এই বাইশ দিন ধরে মেয়েরা সবাই মিলে ওকে দেখেছে। এখন ওর চারপাশে গোল হয়ে বসে আছে। ওরা দেখেছে কীভাবে মৃত্যু হয়। দেখেছে চোখের পাতা বুজে যায়। ঠোঁটের কাঁপুনি থেমে যায়। হৃৎপিণ্ডের ওঠানামা থেমে যায়। শ্বাস-প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। বুকের ধুকপুক শব্দ আর হয় না। এবং গায়ে হাত দিলে বোঝা যায়, শরীরটা কেমন ঠান্ডা হয়ে যায়। মেয়েরা ভেবেছিল, ওড়না দিয়ে মুখটা ঢেকে দেবে, কিন্তু ঢাকেনি। শিউলি ফুলের মতো মুখটা ঢেকে রাখতে মন চায়নি, ওদের মৃত্যু ওর ফুলের সৌরভ মুছে দেয়নি।
রাবেয়াকে খবর দেওয়া হয়েছে। রাবেয়া এলে বলবে কী করা হবে। রাবেয়া জানে, মেয়েটি বলবে, আমার মৃত্যুর খবর দিয়ে আমি কাউকে কাঁদতে দিতে চাই না। যুদ্ধের জন্য শক্তি দরকার। কেঁদেকেটে শক্তি ক্ষয় করার দরকার নেই।
ও তো যখনই অজ্ঞান হয়েছে, তার পরে জ্ঞান ফিরলে এমন কথাই বলত। ও বলত, আমি একটা একা মেয়ে। একা পৃথিবীতে এসেছি। আমার সঙ্গে দু-চার পাঁচজন ছিল না। তাই একাই আমি হারিয়ে যেতে চাই। সবাই জানুক আমি হারিয়ে গিয়েছি। ব্যস, সব শেষ। তোমরা আমার জন্য চোখের পানি ফেললা না।
ওর এসব কথা শুনে রাবেয়া বুঝেছে, ও বস্তির মেয়ে না। ওর ভেতরে বুদ্ধির সাড়া আছে। ওর পড়ালেখার কথা জিজ্ঞেস করলে বলেছে, আমি তো স্কুলে যাইনি। মানুষের বাসায় কাজ করেছি। বাবা রিকশা চালাত। মা ইটভাটায় কাজ করত। অনেক ভাইবোনের সংসার ছিল। সব ভাইবোনই কোনো-না-কোনো কাজে ঢুকে গিয়েছিল। আমাদের কোনো দুঃখ ছিল না। আমরা হাসিমুখে ডাল-ভাত খেতাম। এখন মরতে আমার দুঃখ নাই।
কত অবলীলায় ও এসব কথা বলত। ওর মুখ দেখে মনে হতো না যে, ও মিথ্যা কথা বলছে। আশ্চর্য মেয়ে, সবকিছু থেকে নিজেকে আড়াল করে আজ
ওর বিদায়ের দিন।
রাবেয়া ঘরে ঢুকতেই পাশে বসে থাকা মেয়েরা কান্নার শব্দ করতেই রাবেয়া ঠোঁটে আঙুল দিয়ে বলে, চুপ। ও না মানা করেছে কাঁদতে।
ও মানা করলে আমাদের শুনতে হবে?
থমকে যায় রাবেয়া। তাই তো! ও বললেই তা শুনতে হবে? আর এই তিন মাস যে একসঙ্গে থাকা, একসঙ্গে নির্যাতিত হওয়া, একসঙ্গে মৃত্যু দেখা, একসঙ্গে একটা ছুরি হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করা—এত কিছু ভাগাভাগি করার পরও ও ওদের কেউ না? তা হতে পারে না। ও আমাদের কেউ। আমাদের একজন। আমাদের স্বজন।
খালা।
একজনের কণ্ঠ। রাবেয়া তার ডাকে ঘুরে তাকায় না। যেখান থেকেই ডাকুক তার সবটুকু তো ও শুনতেই পায়। শুধু বলে, কী বলবি, বল। বেশি কথা বলবি না কিন্তু।
আমরা ওর জন্য দোয়া পড়ব না?
