আমার বাবা-মাও স্বাধীনতার জন্য জীবন দিয়েছেন। আমার বড় ভাই শাকেরকে ধরার জন্য সেদিন গভীর রাতে ওরা আমাদের বাড়িতে এসেছিল। আমার বড় ভাই অসহযোগ আন্দোলনের সময় মিছিল-মিটিংয়ে থাকত। ও একজন ভালো বক্তাও ছিল। তার ভারী কণ্ঠস্বরে গমগম করত এলাকা। আমিও রাজপথে থেকেছি। স্লোগানে স্লোগানে মাতিয়ে মিছিলের সঙ্গে হেঁটেছি কতটা পথ। আমি জানি না, পথটা কী ছিল। আমি জানতাম, পথটা জয় করতে হাঁটতে হবে। আমাদের কারোরই সেই হাঁটায় ক্লান্তি ছিল না। আমাদের জীবনে সেই সময় অবিশ্বাস্য এক আশ্চর্য দিনের সমষ্টি ছিল।
যেদিন ওরা আমাদের বাড়িতে তাণ্ডব ঘটাল, সেদিন রাত দশটার দিকে আমার ভাই শাকের বাড়িতে এসে বলল, মা, ভাত দাও। এক্ষুনি। ভাত খেয়েই বেরিয়ে পড়ব। হাতে সময় খুব কম। ও কোথায় যাবে—মা ওকে এই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করারও সুযোগ পাননি।
তারপর ছোট্ট একটা ব্যাগে দুটো কাপড় ঢুকিয়ে নিল। খেতে বসে বলল, আব্বা, ইয়াহিয়া খান চলে গেছে। মনে হয়, আজ ওরা একটা কিছু ঘটাবে। আমি বাড়ি ছেড়ে অন্য জায়গায় চলে যাচ্ছি। যদি পারতাম, জেনিফারকেও নিয়ে যেতাম। কিন্তু আমি যেখানে যাব, সেখানে ওকে নিতে পারব না। তা ছাড়া পরবর্তী পরিস্থিতি কী হবে, তা আমরা জানি না। ও আপনাদের সঙ্গেই থাকুক, আম্মা। ওকে নিয়ে যাওয়া দরকার ছিল। কিন্তু উপায় নেই।
ও আব্বাকে বলে, আপনারাও ঢাকায় থাকবেন না। প্রথমে কেরানীগঞ্জে চলে যাবেন। তারপরে অবস্থা বুঝে ইন্ডিয়ায়। কুমিল্লার বর্ডার দিয়ে যাবেন। আমিও এমন পরিকল্পনা করেছি। আমাদের সঙ্গের সব ছেলে তা-ই করবে। আমরা একদল একসঙ্গে সীমান্ত পার হব।
আম্মা প্রথমে বিষণ্ণ হয়ে পরে উৎসাহ নিয়ে বলেছিলেন, তাহলে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল?
বোধ হয় হয়েই গেল, আম্মা। বঙ্গবন্ধু কী বলেন আমরা সেই অপেক্ষায় থাকব।
আব্বা তখন বলেছিলেন, বঙ্গবন্ধু তো বলেই দিয়েছেন—ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে; আমার মনে হচ্ছে। আমি এই বাড়িটাকে দুর্গ বানাব। আমি কোথাও যাব না, শাকের।
আব্বার কথার দৃঢ়তায় ভাইয়া উজ্জ্বল মুখে তাকিয়ে বলেছিল, আব্বা, আপনি আমার সাহস দ্বিগুণ করে দিলেন। বাড়িটা দুর্গ হলে জেনিফারও আপনাকে সাহায্য করবে।
তারপর দ্রুত ভাত খাওয়া শেষ করেছিল শাকের ভাই। রাত এগারোটার দিকে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় বলেছিল, আপনাদের সঙ্গে আবার কবে দেখা হবে জানি না, আম্মা। আপনারা আমার জন্য দোয়া করবেন।
আম্মা ওকে বুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। চোখের পানিতে ভিজিয়েছিলেন ওর মাথা।
আব্বা ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, সামনের দিকে যাও, বাবা। পেছন ফিরে তাকিয়ো না।
