলে। আজ ও এখান থেকেই চলে যাবে।
পরদেশীকে দেখে এগিয়ে আসেন আয়শা খাতুন আর মেরিনা। পরদেশী বারান্দার সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে বলে, একটা চিঠি এনেছি। দাও। আকমল হোসেন হাত বাড়িয়ে চিঠি নেন। কার চিঠি?
যে মা-ঠাকরুন চিঠিটি লিখেছেন, তিনি আপনাদের ঠিকানা দেননি। আমি আর রাবেয়া সুইপার ঠিক করেছি, এমন যত চিঠি পাব, সব আপনাদের কাছে দিয়ে যাব। পুলিশ লাইনে যারা মারা গেছেন, তাদের তালিকাও দিয়েছে রাবেয়া সুইপার।
পরদেশী ছোট্ট খাতাটিও এগিয়ে দেয়। তারপর বলে, আমি আসছি, হুজুর। আমি দাঁড়াতে পারব না।
না, তা হবে না। তুমি বসো, পরদেশী। চা খাবে।
না মাইজি, আজ থাক। একজন মা-ঠাকরুন মরে গেলে আমার মন খুব খারাপ হয়। কয়েকজন নতুন মা-ঠাকরুনকে আনা হয়েছে। আমার মন খুব খারাপ। আমি দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না।
