রাবেয়া দূর থেকে ওকে ডাকে। প্রথমে হাত ইশারায় ডাকে। পরে গলা উঁচু করে ডাকে।
পরদেশী, উঠে আয়।
পরদেশী রাবেয়ার ডাক শুনে চমকে ওঠে। কিছুক্ষণ থমকে থেকে চারদিকে তাকায়। তারপর দুহাতে মুখের ঘাম মুছে তারপর ঝাড় ফেলে উঠে আসে। কাছে এসে জিজ্ঞেস করে, তুই কি আমাকে ডেকেছিলি? কয়বার ডেকেছিলি? একবার না অনেকবার?
এই তো, এখনই তো ডাকলাম। একবারই ডেকেছি। তুই তো এক ডাকেই আমার দিকে তাকালি।
আরও আগে ডাকিনি?
না, আমি ডাকিনি। ওই দিকে চেঁচামেচি করছে পুলিশ। হয়তো ওটাই তোর কানে গেছে।
ওদের চেঁচামেচি আমার বুকের ভেতর ঢুকবে না। ওদের খুচরো কথা আমার কানে বাড়ি খেয়ে ফিরে যাবে। কিন্তু কেউ ডেকেছে মনে হলে আমার মাথা, বুক নিঃসাড় হয়ে যায়। কোথায় যেন যেতে বলেছিল আমাকে, কিন্তু আমি যেতে পারলাম না। কী যে হলো আমার, কিছুই বুঝতে পারলাম না।
তুই বস। তোর জন্য আমি ডালপুরি নিয়ে আসি। একটু কিছু খেলে তোর ভালো লাগবে।
চিঠিটা আছে তো?
রাবেয়া কোমরে হাত রেখে বলে, আছে।
ও পা টানতে টানতে ক্যানটিনে যায়। চা-ডালপুরি নিয়ে ফিরে এলে দুজনে হাত-পা ছড়িয়ে চা খায়। ভাবে, এইটুকু সময়ের সঞ্চয়। শুধু ব্যক্তিগত। বাকি সময় ওদের একার থাকে না। পুরোটা সময় ওরা দিয়ে রাখে দেশের জন্য। ওরা মনে করে, এটুকু ওদের স্বাধীনতার জন্য দেওয়া। এটাই ওদের যুদ্ধ।
চা শেষ করে পরদেশী জিজ্ঞেস করে, ও চিঠিটা কখন লিখল, রাবেয়া?
যখন ওকে দুবার ঝুলিয়ে নামাল, তখন। ও বুঝেছিল, শরীর আর চলছে। আমাকে বলল, খালা, আমাকে কাগজ-পেনসিল জোগাড় করে দে। আমি একটা চিঠি লিখব।
তারপর দুদিন পরে অজ্ঞান হয়ে গেল। জ্ঞান ফিরল এক দিন পরে। ডাক্তারকে বললাম ওকে একটু দেখতে। হারামির বাচ্চা দেখল না। উল্টো আমাকে বলল, তুই আমাকে জ্বালাস না, রাবেয়া।
আমি বললাম, ওষুধ-বড়ি একটু দে। ওর যন্ত্রণা কমুক। উঠে বসতে পারুক। হারামির বাচ্চা বলল, উঠে বসে কী করবে? মরলেই তো পারে। ওদেরকে মরতে বল, হাজারে হাজারে মরুক। হারামির বাচ্চার কথা শুনে আমার শরীর জ্বলে যায়। আমি চিৎকার করে বলি, তুই কী বললি, ডাক্তার!
ডাক্তার তখন দুহাতে মুখ ঢেকে বসে রইল। আমাকে আর কিছু বলল না। আমি আর কী করব! কাঁদতে কাঁদতে ওর কাছে ব্যারাকে ফিরে গেলাম। ওর চোখ-মুখ মুছে দিলাম। গামছা ভিজিয়ে শরীর মুছে দিলাম। ও চোখ খুলেই বলল, কাগজ-পেনসিল জোগাড় হয়েছে রে?
