আমি তো নামাতেই পারব। আমি সব পারি।
রাবেয়া দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে আবার বলে, এত কিছু দেখেও চাকরি করছি। মাস গেলে মাইনে নিচ্ছি। মাইনের টাকা দিয়ে ভাত গিলছি। আমি কী না পারি? আমি তো সব পারি!
তারপর চোখে আঁচল চাপা দেয়। চোখ মুছে বলে, তুই ওকে নামা, লালু। পায়ে দড়ি আমি বেঁধে দেব। দড়ি ধরে টেনে ভ্যানেও তুলে দেব। ফেলবি কোথায়?
কোথায় আবার ফেলব? জানিস না, ভাগাড়ে। তোকে না এক শ বার বলি যে, লাশ ভাগাড়ে ফেলি। আবার জিজ্ঞেস করিস কেন? বারবার জিজ্ঞেস করে তোর সুখটা কী, বল তো?
মাটিচাপা দিতে পারিস না?
না, পারি না। হুকুম নাই।
তুই আমার সঙ্গে মেজাজ করবি না, লালু।
তুইও আমার সঙ্গে মেজাজ করছিস।
লালু দুহাতে চোখ মোছে।
কোথাও যেতে পারি না কি সাধে? আমরা না থাকলে ওদের দেখবে কে? এই জ্যান্ত এবং মরা মেয়েদের! ভগবান, আমার মরণ দাও।
কথা শেষে আবার চোখ মোছে লালু। এবার মুখ দিয়ে শব্দও বের হয়।
রাবেয়া বারান্দার মাথার দিকে তাকায়। না, সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসা কাউকে দেখা যাচ্ছে না। লালুর ঘাড়ে হাত রেখে বলে, কাঁদিস না, লালু। তোকে কাঁদতে দেখলে এসে লাথি মারবে। আমাকেও মারবে। তোর মতো আমিও বলি, লাথি খেয়ে মরে গেলে মেয়েগুলোকে দেখবে কে?
আমাকে মারুক। এদের জন্য কেঁদে আমি হাজার বার লাথি খেতে পারি। তুই আমাকে শয়তানদের লাথির হাত থেকে বাঁচাতে পারবি না, রাবেয়া। আমার হাড়ি শক্ত আছে। ওদের লাথিতে ভাঙবে না।
তখন দুজন বেদনায় আপ্লুত হয়ে কাঁদে। দুজনের মনে হয়, স্বাধীনতা অনেক বড় কাজ। লাভ করা খুব কষ্টের। ওরা বুঝতে পারে, এই কষ্টের মধ্যে গৌরব আছে। এই মেয়েগুলো শুধু শুধু কষ্ট সহ্য করছে না।
দুপুরের সময় পরদেশীর সঙ্গে রাবেয়ার দেখা হয়। পরদেশী তিন দিন কাজে আসেনি। ওর জ্বর হয়েছিল। ড্রেন পরিষ্কার করতে করতে ওদের যে কথা হয়, সেটুকুই কাজের ফাঁক। আজও রাবেয়া ড্রেনের কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই পরদেশী মাথা তুলে বলে, খোঁড়াচ্ছিস কেন? পায়ে কী হয়েছে?
লাত্থি।
আবার?
আবার তো হবেই, ধরে নিয়েছি। লাথি না দিলে ওদের পায়ের সুখ মেটে। যা দেখেছি তার সবকিছু তো বুকের ভেতর ধরে রাখতে পারি না। দুচার কথা বেরিয়ে যায়। কথা বের না হলে নিজেরই দম আটকে আসে।
ড্রেনে নামবি? নাকি ওপরে কাজ আছে?
ড্রেনে নামব। রাবেয়া বগলে ধরে রাখা ঝাড় মাটিতে নামিয়ে রাখে। পরদেশী হাত বাড়ালে ওর হাত ধরে নিচে নামে। কোমরে গোঁজা আছে জেনিফারের চিঠি। সেখানে হাত রেখে বলে, যে মেয়েটির লাশ গেল আজ, ওর একটা চিঠি আছে আমার কোমরে।
চিঠি! আবার চিঠি?
হ্যাঁ রে, ওরা চিঠি লেখে বলেই তো মনে হয় যুদ্ধের কথা লেখা হচ্ছে। নইলে এখানে ওদের জীবনে কী ঘটছে, তার কথা কে জানবে? বাইরের কেউ তো এই সব নির্যাতনের কথা জানতে পারবে না।
ঠিক বলেছিস। রাবেয়া, তুই ওপরে ওঠ।
ড্রেন সাফ করব না?