ও আব্বা-আম্মার পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে। ছোট ভাইদের মাথায় হাত দিয়ে আদর করে। আর আমাকে বলেছিল, সাহস নিয়ে থাকবি। মৃত্যুকেই বড় করে দেখবি। ভয়কে না।
আমি আমার ভাইকে বলেছিলাম, আমারও যুদ্ধ আছে, ভাইয়া। তুমি আমার জন্য ভেবো না। আমার যুদ্ধ আমি আমার মতো করে করব। ফিরে এসে বলবে, তুই এত কিছু পেরেছিস! আয়, তোকে স্যালুট করি।
তারপর মধ্যরাতে তাণ্ডব ঘটিয়েছিল ওরা।
তিনজন বাড়িতে ঢুকেছিল। দরজায় লাথি দিতে থাকলে দরজা খুলে দিয়েছিলেন আব্বা। আব্বার বুকের ওপর রাইফেল ধরে বলেছিল, গাদ্দার।
আম্মা আর আমি আব্বার পেছনেই ছিলাম। একজন এসে আমার হাত ধরে টেনে বলেছিল, বহুত আচ্ছা। খুব সুরত। তারপর ওদের দলের অন্যদের কাছে নিয়ে আমাকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। একজন শক্ত করে আমার হাত চেপে ধরেছিল। তখন আব্বার বুকের ওপর রাইফেল ধরে রাখা সেপাই ট্রিগার টিপে দেয়। পড়ে যান আব্বা। আম্মা আব্বাকে ধরতে গেলে আম্মাকেও গুলি করে। আমার পাঁচ বছরের ভাইটিকে বুটের নিচে চেপে রাখে। আমি তাকিয়ে ওর যন্ত্রণা দেখি আর চিঙ্কার শুনি। হা-হা করে হাসতে থাকে সেপাইটি। ওর বুটের নিচে থেঁতলাতে থাকে ভাইটি। ততক্ষণ পর্যন্ত, যতক্ষণ না ওর শরীর নিথর হয়ে যায়। বাকি থাকি আমি আর আমার দশ বছর বয়সী ভাইটি। ও হাত বাড়িয়ে আমার কাছে আসার জন্য কাঁদছিল। আমি সেপাইটির হাত ঝটকা মেরে ছাড়িয়ে ওকে জড়িয়ে ধরি। তারপর মুখ ফিরিয়ে ওদের দিকে থুতু ছিটাই।
ওরা তিনজনে একসঙ্গে হা-হা হাসিতে ঘর ভরিয়ে দেয়। দেখতে পাই, তিনটি হাত একসঙ্গে আমার দিকে এগিয়ে আসে। একজন চুল ধরে। অন্য দুজন দুই হাত।
তিনজনে জোরে ধাক্কা দিয়ে আমাকে ছুড়ে মারে দরজার দিকে। আমি দরজার সামনে হুমড়ি খেয়ে পড়ে যাই। চৌকাঠে লেগে আমার কপাল ফেটে রক্ত বের হয়। আমি জ্ঞান হারাইনি। শুনতে পাই, আমার ভাইয়ের আর্তচিৎকার। মুখ ফিরিয়ে দেখি আমার ভাইটিকে ধরে আছড়াচ্ছে। তিনজনে মিলে বুটের নিচে পিষছে। আমি ওদের একজনের পায়ের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে বলি, ওকে একটা গুলি দিন। মাত্র একটা গুলি। এভাবে ওকে মারবেন না।
ওরা আমাকে চুল ধরে টেনে তোলে। তার পরে গাড়িতে ওঠায়। এর পরের বর্ণনা করার সাধ্যি আমার নেই। তখন আমি মৃত্যুর মুখে। জানি, বাঁচব না। আমার ভাইয়ের জন্য একটা চিঠি লিখেছি। রাবেয়া খালাকে দিয়েছি। এই শহরের কোনো দুর্গবাড়ি যদি খালা চেনে, তবে সেখানে পৌঁছে দেবে। বিদায়, তোমাদের সবার কাছ থেকে বিদায়—এই পুলিশ লাইনের বন্দী খাচায় তোমরা যারা আছ, তোমাদের সবার কাছ থেকে বিদায়।
জেনিফারের লাশের দিকে তাকিয়ে লালু ডোম বলে, এই লাশ আমি নামাতে পারব না। তুই নামা, রাবেয়া।