আমি বললাম, হয়েছে। ডাক্তারের টেবিল থেকে উঠিয়ে নিয়ে এসেছি। ডাক্তার কিছু বলেনি।
আমাকে দে, খালা। একটা চিঠি না লিখে আমি মরতে চাই না। একদিন আমার এই চিঠি হাজার চিঠি হয়ে আকাশে উড়বে।
ওর মুখ দেখে মনে হলো, ও বুঝি আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছে। এই মৃত্যুপুরীতে এটাই ছিল ওর খুশির ঝিলিক। পরদেশী, তুই যদি ওকে দেখতি, বুঝতি দুঃখের খুশি কেমন অন্য রকম। আহারে, সোনার ময়না পাখিরা রাবেয়ার কণ্ঠ ধরে আসে। অনেকক্ষণ চুপ করে থাকে। পরদেশীর মুখেও কথা নেই। ওদের মনে হয়, এই পুলিশ লাইনের দালান, প্রাঙ্গণ, গাছগাছালিও স্তব্ধ হয়ে আছে। এত অন্যায় সহ্য করতে পারছে না।
নীরবতা ভাঙে রাবেয়া। বলে, তুই আমাকে একটা কথা বল, পরদেশী।
বল, কী বলবি? ডাক্তারের কথা? রাবেয়া, আমার মনে হয় ডাক্তারের মনেও কষ্ট আছে। ওই বেটা বাঙালি না? নইলে মুখ ঢেকে বসে থাকবে কেন? তুই ওকে গালি দিস না, রাবেয়া। আমি একদিন জ্বরের ওষুধ আনতে গিয়ে ডাক্তারকে মেয়েদের কথা জিজ্ঞেস করব। দেখি, কী বলে। তবে তাকে আবার
একা পেতে হবে।
পরদেশীর কথায় মাথা নেড়ে চুপ করে থাকে রাবেয়া। তারপর আস্তে আস্তে বলে, আমি তোকে যা বলতে চেয়েছিলাম, তা কিন্তু ডাক্তারের কথা না রে।
তাহলে কী, বল?
জেনিফার আমাকে যে চিঠিটা দিল, এই চিঠি আমি কাকে পৌঁছাব? ও তো বলল ওর কেউ নাই।
কাকে? পরদেশী দুহাতে চুল চেপে ধরে।
ও আমাকে ঠিকানা দেয়নি। ও কার ঠিকানা দেবে? ও তো আমাকে সব কথা বলেছে।
আমাকে ভাবতে দে, রাবেয়া। ভেবে ঠিক করব যে কী করা যায়। তুই তোর মতো ভেবে দেখ। আমি কাজে গেলাম। বেশিক্ষণ এক জায়গায় বসে থাকতে দেখলে আবার ছুটে আসবে শয়তানগুলো। ছাড়বে না।
দ্বিতীয় দিনের মাথায় আবার একটি মৃত্যু ঘটে।
ওর নাম রুশনি।
এক দিনে চারজন ওকে ধর্ষণ করার পরে ও আর সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। বাইশ দিন ধরে মেঝেতে পড়ে ছিল। ঠিকমতো খায়নি। চোখ খোলেনি। শুধু এপাশ-ওপাশ গড়িয়েছে। আর গুঙিয়েছে।
ও সবাইকে বলেছে, ও বস্তির মেয়ে। বাবুপুরা বস্তিতে ওদের বাড়ি ছিল। আগুনে পুড়ে যায়। আর গুলিতে মারা যায় বাবা-মা-ভাইবোন সবাই। শুধু ওকে ওরা আলাদা করে গাড়িতে উঠিয়ে এইখানে এনেছে।
কিন্তু ওর কথা শুনে রাবেয়ার মনে হয়েছে, ও বস্তির মেয়ে নয়। ও যেন অনেক কিছু লুকাচ্ছে।
একদিন ফিসফিসিয়ে রাবেয়াকে বলেছিল, খালা, আমার মৃত্যুর খবর কাউকে দিয়ো না। ওরা আমাকে ভাগাড়ে ফেলে দিলে শেয়াল-কুকুরে খাবে আমাকে। আমি এতেই খুশি। স্বাধীনতার জন্য এর চেয়ে বেশি আমার করার নেই, খালা।
তোমার বাড়ি কোন এলাকায়?
কেন জিজ্ঞেস করছ? বলেছি না বাবুপুরা বস্তি। আগুনে পুড়ে গেছে। আমাদের বাড়ি। সেদিন মধ্যরাতে দাউদাউ আগুন জ্বলে উঠেছিল বস্তিতে। কী ভয়াবহ মাগো…।
বলতে বলতে ও কুঁকড়ে গিয়েছিল। তারপর জ্ঞান হারিয়েছিল। ওকে দেখে রাবেয়ার মনে হয়েছিল, ও রাবেয়ার ছোটবেলার কুড়ানো শিউলি ফুল। শরীর ওর ফুলের সাদা রঙের পাপড়ি। স্নিগ্ধ আর পবিত্র। মুখটা কমলা বোটার রং নিয়ে আশ্চর্য সুন্দর। কেবলই তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে হয়।