এই পবিত্র চিঠি নিয়ে তোকে ড্রেন সাফ করতে হবে না। তুই ওপরে উঠে ওই কোনায় গিয়ে বসে থাক। ড্রেন আমি একাই সাফ করব। ধর, আমার হাত ধর।
পরদেশীর হাত ধরে রাবেয়া আবার ওপরে ওঠে। বিল্ডিংয়ের আড়ালে গিয়ে বসে। খানিক স্বস্তি পায়। মনে হয়, পায়ের ব্যথা কমে গেছে। দেয়ালে মাথা ঠেকিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। কোমরে গুঁজে রাখা চিঠির ভাষা উড়ে আসে ওর কাছে—পরদেশীর কাছে। লালু, রোহিত, প্রেমলাল এমন আরও কয়েকজন কর্মরত সুইপারের কাছে।
প্রিয় শাকের ভাইয়া, আমি জানি না এই চিঠি তোমার হাতে পৌঁছাবে কি। তবু লিখছি তোমাকে। স্বাধীনতার পরে তুমি যখন দেশে ফিরবে তখন দেখবে, যে বাড়ি থেকে তুমি যুদ্ধ করতে বের হয়ে গিয়েছিলে, সেই বাড়িতে তোমার জন্য কেউ অপেক্ষা করে নেই। আমাদের আব্বা একটি দুর্গবাড়ি গড়ে তোলার জন্য প্রস্তুত হয়েছিলেন। কিন্তু তার আগেই তাকে স্বাধীনতার জন্য জীবন দিতে হয়েছে। আমার আম্মাও সেনাদের গুলিতে জীবন দিয়েছেন। আমাদের দুই ভাইও। তাদের যুদ্ধ শেষ হয়েছে।
আব্বা-আম্মা-ভাইদের মৃত্যু আমার চোখের সামনে হয়েছে, ভাইয়া। আমার বুকভাঙা কান্না আমি থামাতে পারিনি। ওরা যখন আমাকে নির্যাতন করেছে, তখনো আমি নিজের কথা মনে করিনি। আমার চোখের সামনে মৃত্যুর দৃশ্য স্থির হয়ে ছিল। দেখেছি গুলিবিদ্ধ আব্বার বুক ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। সেই রক্তের স্রোত গড়িয়ে যাচ্ছে ঘরে। দেখেছি আম্মার বুলেটবিদ্ধ শরীর থেকে রক্ত গড়াচ্ছে। দেখেছি ছোট দুই ভাইয়ের তেলানো শরীর। স্বাধীনতার জন্য যা কিছু করার, তার সবটুকু আমরা করেছি, ভাইয়া। এখন আমি মৃত্যুর মুখোমুখি। আর হয়তো কয়েক ঘণ্টা মাত্র বা এক-দুই দিন। তারপর চোখের পাতা বুজব।
যেদিন তুমি রাইফেল কাঁধে নিয়ে জয় বাংলা বলতে বলতে ঢাকায় আসবে, সেদিন আমরা অদৃশ্যে থেকে বলব—জয় বাংলা। আমাদের দুঃখ থাকবে না, কান্না থাকবে না। আমি জানি, আমাদের আব্বা বলবেন, আমাদের জীবনদান সার্থক হয়েছে। ছেলেরা বিজয়ের বেশে ঘরে ফিরেছে। আমি বলব, শান্তি শান্তি। আমার মৃত্যু স্বাধীনতার জন্য। আমার কোনো দুঃখ নাই। যুদ্ধের সময়ে আমার শরীর তো স্বাধীনতার জন্যই বরাদ্দ ছিল।
ধড়মড় করে সোজা হয়ে বসে রাবেয়া। মনে হয় একটুখানি ঝিম ধরেছিল। কে যেন ওকে কোথায় যাওয়ার জন্য ডেকেছিল। ও যেতে পারেনি। তাকিয়ে দেখে, পরদেশী তখনো ড্রেনের ভেতরে। ওর কাজ শেষ হয়নি। একবার মাথা তুলে চারদিকে তাকায়। আবার মাথা নিচু করে। আবার মাথা ওঠায়। ওকে বেশ অস্থির দেখাচ্ছে। ও যেন কোনো কিছু শোনার জন্য কান পাতছে, কিংবা শুনতে পাচ্ছে না বলে শোনার চেষ্টা করছে। ও বুঝি কাজের মাঝে স্বস্তি পাচ্ছে না। ওকে কোথাও যেতে হবে, এমন ভাবনা ওকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। ওর মুখজুড়ে প্রবল ঘাম জমে আছে। ও হাত উঠিয়ে মোছর চেষ্টা করে না।