পড়বি। পড়। দোয়া পড়তে তো মানা নেই।
একজন ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলে, কেমন করে দোয়া পড়ব? তুমি আমাদের নাপাক শরীর পাক করে দাও। আমাদের দম যে আটকে আসছে।
রাবেয়া কথা বলে না। রাবেয়া জানে, এখানে এসব কিছু হবে না। সেই সুযোগই এই মেয়েদের দেওয়া হবে না। বাথরুমে যথেষ্ট পানি নেই। একসঙ্গে ওদের গোসল হবে না। এসব চিন্তার সুযোগ নেই। রাবেয়া কথা বলতে পারে না।
খালা।
আর একজনের কণ্ঠস্বর।
বল।
আমরা চাই না ওর লাশ পায়ে দড়ি বেঁধে বারান্দা দিয়ে টেনে নিয়ে যাওয়া হোক। আমরা সবাই মিলে ধরাধরি করে ওকে ভ্যানে তুলে দিয়ে আসব।
রাবেয়া জানে, এটা হবে না। তাই চুপ করে থাকে। মৃত্যুর খবর পৌঁছে দেওয়া হয়েছে অফিসে। একটু পরে ডোমরা আসবে লাশ বের করতে।
অন্যদের মতো ওকেও পায়ে দড়ি বেঁধে টেনে নিয়ে যাওয়া হবে।
খালা।
আর একজনের কণ্ঠস্বর।
বল।
তুমি কি আমাদের ভোম দাদাদের একটা কথা বলবে?
কী কথা? ডোম দাদারা কি তোদের কথা রাখতে পারবে?
এটা তো একটা সহজ কথা। রাখতে পারবে না কেন? ডোম দাদারা যেন ওকে ভাগাড়ে না ফেলে কোথাও পুঁতে রেখে আসে।
ঠিক আছে, বলে দেখব। তবে আমি তো জানি, ওরা তোদের কথা রাখতে পারবে না।
আমরা সবাই ডোম দাদাদের পায়ে ধরব।
খবরদার, এমন কাজ করতে যাস না। খবরদার না। তাহলে ওরা মাথা ঘুরে পড়ে যাবে।
কেন? কেন মাথা ঘোরাবে দাদাদের?
ডোম দাদারা তোদেরকে দেবীর মতো সম্মান করে। তোদেরকে মাঠাকরুন বলে। মা-ঠাকরুন কি সন্তানের পায়ে হাত দেয়?
মেয়েরা চুপ করে থাকে। হঠাৎ বাইরে গোলাগুলির শব্দ হলে ওরা পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে। মরদেহ সামনে নিয়ে বসে থাকা মেয়েরা ভয়ে কুঁকড়ে যায়। রাবেয়া নিজেও জানে না, কেন গোলাগুলি হচ্ছে? মুক্তিযোদ্ধারা কি পুলিশ লাইন আক্রমণ করেছে? এমন সুদিন কি হয়েছে?
অল্পক্ষণে গোলাগুলি থেমেও যায়। আরও কিছুক্ষণ পর ডোম নিয়ে সেনারা আসে। মেয়েরা ঘরের কোণে জড়ো হয়ে গুটিসুটি হয়ে থাকে। লাশের পায়ে দড়ি বাঁধা হয়। টেনে নিয়ে যাওয়া হয়। মেয়েরা স্তব্ধ হয়ে থাকে। ডোম দাদাদের বলা হয় না যে, ওকে একটু মাটির নিচে জায়গা দিয়ো। ওরা যদি ডোমদের মা-ঠাকরুন হয়, তাহলে সব কি সন্তানদের বলতে পারে না? পারে, হুকুম দিতেও পারে। নিজেদের বুকের যন্ত্রণা কাটাতে গিয়ে ওদের চোখ জলে ভরে থাকে।
বেলা বাড়লে রাবেয়ার মনে হয়, মেয়েটি চিঠি লেখেনি। ওর ঠিকানাও নেই। তাহলে ও কি হারানো মানুষের তালিকায় থাকবে? নাকি ওর জন্য আর কিছু ভাবতে হবে? ও গালে হাত দিয়ে বসে থাকে। ভাবে, আর কত দিন ও এমন গালে হাত দিয়ে বসে ভাববে যে, কবে এই মেয়েদের আসা-যাওয়ার হিসাব শেষ হবে? কবে এদের মরদেহের হিসাব রাখা শেষ হবে? ঘরে গিয়ে রুশনির নাম আর মৃত্যুর তারিখ লিখবে নিজের ছোট খাতায়। রোহিত ডোমকে দিয়ে ছোট এই খাতাটা কিনে আনিয়েছিল এখানকার দশজনের মৃত্যুর পর। রুশনির নাম লিখলে তার সংখ্যা হবে তেতাল্লিশ।
